কুর’আন ও সুন্নাহ

আকাশের দরজাগুলো কখন ও কেন খোলা হয়?

আকাশমন্ডলী মহান আল্লাহর অনবদ্য সৃষ্টিসমূহের এক অনন্য নিদর্শন। তিনি দিগন্ত বিস্তৃত আকাশের ভাসমান মেঘমালা থেকে ঊষর যমীনে সঞ্জীবনী বৃষ্টি বর্ষণ করেন। পূর্ব গগণে উদিত সূর্যের সোনালী রোদের পরশে মাটির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি করেন এবং সৃষ্টিকুলের আহারের সুব্যবস্থা করে দেন। তিনি রাতের আকাশকে প্রদীপমালা দিয়ে সুশোভিত করেছেন। মেঘমুক্ত আকাশে উদিত তারকারাজির মিটমিটি আলো দিয়ে তিনিই রাতের আঁধারে দিকভ্রান্ত পথিকদেরকে সঠিক পথ দেখান। চাঁদের রূপালী প্রভা অাঁধার ঘুচিয়ে বান্দার হৃদয়ে অবর্ণনীয় দ্যোতনা সৃষ্টি করে। মহান প্রভুর অপরূপ সৃষ্টির নিপুণতার প্রমাণবাহী এই নিদর্শনগুলো মুমিন বান্দার যাপিত জীবনে পদে পদে তাকে আল্লাহর নাম স্মরণ করিয়ে দেয়। আমরা দুনিয়ার আকাশে এই সূর্য-চন্দ্র, নক্ষত্ররাজি দেখতে পাই। কিন্তু এই দুনিয়ার আকাশ ছাড়াও আরো ছয়টি আকাশ রয়েছে, যা আমরা দেখতে পাই না। আল্লাহ আকাশগুলোকে সাতটি স্তরে সৃষ্টি করেছেন। আর ফেরেশতাদের অবতরণ-ঊর্ধ্বারোহন, তওবা গ্রহণ, মুমিন বান্দার নেক আমল এবং মৃত্যুর পর তার আত্মা ঊর্ধ্বে উত্তোলন প্রভৃতির জন্য প্রতিটি আকাশে অসংখ্য দরজা স্থাপন করেছেন। দিন-রাত্রির বিশেষ বিশেষ সময়ে আল্লাহ কতিপয় দরজা খুলে দেন। কতিপয় দরজা সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে খুলে দেন। কিছু কিছু দরজা বছরের নির্ধারিত মাসে খুলে দেন। আবার কতক দরজা সবসময় খোলা থাকে। তবে ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহর হুকুমে সবগুলো দরজা একসাথে খুলে দেওয়া হবে। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে আমরা এই বিষয়ে নাতিদীর্ঘ আলোচনা করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

আকাশ কি কোন শূন্য জায়গা?

কোন নিশ্ছিদ্র প্রকোষ্ঠে দরজা ছাড়া প্রবেশ করা যেমন অসম্ভব। তেমনি দরজা ছাড়া আকাশের স্তর ভেদ করা সৃষ্টির পক্ষে অসম্ভব। খালি চোখে উপর দিকে তাকালে আকাশকে শূন্যলোক মনে হওয়া খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আল্লাহ আকাশকে এত শক্তিশালী ও মযবূতভাবে নির্মাণ করেছেন যে, আকাশের দরজা ছাড়া ফেরেশতামন্ডলী আকাশের এক স্তর হ’তে অপর স্তরে পৌঁছতে এবং যমীনে অবতরণ করতে সক্ষম নন। কেননা আল্লাহ আকাশকে সংরক্ষিত শক্তিশালী ছাদ হিসাবে সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেন,وَجَعَلْنَا السَّمَاءَ سَقْفًا مَّحْفُوْظًا وَهُمْ عَنْ آيَاتِهَا مُعْرِضُونَ ‘আর আমরা আকাশকে সুরক্ষিত ছাদে পরিণত করেছি। অথচ তারা সেখানকার নিদর্শন সমূহ থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে’ (আম্বিয়া ২১/৩২)। এই ছাদ সদৃশ সুবিশাল নভোমন্ডলকে ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ তাঁর ডান হাতে ভাজ করে নিবেন। তিনি বলেন,  يَوْمَ نَطْوِي السَّمَاءَ كَطَيِّ السِّجِلِّ

لِلْكُتُبِ،كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُعِيدُهُ وَعْدًا عَلَيْنَا إِنَّا كُنَّا فَاعِلِيْن  ‘সেদিন আমরা আকাশকে গুটিয়ে ফেলব, যেভাবে গুটানো হয় লিখিত দফতর। যেভাবে আমরা প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম, সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব। আমাদের ওয়াদা সুনিশ্চিত। আমরা তা পালন করবই’ (আম্বিয়া ২১/১০৪)

আল্লাহ