বিবিধ বিষয়

কেন ধূমপান করেন ?

কেন ধূমপান করেন ?


ভূমিকা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার জন্য, সালাত ও সালাম তার রাসূল মুহাম্মদের ওপর এবং তার পরিবার, সাথী ও সকল অনুসারীদের ওপর।

অতঃপর,

সন্দেহ নেই ধূমপান ভয়াবহ ব্যাধি, নীরব ঘাতক ও জীবন ধ্বংসকারী বদ-অভ্যাস। ধূমপানের ক্ষতি অপূরণীয় এবং তার পরিণতি খুব খারাপ। এসব দ্রব্য উৎপাদন করা, বিক্রি করা ও প্রচার করা জঘন্য অপরাধ।

কঠিন সত্য যে, মানব জাতির বৃহৎ এক অংশ তার ফাঁদে আটকে গেছে। তাদের মস্তিষ্ক তার নেশায় রীতিমত অভ্যস্ত। ধূমপান তাদের অন্তরকে গ্রাস করেছে। তাই ধূমপান ত্যাগ করা তাদের জন্য কঠিন ঠেকছে। তার থেকে মুক্ত হওয়া তাদের অন্তরের পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

এ কথাও ঠিক যে, অনেক ধূমপায়ী এখনো জীবন্ত অন্তরের অধিকারী, ইসলামী মূল্যবোধে আপ্লুত। তাদের অন্তরে রয়েছে কল্যাণের প্রতি টান ও ধাবমানতা। তাদের হৃদয় ইসলাম ও মুসলিমের মহব্বতে পরিপূর্ণ। হ্যাঁ তারা ধূমপান ব্যাধিতে আক্রান্ত, তারা ধূমপানের অনিষ্ট ও ধ্বংসের মুখোমুখি।

এ কথাও ঠিক যে, অনেক ধূমপায়ী ধূমপানের বিভীষিকা অস্বীকার করেন না, শরীর ও স্বাস্থ্যের ওপর তার অনিষ্ট সম্পর্কে তাদের কোনো সন্দেহ নেই। বরং তাদের অনেকে ধূমপান ত্যাগ করার ইচ্ছা লালন করেন, ‘অতি শীঘ্র ছেড়ে দেব’ বলেন ও তার থেকে মুক্তির পথ খোঁজেন।

অধূমপায়ী ভাইদের ওপর তাদের হক তাদেরকে সাহায্য করা, তাদের হাত ধরে ধূমপান ত্যাগ করানো, যেন তারা এ ব্যাধি থেকে নাজাত পায়।

একটি বাস্তব হল ধূমপান সম্পর্কে লেখার পূর্বে প্রত্যেক লেখক দ্বিধা করেন লিখবেন কি-না, কারণ এ বিষয়ে অনেকে লিখেছেন। আমি যদি বলি যেসব বিষয়ে অধিক লেখালিখি হয়েছে তার মধ্যে ধূমপানের বিষয়টি অন্যতম, তাহলে মনে হয় বাড়াবাড়ি হবে না। এতদ সত্যেও ধূমপানের অনিষ্ট দিনদিন বেড়েই চলছে, দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। তাই বারবার লেখা, বিভিন্ন ভাবে লেখা সময়ের দাবি এবং পরিবার, সমাজ ও জাতির সুরক্ষার প্রয়োজন হিসেবে দেখা দিয়েছে। আশা করি এভাবে ধূমপানের আগ্রাসন হ্রাস পাবে, ধূপমায়ীরা সচেতন হবেন। এসব উপদেশ তারা অন্তর দিয়ে শ্রবণ করবেন এবং ধূমপান ত্যাগ করার মহৎ ব্রত গ্রহণ করবেন।

এ প্রেরণাই আমাকে উৎসাহ দিয়েছে, বরং কলম হাতে সামনে অগ্রসর হতে বাধ্য করেছে। তাই আমি ধূমপায়ী ভাইদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা আরম্ভ করি, এ সম্পর্কে আলেম, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যবিদদের লেখা ও বাণী অনুসন্ধান শুরু করি। যেমন শায়খ আব্দুর রহমান সা‘দি লিখিত ‘হুকমু শুরবিদ দুখান’; শায়খ মুহাম্মদ ইব্‌ন ইবরাহিম লিখিত ‘রিসালাহ ফি হুকমি শুরবিদ দুখান’ ও ‘মাওকিফুত তিব্বে মিনাত তাদখীন’; ব্রিটিশ অ্যাকাডেমি কর্তৃক পরিচালিত ধূমপান ও ধূমপায়ীদের সম্পর্কে গবেষণা পত্র ‘আত্তাদখীনু কারেসাতুন আসরিয়্যাহ’; ড. মুহাম্মদ আলি আল-বার লিখিত ‘আত্তাদখীন ও আসারুহু আলাস সিহ্‌হাহ’ ও ‘আত্তিজারাহ আল-খাছিরাহ’; ড. আব্দুল্লাহ ইব্‌ন জিবরীন লিখিত ‘আত্তাদখীন মাদ্দাতুহু ও হুকমুহু ফিল ইসলাম’ এবং শায়খ আবু বকর আল-জাযায়েরি লিখিত ‘আত্তাদখীন মাদ্দাতান ও হুকমান’; শায়খ মুহাম্মদ জামিল জায়নু লিখিত ‘হুকমুদ্দুখান ওয়াত্তাদখীন আলা দাওয়িত তিব্বে ওয়াদ্দীন’ ইত্যাদি। এ ছাড়া আরো অনেকের লেখা ও পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ-নিবন্ধ থেকে বিশেষভাবে উপকৃতি হয়েছি। অবশেষে আমার এ পুস্তিকা প্রত্যেক ধূমপায়ীকে সম্বোধন করে নামকরণ করেছি:

কেন ধূমপান করেন?

এ প্রশ্ন প্রত্যেক ধূমপায়ীর দিকে ছুড়ে দেয়া হল, যেন তাদের ভেতর থেকে ধূমপান ত্যাগ করার দাবি উঠে এবং তারা ধূমপান থেকে মুক্তির পথ খুঁজে নেয়।

আপনি যদি কোনো ধূমপায়ীকে উক্ত প্রশ্ন করেন, দেখবেন সে তার উত্তর এড়িয়ে যেতে চায় এবং নানা বাহানা ও অজুহাত পেশ করে।

কেউ বলে: আমি যখন বিষণ্ণ থাকি তখনি ধূমপান করি, যেন আমার অন্তরের বিষণ্নতা দূর হয়।

কেউ বলে: পরিবার থেকে দূরে থাকার কষ্ট ও একাকীত্ব দূর করার জন্য ধূমপান করি।

কেউ বলে: বন্ধু-বান্ধবদের সাথে আড্ডা দেয়ার সময় অধিক আনন্দ উপলব্ধির জন্য ধূমপান করি।

কেউ বলে: স্বাদ উপভোগ করার জন্য ধূমপান করি।

কেউ বলে: গোস্বা ও পেরেশানি দূর করার জন্য ধূমপান করি।

কেউ বলে: বন্ধুত্বের খাতিরে ধূমপান করি।

কেউ বলে: অমুককে দেখাদেখি ধূমপান করি, সে ধূমপান করে আমি তার অনুসরণ করি।

কোনো অসহায় বলে: ছোট বেলা থেকে ধূমপানে অভ্যস্ত হয়েছি, এখন ত্যাগ করা ও তার থেকে মুক্ত হওয়া কঠিন হয়ে গেছে।

কোনো অহংকারী বলে: উপকার পেয়েই আমি ধূমপান করি, এতে কোনো দোষ নেই, ক্ষতি নেই।

কেউ বলে: …, কেউ বলে: …, কেউ বলে: … ইত্যাদি।

কারণ যতই থাক মৃত্যু একটাই!!!

সাধারণত মানুষ এসব কারণে ধূমপান করে, যখন তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হয় কেন ধূমপান কর? তারা এসব উত্তর পেশ করে।

 

আত্মজিজ্ঞাসা:

ধূমপায়ী ভাই, আপনি যেহেতু এসব কারণে ধূমপান করেন, আমি আপনাকে কিছু বলতে চাই। আমি আপনার বিবেক, স্বভাব ও অনুভূতিকে সম্বোধন করে আলোচনার টেবিলে বসতে চাই। হয়ত আল্লাহ আমাদেরকে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার তাওফিক দিবেন, যার পশ্চাতে রয়েছে কল্যাণ আর কল্যাণ!!!

ধূমপায়ী প্রিয় ভাই, ধূমপান হারাম এ ব্যাপারে আপনার মধ্যে কোনো সন্দেহ আছে? আপনি কি ধূমপানের ক্ষতি, কু-প্রভাব ও অনিষ্ট সম্পর্কে অনিশ্চিত বা সন্দিহান?

আমার শতভাগ বিশ্বাস আপনি অবশ্যই বলবেন: আমি জানি ধূমপান হারাম, তার অনিষ্ট সম্পর্কে আমার মধ্যে কোন সন্দেহ নেই। শুধু আপনি নয় সামান্য বিবেকের অধিকারী সকল ধূমপায়ী এ কথা বলে।

আপনার প্রতি আমার জিজ্ঞাসা: ত্যাগ করব করব বলার পরিবর্তে আপনি কেন ধূমপান ত্যাগ করেন না, কেন আপনি চির দিনের জন্য ধূমপান থেকে মুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না!?

আপনি অবশ্যই মুখভরে উত্তর দিবেন: অবশ্যই, অবশ্যই ছেড়ে দিব ধূমপান। আমি চাই আপনি ধূমপানের ক্ষতি সম্পর্কে নিশ্চিত হোন এবং তা ত্যাগ করার এখনি ঘোষণা দিন।

প্রিয় ভাই, আপনি মনযোগসহ শুনুন, অন্তর দিয়ে চিন্তা করুন, ইনশাআল্লাহ আপনি অবশ্যই ধূমপানের ক্ষতি সম্পর্কে নিশ্চিত হবেন এবং তা ত্যাগ করার আজই সিদ্ধান্ত নিবেন।

স্মরণ করুন:

ধূমপায়ী প্রিয় পাঠক, আপনি সবার আগে চিন্তা করুন আপনি আল্লাহর বান্দা, আল্লাহ আপনাকে বান্দার মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। বান্দা হওয়ার মর্যাদা বড় মর্যাদা। আপনি আল্লাহর পরিপূর্ণ রূপে বান্দা হোন তথা পূর্ণরূপে তার দাসত্ব গ্রহণ করুন, আপনি সকল দাসত্ব থেকে মুক্তি পাবেন, আপনার নফস ও প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকেও মুক্তি পাবেন। আপনি স্বাধীন এক আল্লাহর দাসে পরিণত হবেন, তিনি ব্যতীত আপনার কোনো প্রভু থাকবে না।

আপনি যদি আল্লাহর দাসত্বে সীমাবদ্ধ না থাকেন, সকল দাসত্ব আপনাকে ঘিরে ধরবে, আপনি দাসের দাসে পরিণত হবেন, তাদের নির্দেশ বাস্তবায়নে ক্লান্ত ও পেরেশান হবেন!

মনে রাখুন আল্লাহর দাসত্বের অর্থ তার আনুগত্য করা, নাফরমানি ত্যাগ করা; তার শোকর করা, অকৃতজ্ঞ না হওয়া; তাকে স্মরণ করা, ভুলে না যাওয়া।

জেনে রাখুন, তিনি আপনাকে কতক বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন ও কতক বিষয়ে নিষেধ করেছেন। যার মধ্যে আপনার কল্যাণ ও সফলতা রয়েছে তার নির্দেশ দিয়েছেন। যার মধ্যে আপনার অনিষ্ট ও ক্ষতি রয়েছে তার থেকে নিষেধ করেছেন।

ধূমপায়ী প্রিয় পাঠক, এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে চিন্তা করুন এবং ধূমপানের অনিষ্টগুলো ভেবে দেখুন। নিম্নে ধূমপানের কিছু অনিষ্ট তুলে ধরা হল:

১- বিড়ি-সিগারেট খবিস ও নাপাক বস্তু। আপনার রব খবিস বস্তু সম্পর্কে ইরশাদ করেন:

﴿ وَيُحِلُّ لَهُمُ ٱلطَّيِّبَٰتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيۡهِمُ ٱلۡخَبَٰٓئِثَ ١٥٧ ﴾ [الاعراف: ١٥٦] 

“এবং তিনি তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করেন আর অপবিত্র বস্তু হারাম করেন”। [সূরা আরাফ: (১৫৭)]

২- ধূমপান অপব্যয় ও বাজে খরচ। আপনার রব বাজে খরচ সম্পর্কে ইরশাদ করেন:

﴿وَلَا تُبَذِّرۡ تَبۡذِيرًا ٢٦ إِنَّ ٱلۡمُبَذِّرِينَ كَانُوٓاْ إِخۡوَٰنَ ٱلشَّيَٰطِينِۖ وَكَانَ ٱلشَّيۡطَٰنُ لِرَبِّهِۦ كَفُورٗا ٢٧﴾ [الاسراء: ٢٦،  ٢٧] 

“আর কোনভাবেই অপব্যয় করো না। নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের প্রতি খুবই অকৃতজ্ঞ।”। [সূরা ইসরা: (২৬-২৭)]

হে ধূমপায়ী ভাই, আপনি অপব্যয়ীদের অন্তর্ভুক্ত হতে চান, আপনি চান শয়তানের ভাই উপাধি লাভ করুন?

৩- ধূমপান অপচয়। আল্লাহ তা‘আলা অপচয় সম্পর্কে বলেন:

﴿إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ ٱلۡمُسۡرِفِينَ ٣١﴾ [الأعراف: ٣١]

“নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না”। [সূরা আরাফ: (৩১)]

৪- ধূমপান করা মানে নিজেকে হত্যা করা। আল্লাহ তা’আলা এ সম্পর্কে বলেন:

﴿وَلَا تَقۡتُلُوٓاْ أَنفُسَكُمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ بِكُمۡ رَحِيمٗا ٢٩ وَمَن يَفۡعَلۡ ذَٰلِكَ عُدۡوَٰنٗا وَظُلۡمٗا فَسَوۡفَ نُصۡلِيهِ نَارٗاۚ وَكَانَ ذَٰلِكَ عَلَى ٱللَّهِ يَسِيرًا ٣٠﴾ [النساء: ٢٩،  ٣٠]

“আর তোমরা নিজেরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে পরম দয়ালু”। [সূরা নিসা: (২৯-৩০)]

৫- ধূমপান অর্থ নিজ হাতে নিজেকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করা। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

﴿وَلَا تُلۡقُواْ بِأَيۡدِيكُمۡ إِلَى ٱلتَّهۡلُكَةِ وَأَحۡسِنُوٓاْۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلۡمُحۡسِنِينَ ١٩٥﴾ [البقرة: ١٩٥]

“এবং নিজ হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না”। [সূরা বাকারা: (১৯৫)]

৬- ধূমপান অর্থ নিজের অনিষ্ট সাধন করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সম্পর্কে বলেন:

«لاضرر ولا ضرار».

“কোনো ব্যক্তি তার ভাইয়ের ক্ষতি করবে না, কারো ক্ষতির মোকাবিলায় ক্ষতি করে প্রতিশোধ নিবে না”। কেউ বলেছেন: এ হাদিসের অর্থ: “কোন স্বার্থে কারো ক্ষতি করা যাবে না এবং বিনা স্বার্থেও কারো ক্ষতি করা যাবে না”।[1]

৭- ধূমপায়ী ভাই, এসব ক্ষতি ছাড়াও আপনার ধূমপানের কারণে আপনার অপর ভাই কষ্ট পায়, আপনি তাকে কিভাবে কষ্ট দেন?! কিভাবে আপনি আল্লাহর বান্দাদের বিরক্তির কারণ হন?! ধূমপানের কারণে বায়ু দূষণ হয়, অন্যদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে। বিশেষ করে যদি জনসাধারণের সমাগম স্থানে ধূমপান করা হয়, যেমন এয়ারপোর্ট, বাসষ্ট্যাণ্ড, রেল স্টেশন, বাজার, হাসপাতাল, বিশ্রামাগার ইত্যাদি?!

আপনি কি আল্লাহর বাণী শ্রবণ করেননি, তিনি ইরশাদ করেছেন:

﴿وَٱلَّذِينَ يُؤۡذُونَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ وَٱلۡمُؤۡمِنَٰتِ بِغَيۡرِ مَا ٱكۡتَسَبُواْ فَقَدِ ٱحۡتَمَلُواْ بُهۡتَٰنٗا وَإِثۡمٗا مُّبِينٗا ٥٨﴾ [الأحزاب: ٥٨]

“আর যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে তাদের কৃত কোন অন্যায় ছাড়াই কষ্ট দেয়, নিশ্চয় তারা বহন করবে অপবাদ ও সুস্পষ্ট পাপ”। [সূরা আহযাব: (৫৮)]

৮- মসজিদ আল্লাহর ঘর, আল্লাহ তার ঘরের মর্যাদা বৃদ্ধি করা ও তাতে যিকির করার আদেশ করেছেন। তাতে প্রবেশ করার আগে তিনি আমাদেরকে সৌন্দর্য গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। বৈধ ও হালাল হওয়া সত্যেও পিয়াস রসুন ইত্যাদি দুর্গন্ধযুক্ত বস্তু খেয়ে মসজিদে যেতে নিষেধ করেছেন, যেন মুসল্লিরা কষ্ট না পায়, তাদের অনুভূতিতে আঘাত না লাগে, তাদের একাগ্রতা, ইবাদত ও আল্লাহর সাথে মোনাজাতে বিঘ্ন না ঘটে।

ধূমপায়ী প্রিয় পাঠক, আপনি ধূমপান করে মসজিদে গিয়ে আল্লাহর বান্দাদের কষ্ট দিলেন, ফেরেশতাদের কষ্ট দিলেন!

প্রিয় পাঠক, মনে করুন আপনি এক সম্মানজনক দায়িত্বে আছেন, কিভাবে বসবেন আপনার আসনে? অথবা বিশেষ ব্যক্তির সামনে দণ্ডায়মান যাকে আপনি মহব্বত করেন ও যার থেকে লজ্জাবোধ করেন, কিভাবে দাঁড়াবেন তার সামনে?

সন্দেহ নেই আপনি তার সামনে সুন্দর অবয়বে দাঁড়াবেন, সুঘ্রাণ ও সুন্দর পোশাকে দাঁড়াবেন।

অতএব আপনি যখন আসমান ও জমিনের মালিক আল্লাহর সামনে ধূমপান করে সালাতে দাঁড়ান, আর আপনার মুখ থেকে ধূমপানের দুর্গন্ধ বের হয় তখন কিরূপ লাগে!?

আল্লাহর সম্মান ও মর্যাদার দাবি কোথায় রইল! আপনার অন্তরে তার মহত্বের পরিচয় কি হল!?

৯- মানুষেরা তাদের সম্পদের বিপরীতে সুঘ্রাণ খরিদ করে, আতর ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয় কে কার থেকে বেশী ঘ্রাণ যুক্ত আতর খরিদ করবে, কে অধিক হারে বিভিন্ন রুচি ও পছন্দের লোকদের আকৃষ্ট করবে। মেহমানদের আপ্যায়নে ভদ্র লোকেরাও কম যান না, অপরিচিত ও আকর্ষণীয় নানা ঘ্রাণ দ্বারা অতিথিদের মন জয় করেন, তাদেরকে খুশি করার চেষ্টা করেন! আর আপনি –আল্লাহ আপনাকে হিদায়েত করুন- এসবের দিকে পৃষ্ঠ ফিরিয়েছেন, আপনি শুধু দুর্গন্ধেই অভ্যস্ত! আপনার থেকেই আপনার অপছন্দ গন্ধ বের হয়, আপনার থেকে মানুষেরা বিরক্তি বোধ করে, বরং আপনাকে এ জন্য অনেকে ত্যাগ করে!

১০- আপনার প্রিয় স্ত্রী, যে আপনাকে তার পবিত্র ভালোবাসা দান করেছে, তার সব অনুভূতি ও আবেগ আপনাকে উজাড় করে দিয়েছে, আপনার জন্য তার অন্তর খুলে দিয়েছে, সে তার সব দিয়ে আপনার সন্তুষ্টি অর্জনে যত্নবান থাকে, পরিচ্ছন্ন পোশাক ও সুঘ্রাণ ব্যতীত আপনার সামনে হাজির হয় না! তাহলে আপনি কেন ধূমপান করে তাকে কষ্ট দেন, তার অনুভূতিকে আঘাত করেন, তার পছন্দের কোন তোয়াক্কা করেন না? এ কেমন ইনসাফ, কেমন নীতি, কেমন আদর্শ!?

আপনি কি আল্লাহর বাণী শ্রবণ করেন নি, আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন:

﴿وَلَهُنَّ مِثۡلُ ٱلَّذِي عَلَيۡهِنَّ بِٱلۡمَعۡرُوفِۚ ٢٢٨﴾ [البقرة: ٢٢٨]

“আর নারীদের রয়েছে বিধি মোতাবেক ‎অধিকার। যেমন আছে তাদের উপর ‎‎(পুরুষদের) অধিকার”। [সূরা বাকারা: (২২৮)] ‎

ইব্‌ন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‎‘‎‘আনহু বলেন:

إني لأحب أن أتزيَّن للمرأة كما أحبُّ أن تتزيَّن لي المرأة؛ لأن الله_تعالى_يقول: [وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ] (البقرة: 228).

“আমি নিশ্চয় সৌন্দর্য গ্রহণ করা পছন্দ করি স্ত্রীকে খুশি করার জন্য, যেমন পছন্দ করি সে আমার জন্য সৌন্দর্য গ্রহণ করুক। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: “আর নারীদের রয়েছে বিধি মোতাবেক ‎অধিকার। যেমন আছে তাদের উপর ‎‎(পুরুষদের) অধিকার”। [সূরা বাকারা: (২২৮)]

১১- সন্তান সবাই আশা করে, এ জন্য জ্ঞানীরা তাদের চেষ্টার কমতি রাখে নি। শরীয়ত সন্তানের জন্য তারগীব বা উৎসাহ দিয়েছে, সন্তানের ক্ষতি, ধ্বংস ও বিনাশ হয় এমন কার্যকলাপ থেকে বারণ করেছে। আপনি ধূমপান করে সন্তানের নিয়ামত থেকে নিজেকে বঞ্চিত করছেন, বরং নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন! কারণ ধূমপান প্রজনন ক্ষমতা দুর্বল করে, যৌন শক্তি হ্রাস করে ও বন্ধ্যাত্বের দিকে নিয়ে যায়!

১২- আপনার সন্তান আপনার কলিজার টুকরা। সন্তান দিয়ে আল্লাহ আপনার ওপর অনুগ্রহ করেছেন, তাদের সুরক্ষার জন্য তিনি আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন। আপনি তাদের মহব্বত করেন, তাদের কল্যাণে সচেষ্ট থাকেন, দুর্গন্ধ ও কষ্টদায়ক বস্তু তাদের থেকে দূরে রাখেন, শুধু আপনি নয় সকল দায়িত্বশীল অভিভাবকই এরূপ করেন, এতদ সত্যেও ধূমপান করে আপনি তাদের অনিষ্ট ও ধ্বংসের চেষ্টা করছেন, জেনে বা না-জেনে আপনি ধূমপান করে তাদের বিরক্তির উদ্রেক করছেন, তাদের সুন্দর বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছেন, তাদের মধ্যে বদ অভ্যাসের বীজ বপন করছেন! কারণ ধূমপায়ীদের দ্বারা সন্তান প্রভাবিত হয়।

কতক ধূমপান বিশেষজ্ঞ বলেছেন: ধূমপানের ‘নিকোটিন’ প্রজনন বীজের জন্য বিষতুল্য। নিকোটিনের ফলে প্রজনন ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

১৩- নেক সন্তান পিতা-মাতার জন্য নিয়ামত, আল্লাহর বড় দান। সন্তানের নেক ও সৎ হওয়া পিতা-মাতার জন্য সৌভাগ্য। তাই সকল পিতা-মাতা তাদের ভালোর জন্য চেষ্টা করেন, সন্তানের অনিষ্ট ও অমঙ্গল সবাই অপছন্দ করেন। কিন্তু আপনি ধূমপান করে তাদের অনিষ্টের কারণ হচ্ছেন, আপনার ধূমপানের অনিষ্ট অচিরেই তাদেরকে গ্রাস করবে। তারা এক সময় আপনার অনুসরণে ধূমপানে অবশ্যই অভ্যস্ত হবে। কোনো কবি বলেছেন:

وينشأ ناشىءُ الفتيان منا *** على ما كان عوَّدَه أبوه

“পিতা যেভাবে বাচ্চাদের গড়ে তুলে আমাদের শিশুরা সেভাবেই গড়ে ওঠে”।

১৪- পিতা-মাতার খিদমত করা সাওয়াব ও কল্যাণের কাজ, তাদের অবাধ্য হওয়া পাপ। ধূমপান কখনো তাদের খিদমত থেকে বঞ্চিত করে! যেমন সন্তান হয়ে প্রথম প্রথম ধূমপান করে তাদের কাছে যেতে ভয় পায়, ইতস্তত বোধ করে, এভাবে তাদের থেকে দূরে থাকে, অতঃপর এক সময় তাদের অবাধ্য হতে দ্বিধা করে না!

১৫- আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখা ওয়াজিব, ছিন্ন করা পাপ ও গুনাহ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿فَهَلۡ عَسَيۡتُمۡ إِن تَوَلَّيۡتُمۡ أَن تُفۡسِدُواْ فِي ٱلۡأَرۡضِ وَتُقَطِّعُوٓاْ أَرۡحَامَكُمۡ ٢٢ أُوْلَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ لَعَنَهُمُ ٱللَّهُ فَأَصَمَّهُمۡ وَأَعۡمَىٰٓ أَبۡصَٰرَهُمۡ ٢٣﴾ [محمد: ٢٢، ٢٣]

“তবে কি তোমরা প্রত্যাশা করছ যে, ‎যদি তোমরা শাসন কর্তৃত্ব পাও, তবে ‎‎তোমরা জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং ‎‎তোমাদের আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন ‎করবে? এরাই যাদেরকে আল্লাহ লানত ‎করেছেন, ফলে তাদেরকে বধির ও ‎তাদের দৃষ্টিসমূহকে অন্ধ করে ‎দিয়েছেন”।‎ [সূরা মুহাম্মদ: (২২-২৩)]

ধূমপায়ী ভাই, ধূমপান কখনো আত্মীয়তা বিনষ্টের কারণ হয়। আপনার নেককার কোনো আত্মীয় যে আপনার ধূমপান করা পছন্দ করে না, আপনি যখন তার সাথে সাক্ষাতের চিন্তা করবেন সে জেনে যাবে ভেবে বা তার নিকট আপনার মর্যাদা নষ্ট হবে চিন্তা করে তার থেকে দূরে থাকবেন! অথবা দীর্ঘ সাক্ষাত হবে আশঙ্কায় তাকে এড়িয়ে থাকবেন, যে দীর্ঘ সময় আপনি ধূমপান ব্যতীত থাকতে পারবেন না, ফলে তাদের এড়িয়ে চলবেন। এভাবে আপনার আত্মীয়তা বিনষ্ট হবে, আপনি আত্মীয়তা রক্ষার বরকত ও তাদের দো‘আ থেকে মাহরূম হবেন। অতএব যে কাজ পিতা-মাতার অসন্তুষ্টি ও আত্মীয়তার ছেদ সৃষ্টি করে তাতে কিসের কল্যাণ?!

১৬- আমাদের সম্পদ আল্লাহর মালিকানা। তিনি আপনাকে এ সম্পদের মালিক বানিয়েছেন। এ সম্পদ তিনি বৈধ পন্থায় অর্জন করা ও বৈধ পন্থায় খরচ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আপনি যদি ধূমপান করে সম্পদ নষ্ট করেন আপনি আল্লাহর হুকুম পালন করলেন? না, আল্লাহর নির্দেশ পালন করেন নি আপনি, আপনি সম্পদ নষ্ট করলেন, অপচয় ও অপব্যয় করলেন, বরং আপনি আপনার অনিষ্টের পথে নিজ সম্পদ খরচ করলেন। অধিকন্তু এভাবে আপনি আপনার জাতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করলেন, শত্রুদের আর্থিক সুবিধা দিলেন যারা রাত-দিন ইসলামের অনিষ্ট সাধনে লিপ্ত।

وبفضل جهدك قد غدوت لصانعي *** تلك السموم السود خيْرَ مُعينِ

تَحْبُوهُمُ المـــــــالَ الذي لولاه لم *** يجدوا السبيلَ لكيد هذا الدينِ

“আপনার কৃপায় আপনি তাদের বিষাক্ত হাতিয়ার তৈরিতে সাহায্য করছেন। তাদেরকে আপনি সম্পদ দিচ্ছেন, যদি এ সম্পদ না হত, তারা কখনো এ দীনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে সক্ষম হত না”।

এ ছাড়াও ধূমপানের কারণে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। আপনি ধূমপান করেন তাই ধূমপান বিক্রয়, বিপণন ও প্রচারে অনেক অর্থ ব্যয় হয়। আবার আপনাকেই ধূমপান থেকে বিরত রাখার জন্য স্বাস্থ্য কর্মী, স্বেচ্ছাসেবী ও দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়, অর্থ ব্যয় করে প্রচারণা চালাতে হয়, সভা-সেমিনার করতে হয়। ধূমপানজনিত সৃষ্ট রোগের চিকিৎসায় ব্যয়িত অর্থ মূলত ধূমপানের কারণে খরচ হয়! যদি আপনি ধূমপান ত্যাগ করেন এসব অর্থনৈতিক ক্ষতি থেকে দেশ সুরক্ষা পাবে। আপনি অপরাধ ও পাপের সাহায্য থেকে বিরত থাকলেন।

১৭- জীবন অমূল্য সম্পদ। আবার তা সংক্ষেপ ও অনিশ্চিত, যে কোনো সময় মৃত্যু হানা দিতে পারে, আপনি ধূমপান করে তা আরো হ্রাস করছেন। যারা ধূমপান করে না তারা ধূমপায়ীদের তুলনায় দীর্ঘজীবী হয়। বিজ্ঞানের এ যুগে ধূমপানের কারণে বিশ্বে প্রতি বছরে মারা যায় দুই মিলিয়ন পাঁচ লাখ মানুষ! শুধু আমেরিকাতে মারা যায় তিন লাখ পঞ্চাশ হাজার মানুষ।

বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, সিগারেট জীবন বিধ্বংসী বস্তু, যা মানুষকে বার্ধক্যে উপনীত করে মৃত্যুর ঘাটে পৌঁছে দেয়। দিনে পনেরটি সিগারেট পানকারী ত্রিশ বছরের যুবক, সিগারেট পান করে না অনুরূপ বয়সের যুবকের তুলনায় পাঁচ বছর হায়াত কম পায়। অর্থাৎ ধূমপান ত্রিশ বছরে পাঁচ বছরের ব্যবধান গড়ে দেয়।[2] উপরন্তু ধূমপানের কারণে শেষ বয়সের পুরোটা বিষাদ, বিরক্ত ও কষ্টে ভরে যায়।

১৮- আমাদের সবার অভীষ্ট লক্ষ্য সফলতা অর্জন করা। আমরা সবাই সফলতা কামনা করি, তাই সবাই তার জন্য চেষ্টা করি ও তার পথ খুঁজে বেড়াই। অথচ আপনি ধূমপান করে প্রকৃত সফলতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সুন্দর জীবন উপভোগ করার মুহূর্তগুলো বিনষ্ট করে দিচ্ছেন, যদিও আপনার ভাবনায় আপনি নতুন স্বাদ নিচ্ছেন ও জীবনকে উপভোগ করছেন! কিন্তু আপনি জানেন না আপনার এ ধারণা অমূলক। ধূমপান ত্যাগ করা ব্যতীত কখনো আপনি প্রকৃত সফলতা লাভে ধন্য হবেন না। একজন ধূমপায়ী কিভাবে সুখী হয়, যার জীবন ঝুঁকিপূর্ণ ও বিষাদময়? বাস্তবিক পক্ষে ধূমপায়ীরা দুর্বিষহ জীবন যাপন করে।

১৯- মানুষের বিবেক ও মেধা আল্লাহর দেয়া বড় নিয়ামত। এ নিয়ামতের কারণে আল্লাহ আপনাকে অন্য মখলুকের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। অথচ আপনি ধূমপান করে বিবেক বিনষ্ট করছেন, তার প্রখরতা নিস্তেজ করে দিচ্ছেন। কারণ ধূমপানের কারণে বিবেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মেধা দুর্বল হয় ও দেহ-মনে পতনের আলামত দেখা যায়, ধূমপায়ী ও অধূমপায়ী ছাত্রদের মাঝে তুলনা করলে বিষয়টি সহজেই অনুমেয়।

আমেরিকার একদল বিশেষজ্ঞ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের মাঝে এক পরিসংখ্যান করে দেখেছেন যে, ধূমপায়ী ছাত্রদের স্মৃতিশক্তি ও বুঝার ক্ষমতা অধূমপায়ী ছাত্রদের তুলনায় অনেক কম। বরং অন্যান্য নেশা জাতীয় দ্রব্যের তুলনায় ধূমপানের প্রভাব মস্তিষ্কে খুব দ্রুত বিস্তার করে। সিগারেট জ্বালিয়ে ধূমপান আরম্ভ করার এক মিনিটের কম সময়ে তার ক্রিয়া মগজে পৌঁছে যায়।

২০- মানুষের হৃদয় তার সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সরদার। হৃদয়ের গুরুত্ব আমাদের সবার নিকট অনস্বীকার্য। অথচ আপনি ধূমপান করে রাতদিন আপনার হৃদয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করছেন, তাতে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছেন, রক্ত দূষিত করছেন ও আকস্মিক মৃত্যুর সম্ভাবনা গড়ে তুলছেন। কারণ ধূমপানের ফলে রক্তচাপ বৃদ্ধিসহ অন্যান্য রোগের জন্ম হয়।

২১- আপনার দু’চোখ আপনার জীবনের জানালা ও জ্ঞানের দরজা। চোখ দ্বারা আপনি সব কিছু দেখেন ও আসমান-জমিনের নিদর্শন পর্যবেক্ষণ করেন। অথচ ধূমপান করে আপনি এ জানালা বন্ধ করছেন, তার আলো নিভিয়ে দিচ্ছেন বা দুর্বল করছেন। সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, দিনে এক প্যাকেটের অধিক সিগারেট পান করা চোখের ছানি ও অন্ধত্ব রোগ সৃষ্টির সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে। ধূমপানের ফলে চোখের পাতায় বিভিন্ন প্রদাহ ও চোখের মনিতে স্নায়ু প্রদাহের সৃষ্টি হয়, ধীরে ধীরে অন্ধত্বের দিকে ধাবিত করে।

২২- জ্ঞানীরা সম্মান অর্জন করে এবং মর্যাদার সিঁড়ি বেয়ে উঁচুতে ওঠার চেষ্টা করে। আপনি ধূমপান করে নিচে অবতরণ করছেন। কারণ ধূমপান আপনাকে অসম্মান করছে, আপনার সম্মান বিনষ্ট করছে ও জনসম্মুখে আপনাকে হেয় করছে। সর্বোপরি ধূমপান আপনার অক্ষমতা ও দুর্বল সিদ্ধান্তের প্রমাণ বহন করে। প্রিয় পাঠক, আমি কখনো মনে করি না আপনি এ পতনে সন্তুষ্ট!

আপনি কি ইমাম শাফে‘ঈ রাহিমাহুল্লাহ্‌র বাণী শ্রবণ করেন নি: “যদি আমি জানি যে, ঠাণ্ডা পানি আমার সম্মান হ্রাস করবে, তাহলে কখনো ঠাণ্ডা পানি পান করব না”।[3]

২৩- ধূমপান ইবাদতে অলসতা সৃষ্টি করে ও তার প্রতি অনাগ্রহ বাড়ায়, বরং আপনাকে অন্যান্য নেশা দ্রব্য, অপরাধ ও মাদকের দিকে ধাবিত করবে।

تلك العصا من هذه العصية *** لا تلـــــد الحيَّةُ إلا حيةْ

“ঐ বড় লাঠি ছোট এ লাঠি থেকেই, সাপ তো শুধু সাপই জন্ম দেয়”।

২৪- বড়দের সঙ্গ‎ লাভ করা সম্মান ও মর্যাদার বিষয়। কপালপোড়া ব্যতীত কেউ তাদের সঙ্গ‎ থেকে দূরে থাকে না। ধূমপান আপনাকে তাদের থেকে দূরে রাখে ও নিচুমানের লোকদের সঙ্গ‎ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে। এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী-ই বা আছে!

২৫. দৈনন্দিন কাজে আপনার প্রয়োজন ইখলাস, শক্তি, চঞ্চলতা ও উদ্যমতা। আপনি ধূমপান করে ইখলাস বিনষ্ট করছেন, শক্তি ক্ষয় করছেন ও শরীরে দুর্বলতা আনয়ন করছেন, বরং কাজের ক্ষমতা নিঃশেষ করে দিচ্ছেন, যার পরিণতি হিসেবে আপনি আপনার ও জাতির বোঝায় পরিণত হবেন।

২৬. সুস্থতা মানব দেহের মুকুটস্বরূপ, যার কদর একমাত্র রোগীরাই জানে। সুস্থতা এমন এক সম্পদ যা টাকায় কেনা যায় না। মানুষরা সুস্থতার জন্য ছোট-বড় রোগ-ব্যাধি থেকে সুরক্ষা গ্রহণ করে। আপনি ধূমপান করে নিজেকে ধ্বংস করছেন, জেনে বা না-জেনে ধূমপান করে নিজের ক্ষতির চেষ্টা করছেন। ধূমপায়ীর সকল অঙ্গ ধূমপানের অনিষ্টে আক্রান্ত হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে, অন্যান্য ক্ষতিকর বস্তু থেকে ধূমপানের ক্ষতি অনেক বেশী, যা হিসাবের বাইরে। কবি বলেন:

يا مَنْ يُريدُ دمارَ صِحّتِهِ وَيَهْـ *** وَى الموتَ منتحرًا بلا سِكِّينِ

لا تيأسنَّ فإنَّ مثلَكَ واجــــدٌ *** كلَّ الــذي يرجوه بالتدخينِ

“কে আছ তুমি, যে নিজের সুস্থতা ধ্বংস করতে চাও ও বিনা ছুরিতে কেটে মৃত্যু কামনা কর। তুমি নিরাশ হয়ো না, তোমার ন্যায় লোকের অভাব নেই, ধূমপান করে মৃত্যু কামনাকারী সবাই তোমার দলের”।

২৭- মানুষ মাত্র ক্যান্সারকে খুব ভয় পায়। ক্যান্সারের নাম শোনার সাথে ভয়ে ও আতঙ্কে শরীর শিউরে উঠে। অথচ আপনি ধূমপান করে নিজের মধ্যে ক্যান্সারের প্রকোপ বৃদ্ধি করছেন ও তার দিকে দ্রুত ধাবিত হচ্ছেন। আপনি জানেন ধূমপান একাধিক ক্যান্সারের প্রধান কারণ? জেনে রাখুন, ধূমপান ফুসফুসে ক্যান্সার, স্বরযন্ত্রী ও ঠোঁটে ক্যান্সার, ইসফাগিয়াল ক্যান্সার, অন্ননালী ক্যান্সার, মুখের ক্যান্সার, জিহ্বার ক্যান্সার, অগ্ন্যাশয় ক্যান্সার, মূত্রাশয় ক্যান্সার ও কিডনি ক্যান্সারের কারণ।

২৮- দাঁত মানুষের সৌন্দর্য। মানুষ চায় সুন্দর অবয়ব ও পরিপাটি হয়ে মানুষের সাথে মিলিত হতে। তাই তারা দাঁতের যত্ন নেয় ও দাঁতের চিকিৎসার জন্য হাজার হাজার টাকা খরচ করে। কারণ দাঁত মুখের সৌন্দর্য। অথচ আপনি ধূমপান করে আল্লাহর দেয়া মাড়ি, মুখ, জিহ্বা, ঠোঁট ও দাঁত কালো, ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্গন্ধময় করছেন!

২৯- বিষ মানুষের শরীরের ঘাতক, জীবন বিনষ্টকারী ও মৃত্যুর অপর নাম। মানষিক রোগী ও বিকারগ্রস্ত ব্যতীত কেউ তা স্বেচ্ছায় গ্রহণ করে না, অথচ আপনি ধূমপান করে দেখে-শুনে বিষ পান করছেন, অর্থের অপচয় করছেন।

আপনি জানেন সিগারেটের ধোঁয়ায় আনুমানিক 1000 বিষাক্ত উপসর্গ রয়েছে, সবচেয়ে বিপজ্জনক ও সর্বাধিক ক্ষতিকর হল নিকোটিন ও কার্বন মনো অক্সাইড। সবুজ তামাক পাতায় ২% থেকে 10% পার্সেণ্ট ও পেষা চূর্ণিত পাতায় ০.৫% থেকে 5% পার্সেণ্ট নিকোটিন থাকে। বাজারে সরবরাহকৃত সিগারেটে রয়েছে 1% থেকে 3% পর্যন্ত নিকোটিন।

নিকোটিনের ওপর পরিচালিত গবেষণা দ্বারা নিম্নের বিষয়গুলো প্রমাণিত হয়েছে:

ক. নিকোটিন দ্বারা শরীরের সকল টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

খ. একগ্রাম নিকোটিন বড় দশটি কুকুর হত্যার জন্য যথেষ্ট।

গ. একঘন সেন্টিমিটার নিকোটিন দ্রুত সময়ে একটি ঘোড়া হত্যার জন্য যথেষ্ট।

ঘ. একফোটা নিকোটিন মুহূর্তে একটি ইঁদুর হত্যার জন্য যথেষ্ট।

ঙ. ৫০ মিলিগ্রাম নিকোটিন ইনজেকশন দ্বারা পুশ করা হলে একজন মানুষ হত্যার জন্য যথেষ্ট।

কার্বন মনো অক্সাইড রক্তের অক্সিজেন চোষণ ক্ষমতা ও অক্সিজেন থেকে টিস্যুর উপকৃত হওয়ার শক্তি হ্রাস করে।

৩০- সারকথা ধূমপান অনেক রোগের জন্ম দেয়। ধূমপানের ধর্ম হচ্ছে মানুষ ধ্বংস করা ও তাদের জীবন দুর্বিষহ করা। ধূমপানের অনিষ্ট শরীরের এক জায়গায় স্থির থাকে না, বরং বিভিন্ন জায়গায় বিস্তার লাভ করে, এক সময় ধূমপায়ীর সকল অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। ধূমপানের আরো কতক ক্ষতি:

ধূমপানের কারণে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, বদ হজম, লিভার সিরোসিস, ব্রেন স্ট্রোক, ফুসফুসে যক্ষ্মা, ফুসফুসের ক্ষমতা হ্রাস ও কণ্ঠনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মস্তিষ্কের ধমনীতে ক্ষত সৃষ্টি হয়, মস্তিষ্ক ধমনী সংকীর্ণ হয়, মস্তিষ্ক নালীর স্থূলতা বাড়ে, বমি বমি ভাব, ডায়রিয়া ও দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠবদ্ধতা হয়। মাথা ব্যথা, মাথা ঝিমঝিম করা, অনিদ্রা, কিডনির অকৃতকার্যতা, শ্রবণেন্দ্রিয়ের দুর্বলতা বৃদ্ধি পায় এবং নাকের অনুভূতি নিঃশেষ বা দুর্বল হয়। ধূমপান এলার্জি বৃদ্ধি করে, চামড়া সংক্রমণ ব্যাধিতে আক্রান্ত করে, পেটে ব্যথা ও গ্রহণী জাতীয় নানা রোগের সৃষ্টি করে। এ ছাড়া অনেক গুরুতর রোগের জন্ম দেয় ধূমপান। পুরো শরীরের ক্রিয়া মন্থর করে।

৩১- ধূমপানের অনিষ্ট পাশে থাকা অধূমপায়ীকে আক্রান্ত করে। ধূমপান পেটের বাচ্চা ও গর্ভের ভ্রূণ ক্ষতি করে। ধূমপানের কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ধূমপানের ফলে বায়ু দূষণ হয়। বলাবাহুল্য ধূমপান ও গাড়ি দুর্ঘটনা একে অপরের সাথে সংশ্লিষ্ট।

ধূমপায়ী প্রিয় পাঠক, আপনি এখনো ধূমপানের ক্ষতি সম্পর্কে নিশ্চিত হননি! ধূমপান যে অবৈধ ও ক্ষতিকর, এতে কি আপনার কোনো সন্দেহ আছে? বিবেকী ও চিন্তার অধিকারী ব্যক্তির জন্য এ আলোচনা কি যথেষ্ট নয়!?

আপনি আপনার অভ্যাস মোতাবেক বলবেন: নিশ্চয়, নিশ্চয় যথেষ্ট।

তাহলে আমার জিজ্ঞাসা আপনি কখন ধূমপান ত্যাগ করবেন?

আপনি নিশ্চয় বলবেন: আগামী কাল বা আগামী পরশু অথবা ধূমপান ত্যাগ করার চেষ্টা করব।

তাহলে আমার সংশয় পূর্বের আলোচনা থেকে আপনি নিশ্চিত হন নি, আপনি ধূমপান অব্যাহত রাখবেন, কখনো ত্যাগ করবেন না।

আপনি বলবেন: না, ক্ষমা করবেন, আমি পুরোপুরি নিশ্চিত, কিন্তু ধূমপান ত্যাগ করা আমার জন্য কষ্টকর। একবারে ত্যাগ করা কঠিন বা পুরোপুরি ত্যাগ করতে পারব না।

প্রিয় পাঠক, তাহলে সমাধান কি? আমরা আপনার থেকে নিরাশ বসে থাকব? আপনি আপনার দীন-দুনিয়া বিনষ্ট করবেন আমরা তা নিশ্চুপ প্রত্যক্ষ করব?

আপনি বলবেন: না, এ পর্যায়ে পৌঁছেনি, কিন্তু করার কি আছে?

হয়ত আপনি বলবেন: ধূমপান থেকে মুক্তির অন্য পথ গ্রহণ করব। ধূমপান ত্যাগ করে গুল ব্যবহার করব অথবা হুক্কা ব্যবহার করব, যা ধূমপানের তুলনায় কম ক্ষতিকর।

আমি বলব: না, এরূপ কখনো করবেন না। এর অর্থ হচ্ছে রৌদ্র থেকে বাচার জন্য আগুনের আশ্রয়ে যাওয়া! আপনি জানেন না গুল ও হুক্কার মধ্যে ধূমপানের ন্যায় ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে!

হয়ত আপনি বলবেন: ধূমপানের চেয়ে কম নিকোটিন যুক্ত মাদক গ্রহণ করব, কারণ কতক বস্তুর ক্ষতি কতক বস্তুর তুলনায় কম।

আমি বলব: এটা বড় ধোকা, এসব বস্তুর ক্ষতি নিশ্চিত, কারণ:

ক. এভাবে সিগারেটের বিকল্প অধিক মাদক গ্রহণ করা হয়।

খ. এভাবে ধূমপায়ীরা সিগারেটের চেয়ে অধিক শ্বাস গ্রহণ করে।

গ. এভাবে ধূমপায়ীরা গভীরভাবে শ্বাস গ্রহণ করে এবং যতক্ষণ তা ধরে রাখে, যেন সিগারেটের চাহিদা পূর্ণ হয়।

ঘ. এসব পদ্ধতি আপনাকে অধিক মাদক গ্রহণের দিকে নিয়ে যাবে, আপনার অনিচ্ছা ও অজ্ঞতাসারে!

অতএব সমাধান হিসেবে তা গ্রহণ করার কোন সুযোগ নেই।

হয়ত আপনি বলবেন: আমাকে আপনি অপারগ করে দিয়েছেন। আমার সকল পথ আপনি বন্ধ করে দিয়েছেন।

আমি আপনাকে থামিয়ে দিয়ে বলব: না ভাই, আমি আপনাকে অপারগ করি নি, আমি আপনার পথ সংকীর্ণ করি নি। এ কথা ঠিক যে, প্রত্যেক রোগের ওষুধ রয়েছে, প্রত্যেক সমস্যার সমাধান রয়েছে।

হয়ত আপনি বলবেন: তাহলে সমাধান কি?

আমি বলব: এখনি আপনি ধূমপান ত্যাগ করুন, কখনো তা গ্রহণ করবেন না। হয়ত আপনি আবেগ, উচ্ছ্বাস, আশা ও আনন্দ চিত্তে বলবেন: কিভাবে ত্যাগ করব? এ ধ্বংসাত্মক ব্যাধি থেকে মুক্তির পথ কি? কার্যকর পদ্ধতি কোনটি?

আমি বলব: প্রিয় ভাই, আপনার কান আমাকে ধার দিন, আমার জন্য আপনার অন্তর খুলে দিন, অবশ্যই আপনি পেয়ে যাবেন আপনার তৃষ্ণা নিবারণকারী মদিরা ও ব্যাধি থেকে মুক্তকারী মহৌষধ!

লক্ষ্য করুন: ধূমপান ছাড়ার কিছু সহায়ক উপায় পেশ করছি:

১- স্মরণ করুন ধূমপান ক্ষতিকর ও শরীয়তের দৃষ্টিতে হারাম। কখনো ভুলবেন না ইসলামের দৃষ্টিতে ধূমপান হারাম এবং ধূমপান শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এ দু’টি বিষয়ই আপনাকে ধূমপান ত্যাগ করতে সহায়তা করবে।

বারবার ধূমপান করা, ধূমপানের নিষেধাজ্ঞার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করা ধূমপান বৈধ স্বীকৃতি দেয়া ও তার অনিষ্ট অস্বীকার করার নামান্তর, যা ধূমপান করার চেয়ে মারাত্মক!

২- ধূমপান করব না মর্মে খালেস দিলে তওবা করুন। আপনার নিকট যখন স্পষ্ট হল, আপনি যখন নিশ্চিত হলেন যে, ধূমপান শরীর ও দীনের জন্য ক্ষতিকর, অতএব আপনি আপনার রবের নিকট তওবা করুন। ধূমপানের কারণে আপনার শরীর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগেই আপনি হিদায়েতের দিকে ফিরে আসুন। হঠাৎ মৃত্যু হানা দেয়ার আগেই আপনি লজ্জা, শরম ও দ্বিধা ত্যাগ করে সঠিক পথ গ্রহণ করুন। খবরদার কখনো আগামী কাল, বা এই ছেড়ে দিচ্ছি দিব বলবেন না, কারণ এটাও এক ধরণের পাপ, যা থেকে তওবা করা জরুরী।

৩- আল্লাহর জন্য ইখলাস গ্রহণ করুন। খাঁটি ইখলাসই ধূমপান ও অন্যান্য হারাম বস্তু ত্যাগ করার জন্য যথেষ্ট। আপনি যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার নিমিত্তে এবং তার ভয় ও আযাব থেকে দূরে থাকার জন্য ইখলাস গ্রহণ করেন, সত্যিকার তওবা করেন, তাহলে অবশ্যই আল্লাহ আপনাকে তাওফিক দিবেন, আপনার তাওবা কবুল করবেন। আল্লাহ আপনাকে নিরাশ করবেন না, ধূমপান ত্যাগ করা আপনার জন্য তিনি সহজ করবেন। আপনাকে তার কল্যাণ অর্জন করার তাওফিক দিবেন।

৪- অন্তর আল্লাহর মহব্বত দ্বারা পূর্ণ করুন। যার মধ্যে আল্লাহর মহব্বত রয়েছে সে বিচ্যুতি থেকে নিরাপদ। আমাদের অন্তরের ক্ষুধা, অভাব ও শূন্যতা একমাত্র আল্লাহর মহব্বতেই পূর্ণ হতে পারে। আল্লাহর মহব্বতের ফলে অন্তর তৃপ্ত ও আনন্দিত হয়, বরং নফসের প্রিয় বস্তু ত্যাগ করে আল্লাহর দিকে ধাবিত হয়।

বস্তুত মানুষের অন্তরে আল্লাহর মহব্বতের ঘাটতির অনুপাতে চিন্তা, পেরেশানি ও দুঃখ বাসা বাঁধে।

আল্লাহর মহব্বত থেকে যে অন্তর একেবারে শূন্য, সে অন্তর দুশ্চিন্তা, দুঃখ ও কষ্ট থেকে কখনো মুক্তি পায় না। তার অন্তরে অন্য সকল মহব্বত ভিড় করে, তার কার্যাদি বিক্ষিপ্ত ও এলোমেলো করে দেয়। অতএব ধূমপানে অভ্যস্ত ব্যক্তির আল্লাহ মহব্বত দ্বারা অন্তর পূর্ণ করা ব্যতীত কোনো উপায় নেই।

শায়খুল ইসলাম ইব্‌ন তাইমিয়াহ রহ. বলেন: আল্লাহর ইবাদত, মহব্বত ও তার দিকে মনোনিবেশ ব্যতীত অন্তর কখনো সুখ, সফলতা, নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা পায় না। উপভোগ ও বিনোদনের সকল বস্তু থাকা সত্যেও সে তৃপ্ত হয় না, প্রকৃত আনন্দ লাভ থেকে বঞ্চিত হয়। কারণ তার অন্তর সে উপাদান থেকে শূন্য, যার মাধ্যমে প্রকৃত সুখ ও কল্যাণ লাভ হয়।[4]

প্রিয় পাঠক, আপনি যদি আল্লাহর মহব্বত আপনার মূল লক্ষ্যে পরিণত করেন, গোপনে ও প্রকাশ্যে আল্লাহকে স্মরণ করেন, তাহলে ইনশাআল্লাহ আপনার প্রবৃত্তি ও নফসের ওপর আপনি বিজয়ী হবেন। শয়তানকে আপনি পরাস্ত করতে পারবেন।

আল্লাহর মহব্বত অর্জন করার মাধ্যম হচ্ছে ফরয পরবর্তী নফল আদায় করা, সর্বাবস্থায় আল্লাহর স্মরণ করা। এ নিয়ে সামনে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।

অতএব আপনার সামনে যখন আল্লাহর মহব্বতের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত হল, আপনি কিভাবে তা গ্রহণ করেন বা তাতে অভ্যস্ত হন যা আল্লাহর মহব্বতকে ক্ষতিগ্রস্ত করে?!

৫- আল্লাহর সাহায্য তলব করুন। ধূমপান ত্যাগ করার উপকরণ গ্রহণ করুন, যার বর্ণনা সামনে আসছে। অতঃপর আপনার বিষয় আল্লাহর নিকট সোপর্দ করুন। তার নিকট সাহায্য ও মদদ তলব করুন। আল্লাহ আপনাকে সাহায্য করবেন, আপনার ওপর সদয় হবেন, যা আপনার কল্পনার অতীত। তিনি সুন্দর সাহায্যকারী ও উত্তম অভিভাবক। ইরশাদ হচ্ছে:

﴿ وَمَن يَتَوَكَّلۡ عَلَى ٱللَّهِ فَهُوَ حَسۡبُهُۥٓۚ﴾ [الطلاق : ٣] 

“আর যে আল্লাহ ওপর তাওয়াককুল করে আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট”। [সূরা তালাক: (৩)]

৬- ধূমপান ত্যাগ করার উপকারিতা স্মরণ করুন। কারণ যার উপকারিতা স্বীকৃত তা গ্রহণ করা সহজ হয়। যখনি ধূমপানের কথা মনে পড়ে, ধূমপান ত্যাগ করা কষ্টকর লাগে, তখনি ধূমপানের অনিষ্ট সম্পর্কে চিন্তা করুন। আশা করি এভাবেই ধূমপান ত্যাগ করা আপনার জন্য সহজ হবে।

স্মরণ করুন আল্লাহর জন্য যে কোনো বস্তু ত্যাগ করল, আল্লাহ তাকে তার চেয়ে উত্তম বস্তু দান করেন। সবচেয়ে উত্তম বস্তু আল্লাহর মহব্বত, অন্তরের প্রশান্তি, কর্মের শক্তি, সামর্থ্য, চঞ্চলতা ও আল্লাহর ওপর সন্তুষ্টি।[5]

আরো স্মরণ করুন কষ্টকর ইবাদতে যেমন অধিক সাওয়াব, তেমনি অভ্যস্ত পাপ ত্যাগ করা অধিক সাওয়াব।

স্মরণ করুন ধূমপান ত্যাগ করে নিজেকে নিশ্চিত ক্ষতি থেকে রক্ষা করছেন।

প্রবৃত্তি ও নফসের ওপর বিজয়ী হওয়ার স্বাদ স্মরণ করুন, এ স্বাদই বড় স্বাদ।

৭- ধূমপানের অনিষ্ট ও ধূমপান ত্যাগ করার উপকারিতা তুলনা করুন। আপনি ধূমপানের ক্ষণিক স্বাদ স্মরণ করুন, যদি তাতে স্বাদ থাকে, তাহলে আপনার নিকট ধূমপানের অনিষ্ট স্পষ্ট হয়ে যাবে। যে স্বাদ ক্ষণিকেই নিঃশেষ হয় তার বিনিময়ে আপনি কিভাবে ধ্বংস, দুশ্চিন্তা, দুঃখ ও কষ্ট প্রাধান্য দেন!?

৮- দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করুন। আপনার মধ্যে ধূমপান ত্যাগ করার যত ইচ্ছা থাক, আপনি ধূমপানের ক্ষতি সম্পর্কে যতই জানুন, যদি আপনার মধ্যে সত্যিকার প্রতিজ্ঞা না থাকে ধূমপান ত্যাগ করতে পারবেন না।

৯- ধূমপান ত্যাগ করার জন্য শক্তিশালী ইচ্ছা জরুরী। শক্তিশালী ইচ্ছাই কঠিন কাজ সহজ করে দেয়, তা বাস্তবায়নের জন্য সামনে অগ্রসর হতে সাহায্য করে। শক্তিশালী ইচ্ছার অধিকারী কোনো বাধার সম্মুখে থামে না, বরং সামর্থ্যের সবটুকু ব্যয় করে সামনে অগ্রসর হয়। তার নিকট সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করার চেয়ে কঠিন কোনো কাজ নেই।

এটাই মানুষের সফলতার মাপকাঠি, দৃঢ়চিত্তের পরিচয়। দৃঢ়চিত্তরা কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে পিছপা হয় না, মসৃণ ও কণ্টকাকীর্ণ সব পথই অতিক্রম করে, সহজ ও কঠিন সকল উপকরণ গ্রহণ করে।

এ কথা ঠিক যে, মানুষের শরীরে যেমন নানা রোগ-ব্যাধির উপসর্গ দেখা দেয়, তেমনি তার সৎ ইচ্ছার ওপর বাধার সৃষ্টি হয়, ফলে সে প্রবৃত্তির মোকাবেলা করতে সক্ষম হয় না, বাধা ও বিপত্তি অতিক্রম করে সামনে অগ্রসর হতে পারে না। এর নিদর্শন হচ্ছে মানুষ কোনো কল্যাণের সিদ্ধান্ত নিল, কিন্তু পরক্ষণে তার মধ্যে হীনমন্যতা বাসা বাঁধে, ফলে সে প্রবৃত্তির দাসে পরিণত হয়। অন্যথায় অধিকাংশ ধূমপায়ী জানে ধূমপান হারাম, ধূমপান ত্যাগ করার ইচ্ছা করে, কিন্তু পরবর্তীতে তার ইচ্ছা দুর্বল হয়ে অনিচ্ছায় পরিণত হয়।

ইচ্ছার এ দুর্বলতা দূর করার জন্য এমন কিছু করুন যা কষ্ট ও সাধনা দাবি করে। অতঃপর আস্তে আস্তে নফসকে কঠিন কাজে অভ্যস্ত করুন। আত্মসমালোচনা করুন, সাওয়াব ও শাস্তির কথা চিন্তা করুন ইত্যাদি।

১০- ধৈর্য ধারণ করুন। ধৈর্য সুন্দর আখলাক ও প্রশংসিত স্বভাব। প্রত্যেক মানুষ ধৈর্যের মুখাপেক্ষী। অনিচ্ছা ও অপছন্দনীয় সকল বিষয়ে ইচ্ছা-অনিচ্ছায় ধৈর্য ধারণ করা অপরিহার্য। সম্মানিত ব্যক্তিরা স্বেচ্ছায় ধৈর্য ধারণ করে, কারণ সে তার পরিণতি সম্পর্কে জানে, ধৈর্যহীনতার কারণে মানুষ তিরস্কারের সম্মুখীন হয়।

সন্দেহ নেই ধূমপান ত্যাগ করার শুরুতে কষ্ট হবে, কারণ ধূমপান ত্যাগ করা নফসের জন্য কঠিন, কিন্তু অসম্ভব ও অবাস্তব নয়।

ইব্‌নুল কাইয়্যূম রহ. বলেন: ‘চিরাচরিত স্বভাব ও পছন্দের বস্তু ত্যাগ করা তার জন্যই কষ্টকর, যে তা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ করে। কিন্তু ইখলাসের সাথে আল্লাহর জন্য যে তা ত্যাগ করল, সে তাতে কষ্ট অনুভব করে না। প্রথম প্রথম অবশ্যই কষ্ট হয়, কিন্তু সে তাতে বিজয়ী হয়। সে তার প্রতিজ্ঞায় সত্যবাদী প্রমাণ দেয়। কষ্টের ওপর ধৈর্য ধারণই এক সময় স্বাদ ও সুখে পরিণত হয়’।[6]

প্রিয় পাঠক, ধৈর্যের তিক্ততা গলাধঃকরণ করুন, শুরুতে বঞ্চিত হোন, শেষে নিশ্চয় আপনি তার স্বাদ ও মিষ্টতা আস্বাদন করবেন। কোন কবি বলেছেন:

والصبر مثلُ اسمه مرٌّ مذاقَتُهُ *** لكنْ عواقُبُه أحلى من العسل

“সবর তার শব্দের মতই আস্বাদন করা তিক্ত (ফিটকিরীকে আরবীতে ‘সবর’ বলা হয়, যা তিক্ত), কিন্তু তার পরিণতি মধুর চেয়ে মিষ্টি”। অপর কোন কবি বলেছেন:

وقلَّ مَنْ جدَّ في أمرٍ تَطَلَّبَهُ *** واستصحب الصبرَ إلا فاز بالظَّفَرِ

والصبرُ أكرمُ من صحبتَ مواسيًا *** يحنو على الكبد الجديب فيينعُ

“দুষ্কর হবে তাদের সন্ধান পাওয়া, যারা কোন বিষয়ে ধৈর্যের সাথে কঠোর পরিশ্রম করেও সফল হন নি। আপনি যাদের সঙ্গ গ্রহণ করেছেন তাদের মধ্যে ধৈর্যই অধিক সান্ত্বনা দানকারী, ধৈর্যই ক্ষত হৃদয়কে সমবেদনা জানায়, ফলে সে সতেজ হয়ে ওঠে”।

আরো মনে রাখুন, ধৈর্যের কারণে আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনি সাহায্য প্রাপ্ত হবেন। আল্লাহ ধৈর্যশীলদের পছন্দ করেন, তিনি ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‎ বলেন:

«ومن يتصبر يصبره الله».

“যে ধৈর্য ধারণের চেষ্টা করে, আল্লাহ তাকে ধৈর্য ধারণ করার তাওফিক দান করেন”।[7]

মনে রাখুন, ধূমপানের কারণে যেসব সমস্যার সৃষ্টি হয়, তা চিন্তা করলে ধূমপান ত্যাগ করে ধৈর্য ধারণ সহজ।

১১- ধূমপান ত্যাগ করার জন্য মুজাহাদা বা কঠোর প্রচেষ্টা করুন। আল্লাহর পক্ষ থেকে মুজাহাদাকারীর জন্য কল্যাণ, হিদায়াত ও তাওফিকের সুসংবাদ রয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

﴿ وَٱلَّذِينَ جَٰهَدُواْ فِينَا لَنَهۡدِيَنَّهُمۡ سُبُلَنَاۚ وَإِنَّ ٱللَّهَ لَمَعَ ٱلۡمُحۡسِنِينَ ٦٩ ﴾ [العنكبوت: ٦٩] 

“আর যারা আমার পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, ‎তাদেরকে আমি অবশ্যই আমার পথে ‎পরিচালিত করব। আর নিশ্চয় আল্লাহ ‎সৎকর্মশীলদের সাথেই আছেন”। [সূরা আনকাবুত: (৬৯)]‎

প্রিয় পাঠক, আল্লাহর জন্য মুজাহাদা করুন, নিজেকে নফসের প্রবৃত্তি থেকে দূরে রাখুন, অন্যথায় সে আপনাকে গোমরাহি ও অকল্যাণের দিকে ধাবিত করবে।

ইব্‌ন মুবারক রহ. বলেন:

ومن البلايا من البلاء علامة *** ألا يرى لك من هوالك نزوع

العبد عبد النفس في شهواتها *** والحر يشبع تارة ويجوع

“মুসিবতের মুসিবত হচ্ছে মুসিবতের নিদর্শন যে, ধ্বংস্তূপ থেকে উত্তরণের তোমার কোনো আগ্রহ নেই। বান্দা তার প্রবৃত্তির অনুসরণে নফসের গোলামে পরিণত হয়, আর স্বাধীন কখনো পরিতৃপ্ত হয় কখনো হয় ক্ষুধার্ত”। অপর কবি বলেছেন:

والنفس إن أعطيتها مناها*** فاغرةٌ نحو هواها فاها

“নফস এমন, যদি তুমি তার সব চাওয়া পূর্ণ কর, মুখ হা করে সে তার বাসনার দিকে ছুটবে”। অপর কবি বলেছেন:

إذا المرء أعطى نفسه كلَّ ما اشتهت * ولم ينهها تاقت إلى كل مطلب

“ব্যক্তি যদি তার নফসের সকল চাহিদা পূর্ণ করে, কোনো বিষয়ে তাকে বারণ না করে, তাহলে সে প্রত্যেক চাহিদার দিকেই ধাবিত হবে”।

একবার বা দুইবার চেষ্টা করার নাম মুজাহাদা নয়, বরং মুজাহাদা হচ্ছে মৃত্যু পর্যন্ত চেষ্টা অব্যাহত রাখা।

১২- ধূমপান ত্যাগ করার জন্য দুর্দান্ত হিম্মত থাকা চাই। আপনার মধ্যে ধূমপান ত্যাগ করার হিম্মত না থাকলে কখনোই ধূমপান ত্যাগ করতে পারবেন না। ধূমপান করা খারাপ স্বভাব, ধূমপান করা অপমান।

আপনি জানেন না ধূমপায়ী শুধু মুসলিমদের নিকটই হীন নয়, বরং পশ্চিমা অমুসলিম দেশেও ধূমপানকে খারাপ দৃষ্টিতে দেখা হয়। পশ্চিমা ডাক্তার ও শিক্ষিত সমাজ এক সময় ধূমপান করলেও এখন তারা ধূমপান করেন না। ধূমপায়ীকে হেয় দৃষ্টিতে দেখেন।

خُلِقْتُ أبيَّ النفسِ لا أَتْبَعُ الهوى * ولا أستقي إلا من المشرب الأصفى

ولا أتحرَّى العزَّ فيما يُذِلُّني * ولا أخطب الأعمال كي لا أرى صرفًا

ولست على طبع الذباب متى يُذَدْ*عن الشيء يسقطْ فيه هو يرى الحتفا

“আমাকে প্রবৃত্তির বিরোধী করে সৃষ্টি করা হয়েছে, আমি কখনো প্রবৃত্তির অনুসরণ করব না, পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন পানি ব্যতীত পান করব না। যা আমাকে অসম্মান করে, তাতে আমি কখনো সম্মান তালাশ করব না। আমি কাজকে সম্বোধন করব না যেন পলায়নের কোন পথ না দেখি। আমার স্বভাব মাছির মত নয় যে, যখনি কোন বস্তু হতে হটিয়ে দেয়া হবে তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ব, অথচ মাছি মৃত্যু দু’চোখে দেখে”।[8]

১৩- নিজের মধ্যে শরম রাখুন। শরম আপাদ-মস্তক কল্যাণ আর কল্যাণ। শরম ইসলামী আখলাক, ঈমানের একটি অঙ্গ। আপনি যদি লজ্জাশীল হন, লজ্জা আপনাকে কল্যাণের দিকে ধাবিত করবে, আপনার থেকে অকল্যাণ দূর করবে। কারণ লজ্জা এমন স্বভাব যা কল্যাণের দিকে ধাবিত করে ও অকল্যাণ থেকে দূরে রাখে।

লজ্জাশীল ব্যক্তি অপমান ও দুনিয়া-আখিরাতের শাস্তিকে ভয় করে, যে কারণে সে কল্যাণ গ্রহণ করে ও খারাপি থেকে দূরে থাকে।

১৪- জামাতের সাথে সালাত আদায় করুন। সালাত অশ্লীল ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

﴿إِنَّ ٱلصَّلَوٰةَ تَنۡهَىٰ عَنِ ٱلۡفَحۡشَآءِ وَٱلۡمُنكَرِۗ ٤٥ ﴾ [العنكبوت: ٤٥] 

“নিশ্চয় সালাত অশ্লীল ও মন্দকাজ থেকে বিরত ‎রাখে”। [সূরা বাকারা: (৪৫)]‎

সালাত যেসব বস্তু থেকে বিরত রাখে, ধূমপান তার মধ্যে অন্যতম। যদি আপনি ঠিকমত সালাত আদায় করেন, সালাতে একাগ্রতা ঠিক রাখেন সন্দেহ নেই সালাত আপনাকে ধূমপান থেকে বিরত রাখবে।

১৫- ধূমপান ত্যাগ করার নববী চিকিৎসা সিয়াম। সিয়াম নফসকে পরিশুদ্ধ করে, সুন্দর চরিত্র দান করে, প্রবৃত্তি ও মনের সাথে যুদ্ধ শেখায়। এভাবে ইচ্ছার মধ্যে দৃঢ়তা সৃষ্টি হয়, ইচ্ছা মজবুত হয় ও হারাম বস্তু ত্যাগ করার শক্তি অর্জন হয়।

১৬- ধূমপান ত্যাগ করার জন্য দো‘আ করুন। দোয়ার ফলে পতিত মুসিবত দূর হয়, অনাগত মুসিবত হটে যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ وَقَالَ رَبُّكُمُ ٱدۡعُونِيٓ أَسۡتَجِبۡ لَكُمۡۚ ٦٠ ﴾ [غافر: ٦٠] 

“আর তোমাদের রব বলেছেন, ‎‘তোমরা আমাকে ডাক, আমি ‎‎তোমাদের জন্য সাড়া দেব”। [সূরা গাফের: (৬০)] ‎অন্যত্র তিনি বলেন:

﴿ وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌۖ أُجِيبُ دَعۡوَةَ ٱلدَّاعِ إِذَا دَعَانِۖ ١٨٦ ﴾ [البقرة: ١٨٦] 

“আর যখন আমার বান্দাগণ তোমাকে আমার ‎সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, আমি তো নিশ্চয় ‎নিকটবর্তী। আমি আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া ‎‎দেই, যখন সে আমাকে ডাকে”। [সূরা বাকারা: (১৮৬)]

অতএব বেশী করে দো‘আ করুন, ইনশাআল্লাহ আল্লাহ আপনার দো‘আ শ্রবণ করবেন, আপনাকে মুসিবত থেকে মুক্তি দিবেন। আপনি দো‘আ কবুলের উপযুক্ত সময়, পরিস্থিতি ও পরিবেশ তালাশ করুন। যেমন সেজদায় দো‘আ করুন, শেষ রাতে দো‘আ করুন, আযান ও ইকামাতের মাঝে দো‘আ করুন। অন্তরের একাগ্রতা ও এখলাস নিয়ে নিরুপায়ীদের ন্যায় দো‘আ করুন।[9]

ماضاق بالمرء أمر فاستعد له *** عبادة الله إلا جاءه الفرج
ولا أناخ بباب الله ذو ألم *** إلا تزحزح عنه الهم

“ব্যক্তিকে যখনি কোন সমস্যা পিষ্ট করে, অতঃপর তার জন্য আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হয়, তার অবশ্যই মুক্তি আসবে। এমন হয়নি কোন মুসিবতগ্রস্ত আল্লাহর দরজার কড়া নাড়ছে, কিন্তু তার মুসিবত দূর হয় নি”। অপর এক কবি বলেছেন:

والجأ لسيدك الذي لا تأتي *** أبداً بفيض حنانها تتمتع

“আপনি আপনার মনিবের আশ্রয় গ্রহণ কর, শুধু অনুগ্রহে অবগাহন করে ভোগে লিপ্ত হয়ো না”।

১৭- অধিক কুরআন তিলাওয়াত করুন। অধিক কুরআন তিলাওয়াত অন্তরের প্রতিষেধক স্বরূপ। দো‘আ আল্লাহর জমিনে দস্তরখান স্বরূপ। এতে রয়েছে হিদায়াত, নূর, খুশি ও বিনোদন।

প্রিয় পাঠক, কুরআনের প্রতি মনোযোগী হোন, তার চিকিৎসা গ্রহণ করুন, অধিক কুরআন তিলাওয়াত করুন, কুরআন শ্রবণ করুন, মুখস্থ করুন, কুরআন নিয়ে চিন্তা করুন, যেন আপনার অন্তর সুস্থ হয়, নফস পবিত্র হয় ও আপনার জীবন সুখকর হয়। কোন কবি বলেছেন:

وكتابُ ربِّك إن في نفحاته*** من كل خير فوق ما يُتَوَقَّعُ

نورُ الوجود وأنسُ كلِّ مروَّعٍ *** بكروبه ضاق الفضاء الأوسعُ

والعاكفون عليه هم جلساء مَنْ *** لجلاله كلُّ العوالم تخشعُ

فادفن همومك في ظلال بيانه *** تحْلُ الحياة وتطمئنَّ الأضلعُ

فبكل حرفٍ من عجائب وحيه *** نبأٌ يبشر أو نذير يقرعُ

“আর তোমার রবের কিতাব, যার সুগন্ধে রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ, যা তোমার ধারণার অতীত। নুরের উপস্থিতি এবং প্রত্যেক দুঃখী ব্যক্তির সান্ত্বনা, যার মুসিবতে প্রশস্ত আসমান সংকীর্ণ হয়ে গেছে। তার কাছে অবস্থানকারীগণ তার মেহমান, যার মহত্বের নিকট পুরো জগত অবনত। অতএব তুমি কুরআনের ব্যাখ্যার ছায়ায় তোমার চিন্তাগুলো দাফন কর, তোমার জীবন সুখকর হবে এবং শিরা উপশিরা প্রশান্তি বোধ করবে। তার প্রত্যেক হরফে ওহীর আশ্চর্য কারিশমা, হয় সুখের সংবাদ অথবা শাস্তির সতর্ক বার্তা”।

১৮- আল্লাহর অধিক যিকির করুন। আল্লাহর যিকির দ্বারা অন্তর পরিশুদ্ধ হয়, মনে স্থিরতা আসে। যিকিরকারীকে আল্লাহর রহমত ঢেকে নেয় ও তার ওপর সাকীনা [বিশেষ রহমত বা প্রশান্তি] নাযিল হয়। যিকির দ্বারা মনের দুশ্চিন্তা ও কু-ভাবনা দূর হয়। অতএব আল্লাহর অধিক যিকির করুন। বিশেষ করে ফজিলতপূর্ণ যিকির গ্রহণ করুন, কুরআনের পরেই যার অবস্থান, বা যা কুরআনের অংশ, যেমন:

سبحان الله، والحمد لله، ولا إله إلا الله، والله أكبر.

অনুরূপ পড়ুন:

لا حول ولا قوة إلا بالله

এ বাক্যগুলো জান্নাতের খাজানার অংশ। মুসিবত ও কষ্টের সময় এ বাক্যগুলো পাঠ করলে সুফল মিলে।

১৯- শয়তান থেকে আল্লাহর নিকট পানাহ চান। শয়তান আপনার সামনে পাপকে সুন্দরভাবে পেশ করে ও তাতে আকৃষ্ট করে। তাই যখন আপনার মনে ধূমপান করার ইচ্ছা হয়, আপনি শয়তান থেকে পানাহ চান। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ وَإِمَّا يَنزَغَنَّكَ مِنَ ٱلشَّيۡطَٰنِ نَزۡغٞ فَٱسۡتَعِذۡ بِٱللَّهِۚ إِنَّهُۥ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ٢٠٠ ﴾ [الاعراف: ١٩٩] 

“আর যদি শয়তানের পক্ষ হতে কোন প্ররোচনা ‎‎তোমাকে প্ররোচিত করে, তবে তুমি আল্লাহর ‎আশ্রয় চাও। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ”। [সূরা বাকারা: (২০০)]‎

২০- অবসরতা ও একাকীত্ব পরিহার করুন। অবসর সময় মানুষকে ধূমপানে অভ্যস্ত করে। তাই একা দুশ্চিন্তা নিয়ে বসে না থেকে কাজে ব্যস্ত হোন। পড়াশোনা কর, ক্লাসের পড়ায় মন দাও যদি ছাত্র হও। অথবা আত্মীয় স্বজনদের সাক্ষাত করুন ও তাদের প্রয়োজন পুরো করুন। অথবা কোন বৈধ কাজে ব্যস্ত হোন যেমন বেচা-কেনা ইত্যাদি পেশা।

২১- ধূমপানের পরিণতির দিকে দৃষ্টি দিন। বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা কোনো কাজ করার আগে তার পরিণতি দেখে, নিশ্চিতভাবে পরিণতি  ভাল না হলে তাতে সাড়া দেয় না। বাস্তবতা চিন্তা না করে কোনো বস্তুর বাহ্যিক অবস্থা দেখে ধোকায় পতিত হয় না। তারা ক্ষণস্থায়ী স্বাদকে দীর্ঘস্থায়ী বিষাদের ওপর কখনো প্রাধান্য দেয় না।

ধূমপানের ক্ষতি ব্যাপক, তার পরিণতি খুব খারাপ। তাতে যদিও সামান্য স্বাদ থাকে, কিন্তু তার পশ্চাতে রয়েছে আফসোস, অপমান ও হতাশা। ধূমপান শেষে স্বাদ নিঃশেষ হয় ঠিকই, কিন্তু রেখে যায় কষ্ট। প্রবৃত্তির আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়, কিন্তু কল্যাণ হাত ছাড়া হয়। কোন কবি বলেন:

 تفنى اللذات ممن نال صفوتها *** من الحرام ويبقى الخزي والعار

 تبقى عواقبُ سوءٍ في مغبتها **** لا خير في لذة من بعدها النار

“যারা হারামের মাধ্যমে নিরেট আনন্দ ভোগ করেছে, তাদের আনন্দ নিঃশেষ হয়ে যাবে, অবশিষ্ট থাকবে শুধু লাঞ্ছনা ও অপমান। তার পশ্চাতে থাকবে শুধু দুঃখময় পরিণতি। এমন আনন্দে কোন সুখ নেই, যার পশ্চাতে রয়েছে আগুন”।

২২- আত্মসমালোচনা নিয়ে নিজের মুখোমুখি হন। ধূমপান ত্যাগ করার কার্যকর চিকিৎসা হল ধূমপান নিয়ে নিজের মধ্যে চিন্তা করা। নিজের সাথে নিজের বোঝাপড়া করা।

প্রিয় পাঠক, আপনি যদি বড় হোন, তাহলে অবশ্যই নিজেকে সম্বোধন করুন: কিসের অপেক্ষা করছি? কত দিন ধূমপান করব? জীবনের পড়ন্ত বয়সে আমি কি মুসিবতের অপেক্ষা করছি? অথবা দ্রুত মৃত্যু অন্বেষণ করছি? অতঃপর নফসকে তিরস্কার করুন: আমি কি এখনো সুস্থ হব না, ধূমপান ত্যাগ করব না, অথচ আমার দিকে বার্ধক্য ধেয়ে আসছে! আরো বলুন:

أطرباً وأنت قَنَّسْرِيُّ *** والدهر بالإنسان دوَّارِيُّ

“আনন্দ করছ! অথচ তুমি পড়ন্ত বয়সে উপনীত, সময় মানুষকে নিয়ে ঘূর্ণ্যমান”। আরো বলুন:

دار عواءٍ فليس بعد اشتعال الرَّ *** أس شيبًا إلى الصبا من سبيل

“বিলাপের ঘর, মাথায় বার্ধক্য দেখা দেয়ার পর শৈশবে ফিরে যাওয়ার কোনো পথ নেই”।

আপনার বয়স যদি কম হয়, আপনি কি নিশ্চিত যে দীর্ঘজীবী হবেন? অথবা আপনি কি নিশ্চিত নন যে, জীবনের যে কোন মুহূর্তে মৃত্যু হানা দিতে পারে? যদি তাই হয় ধূমপানের স্বভাবসহ আপনার রবের সাথে সাক্ষাত করা আপনি পছন্দ করেন? জীবিত থাকলেও আপনি পছন্দ করবেন ঝুঁকিপূর্ণ জীবন যাপন করা? অথবা আপনি কি চান এ নিষ্ফল কর্মে আপনার যৌবন বিনষ্ট হোক?

প্রিয় পাঠক, আপনাদের কেউ কি পছন্দ করেন নিজ পরিবার ধ্বংসের কারণ হতে? অথবা চান আপনার দ্বারা সমাজ ও জাতির ক্ষতি হোক? আশা করছি এসব আত্ম-জিজ্ঞাসা আপনাকে ধূমপান ত্যাগ করতে সাহায্য করবে।

২৩- নিরাশ হবেন না। আপনি এক বা একাধিক বার ধূমপান ত্যাগ করার ইচ্ছা করেছেন কিন্তু ত্যাগ করতে পারেন নি। অথবা দীর্ঘ এক সময় ধূমপান ত্যাগ করেছিলেন, অতঃপর আবার আরম্ভ করেছেন। এ জন্য আপনার মধ্যে হতাশা আসতে পারে, অথবা শয়তান আপনার অন্তরে ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে যে, ধূমপান ত্যাগ করার কোনো পথ নেই। ধূমপান ত্যাগ করার সব চেষ্টাই বিফলে যাবে। খবরদার এ চিন্তা যেন আপনার মধ্যে অনুপ্রবেশ না করে, এর জন্য কোন পথ খোলা রাখবেন না। বরং আবার চেষ্টা করুন, পুনরায় শুরু করুন, যত চেষ্টা করেন, যতবার আপনার চেষ্টা বিফলে যায় আপনি নিরাশ হবেন না। খুব সম্ভব একবার বিফল হলে আরেকবার সফল হবেন। কোন কবি বলেছেন:

اطلبْ ولا تضْجَرَ من مطلبٍ *** فآفةُ الطالبِ أن يضجرا

أما ترى الحبلَ بتكراره *** في الصخرة الصَّمَّاء قد أثَّرا

“তালাশ কর, উদ্দেশ্য হাসিলে বিরক্ত হয়ো না, অন্বেষণকারীর মুসিবত হচ্ছে বিরক্ত হওয়া। তুমি দেখ না বারবার ঘর্ষণের ফলে রশিও কঠিন পাথরে দাগ কাটে”।

২৪- ধূমপান স্মরণ করে বা ধূমপানের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টিকারী বস্তু থেকে দূরে থাকুন। ধূমপানের নিকটবর্তী হওয়া এক ধরণের শাস্তি ও মুসিবত, তার থেকে দূরে থাকা সান্ত্বনা ও প্রশান্তি। ধূমপায়ী যখন বিড়ি বা সিগারেটের ধোঁয়া দেখে অথবা তার গন্ধ শোঁকে অথবা অন্য ধূমপায়ীকে দেখে ও তাদের সাথে আড্ডা দেয়, তার মধ্যে ধূমপানের ইচ্ছা জাগতে পারে, ধূমপান ত্যাগ করার প্রতিজ্ঞায় দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। অসম্ভব নয় তার পুরনো অভ্যাস ফিরে আসা, যদি সে ধূমপান ত্যাগ করে থাকে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হলে ভিন্ন কথা।

হে ধূমপায়ী প্রিয় ভাই, আপনি ধূমপান স্মরণ করে দেয় এমন বস্তু থেকে দূরে থাকুন, যেসব বস্তু আপনাকে ধূমপানের দিকে আহ্বান করে অথবা তার জন্য উদ্বুদ্ধ করে আপনি তা ত্যাগ করুন। কারণ কোন বস্তুর উপকরণ নিঃশেষ করে দেয়া মূলত ঐ বস্তুই নিঃশেষ করে দেয়া।

২৫- অসৎ সঙ্গ‎ থেকে দূরে থাকুন। অসৎ সঙ্গ‎ খারাপকে ভাল ও ভালকে খারাপ করে পেশ করে। খারাপের দিকে ধাবিত করে ও ভাল থেকে দূরে রাখে। মনে রাখুন, মানুষ তার বন্ধুর স্বভাব দ্বারা প্রভাবিত হয়।

আপনি যদি ধূমপায়ীদের ধূমপানের বদ অভ্যাস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন, তাহলে তাদের অধিকাংশকে পাবেন খারাপ সঙ্গে‎র কারণে ধূমপানে অভ্যস্ত হয়েছে। যে ব্যক্তি খারাপ সঙ্গ‎ গ্রহণ করবে, অবশ্যই তাকে তাদের খারাপি স্পর্শ করবে।

খারাপ সঙ্গে‎র কারণে কমপক্ষে এ ক্ষতি হবে যে, নিজের খারাপ কর্মের সাথে তাদের খারাপ কর্ম তুলনা করে যখন দেখবে তাদের তুলনায় তার খারাপের সংখ্যা কম, সে অধিক ধ্বংসাত্মক কাজের দিকে ধাবিত হবে। অতএব খারাপ সঙ্গ‎ আপনার দীন ধ্বংস করবে, আপনার দোষ আপনার সামনে চাপা দিবে। খারাপ সঙ্গ আপনাকে খারাপের সাথে সম্পর্ক জুড়ে দিবে ও ভাল সঙ্গ‎ থেকে দূরে রাখবে, এক সময় আপনাকে অসম্মান, লাঞ্ছনা ও অপরাধের দিকে ধাবিত করবে। অনুরূপ আপনাকে অপরাধপ্রবণ করবে, অপরাধকে গৌণ করে পেশ করবে এবং আপনার চোখে ভাল-মন্দ সমান করে দিবে। খারাপ সম্পর্ক সামান্য ঝগড়া ও মনোমালিন্যতায় ভেঙ্গে যায়। আর যদিও দুনিয়াতে টিকে কিন্তু আখেরাতে কখনো টিকবে না।

ধূমপায়ী প্রিয় পাঠক, যখন আপনার সামনে স্পষ্ট হল, আপনি খারাপ সঙ্গ‎ থেকে নিজেকে দূরে রাখুন। সিংহ থেকে পলায়নের ন্যায় খারাপ সঙ্গ থেকে পলায়ন করুন।

২৬- সৎ সঙ্গ‎ গ্রহণ করুন। সৎ সঙ্গ‎ আপনাকে উপদেশ দিবে, আপনাকে আপনার দোষ দেখিয়ে দিবে ও তা পূর্ণ করার পথ বাতলে দিবে। সৎ সঙ্গ‎ আপনাকে সৎ পথ দেখাবে খারাপ সঙ্গ‎ থেকে দূরে রাখবে। পাপ থেকে দূরে রাখবে, প্রথম প্রথম যদিও লজ্জায় পাপ ত্যাগ করবেন, কিন্তু পরবর্তীতে আপনার অভ্যাসে পরিণত হবে ইনশাআল্লাহ।

সৎ সঙ্গ‎ আপনাকে আল্লাহর স্মরণ করিয়ে দিবে। উপস্থিত অনুপস্থিত উভয় অবস্থায় আপনাকে হিফাজত করবে। আপনার সম্মান বৃদ্ধি করবে। নেককার লোকদের মজলিস আল্লাহর রহমত ঢেকে রাখে, ফেরেশতারা চারপাশ থেকে ঘিরে রাখে, তাদের ওপর সাকিনা [বিশেষ রহমত বা প্রশান্তি] নাযিল হয় এবং আল্লাহ নিজ মজলিসে তাদের নিয়ে আলোচনা করেন। কবি বলেছেন:

إذا ما صحبت القوم فاصحب خيارهم* ولا تصحبِ الأردى فتردى مع الردي

“যখন কোন কওমে অবস্থান কর, তাদের নেককার লোকদের সঙ্গ গ্রহণ কর, খারাপ লোকদের সঙ্গ গ্রহণ কর না, তাহলে তুমিও খারাপের সঙ্গে খারাপ বনে যাবে”।

২৭- ধূমপায়ীদের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করা। কখনো এমন লোকের আড্ডায় পড়তে পারেন যে আপনার ধূমপান ত্যাগ করার সৎ ইচ্ছার বাধ সাধবে, আপনার সামনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে, দৃঢ় ইচ্ছা থেকে আপনাকে ফিরাতে চেষ্টা করবে।

আপনি তার কথায় কান দিবেন? তার কথার কোন মূল্য দিবেন?

না, বরং আপনি তাকে আপনার পৃষ্ঠ দেখান, তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াককুল করুন। দৃঢ় ইচ্ছায় অটল থাকুন ও চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আপনার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবেন।

২৮- ধাপে ধাপে অগ্রসর হোন। আপনার জন্য অবশ্য করণীয় ও আপনার কাছে আমাদের প্রত্যাশা হচ্ছে আপনি তৎক্ষণাৎ ধূমপান ত্যাগ করুন, চির দিনের জন্য ত্যাগ করুন।

যদি আপনি হেরে যান, একসাথে ধূমপান ত্যাগ করা আপনার জন্য কষ্টকর হয়, তাহলে ধাপে ধাপে অগ্রসর হোন, ধূমপান ত্যাগ করার পদ্ধতি গ্রহণ করুন। আস্তে আস্তে চেষ্টা করুন, ধূমপান কমিয়ে দিন যেন এক সময় পুরোই ত্যাগ করতে পারেন। এ জন্য সহায়ক কয়েকটি বিষয় হল:

ক. জনসম্মুখে ধূমপান পরিহার করুন। কারণ এ অভ্যাস সব জায়গায় ধূমপান করতে আপনাকে উদ্বুদ্ধ করবে, যার ফলশ্রুতিতে আপনার ধূমপান অভ্যাস বাড়বেই। জনসম্মুখে ধূমপান ত্যাগ করলে স্বাভাবিক গতিতে আপনার ধূমপান কমে যাবে।

খ. ধূমপায়ীদের সঙ্গ‎ ত্যাগ করুন ও ধূমপান স্মরণ করে দেয় এমন বস্তু থেকে দূরে থাকুন, যেমন পূর্বে বলা হয়েছে।

গ. ধূমপান ত্যাগ করার জন্য এমন জায়গায় বেশী অবস্থান করুন, যেখানে আপনার জন্য ধূমপান করার সম্ভব নয়, যেমন পিতা-মাতার সাথে বসুন, যাদের থেকে লজ্জা হয় তাদের সাথে ঘনঘন ও দীর্ঘ সময় অবস্থান করুন, যেন ধূমপান ভুলে যান ও তা ত্যাগ করার অভ্যাস গড়ে ওঠে।

ঘ. ধূমপানের পরিবর্তে কোন বস্তু গ্রহণ করুন, যেমন মিসওয়াক ব্যবহার করুন, অথবা শারীরিক ব্যায়াম করুন, যেমন সাতার কাটুন বা হাঁটা-চলা করুন ইত্যাদি।

২৯- ধূমপান ত্যাগ করার একটি সহজ উপায় হল, যে আপনাকে ধূমপান ত্যাগ করতে সাহায্য করবে তার নিকট আপনার অবস্থা পেশ করুন। যার মধ্যে কল্যাণ, মঙ্গল ও ইলম রয়েছে তার নিকট আপনার অবস্থা খুলে বলুন। সে আপনাকে উপযুক্ত পথ বাতলে দিবে, যা আপনাকে ধূমপানের অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করবে।

অথবা বিশেষজ্ঞ কোন ডাক্তারকে বলুন, সে আপনাকে কোন পথ বাতলে দিবে, অথবা ধূমপান ত্যাগ করার পদ্ধতি শিখিয়ে দিবে, যা আপনাকে ধূমপান থেকে মুক্ত করবে।

এখন আমার কলমের বিরতির নেয়ার সময় হয়ে আসছে। আল্লাহর নিকট তার সকল সুন্দর নাম ও সিফাতের উসিলায় প্রার্থনা করছি, তিনি আপনাকে সবচেয়ে সঠিক কাজের তাওফিক দিন। আপনার অন্তরে ইমান প্রিয় ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করে দিন, কুফর, পাপ ও অবাধ্যতা অপছন্দ করে দিন এবং আপনাকে সঠিক পথ প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করুন।

দো‘আ করি আল্লাহ আপনাকে সত্যকে সত্য হিসেবে দেখা ও তার আনুগত্য করার তাওফিক দিন। বাতিলকে বাতিল হিসেবে দেখা ও তার থেকে পরহেজ করার তাওফিক দিন।

ধূমপায়ী প্রিয় পাঠক, আমি আপনার নিকট ক্ষমা চাচ্ছি যদি আমি বিষয়টি দীর্ঘ করে থাকি, অথবা আপনার সাথে রূঢ় ও কঠিন বাক্য প্রয়োগ করে থাকি। আশা করছি এ বাক্যগুলো আপনার অন্তরে সাড়া জাগাবে, আপনাকে ধূমপান ছাড়তে সাহায্য করবে।

আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করব, অনেক খুশি হবো যদি আপনার পক্ষ থেকে ধূমপান ত্যাগ করার সুসংবাদ ও তার থেকে তওবা জানিয়ে আমাকে চিঠি লিখেন, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে কখনো অসম্ভব নয়।

আর আমাদের সবার শেষ চাওয়া হচ্ছে এই যে, সকল প্রশংসা সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহর জন্য, আর সালাম সকল রাসূলদের উপর। আল্লাহই ভালো জানেন।

 

 

[1] মুয়াত্তা ইমাম মালেক: (১৪৬), আহমদ: (২২১৭৮), ইব্‌ন মাজাহ: (২৩৩৪), হাকেম: (২২৮২), তিনি হাদিসটি সহিহ বলেছেন।

[2] এ বিষয়টি অনেকের নিকট আশ্চর্য ঠেকতে পারে যে, সিগারেটের কারণে কিভাবে হায়াত কমে অথচ আল্লাহ তাআলা আসমান-জমিন সৃষ্টির পূর্বে প্রত্যেকের হায়াত নির্ধারণ করে দিয়েছেন! তিনি ইরশাদ করেন:

﴿ فَإِذَا جَآءَ أَجَلُهُمۡ لَا يَسۡتَأۡخِرُونَ سَاعَةٗ وَلَا يَسۡتَقۡدِمُونَ ٣٤ ﴾ [الاعراف: ٣٤] 

“অতঃপর যখন তাদের সময় আসবে, তখন তারা ‎এক মুহূর্ত বিলম্ব করতে পারবে না এবং এগিয়েও ‎আনতে পারবে না”। [সূরা আরাফ: (৩৪)]‎

এর উত্তর এতে কোন বৈপরীত্য নেই। আল্লাহ যেরূপ প্রত্যেক বস্তুর তাকদীর নির্ধারণ করেছেন, অনুরূপ তিনি প্রত্যেকের তাকদীর তথা নির্ধারিত সময় ও বয়স নির্দিষ্ট উপকরণের সাথে সংশ্লিষ্ট করেছেন। যেমন ভাল স্বাস্থ্য, পুষ্টিকর খাদ্য, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শরীর ও মনের উপযুক্ত বস্তু গ্রহণ করা দীর্ঘ জীবন লাভের মাধ্যম, তেমনি এসব উপায় গ্রহণ না করা হায়াত হ্রাস করার অন্যতম উপকরণ। ধূমপানকে হায়াত হ্রাসকারী উপকরণ হিসেবে গণ্য করা হয়। অতএব আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীর ও ধূমপানের কারণে হায়াত হ্রাসের মধ্যে কোন বৈপরীত্য নেই। যেমন উদাহরণত ক্ষুধার সম্পর্ক খাদ্যের সাথে, তৃষ্ণার সম্পর্ক পানির সাথে, সন্তান হওয়ার সম্পর্ক সহবাসের সাথে ও শস্য জন্মানোর সম্পর্ক বীজ বপনের সাথে তাকদীর পরিপন্থী নয়, অনুরূপ ধূমপানের সাথে হায়াত হ্রাসের সম্পর্কও তাকদীর পরিপন্থী নয়। কতক বিষয় রয়েছে যার কারণে হায়াত বৃদ্ধি পায় যেমন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা, ইস্তেগফার করা ইত্যাদি। অনুরূপ কতক বিষয় রয়েছে যার কারণে হায়াত হ্রাস পায় যেমন পাপ ও অন্যান্য গুনাহ। অতএব কোন বুদ্ধিমানের মুখে এ প্রশ্ন মানায় না যে, উপকরণের সাথে কোনো বিষয়কে সংশ্লিষ্ট করা পূর্ব নির্ধারিত তাকদীর পরিপন্থী অথবা কোনভাবে তার সাথে সাংঘর্ষিক। সুতরাং এ ভূমিকার পর আমরা জানলাম যে, ধূমপান দু’ভাবে ধূমপায়ীর জীবন হ্রাস করে: এক. ধূমপান আল্লাহর নাফরমানি। দুই. ধূমপান শরীরের জন্য ক্ষতিকর। দেখুন লেখকের: “আল-ঈমান বিল কাদা ওয়াল কাদার” বই। [অর্থাৎ ধুমপায়ীর তাকদীরে লিখা আছে যে, লোকটি অন্যায় করে ধুমপান করার কারণে তার আয়ূ এত এত দিন হবে, সে অনুসারেই তার আয়ূ লেখা হয়েছে। এতে পরিবর্তন পরিবর্ধন হবে না। (সম্পাদক)]

[3] রওযাতুল মুহিহিব্বন লি ইব্‌নিল কাইয়্যিম, (পৃ.৪৬৮)

[4] আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা: (৫/১৮৮-১৮৯)

[5] দেখুন: আল-ফাওয়ায়েদ লি ইব্‌নিল কাইয়্যিম, (পৃ.১৬)

[6] আল-ফাওয়ায়েদ: (পৃ.১৫৯-১৬০)

[7] বুখারি: (৭/১৮৩), মুসলিম: (১০৫৩)

[8] যাম্মুল হাওয়া লি ইব্‌ন জাওযি: (পৃ.৪৮০)

[9] দেখুন লেখকের কিতাব: “আদ-দোয়া”।


শাইখ মুহাম্মদ ইবরাহিম আল-হামদ

 অনুবাদ : সানাউল্লাহ নজির আহমদ

 সম্পাদনা : আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

 

পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করতে ভুলবেন নাকিন্তু।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য পোস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close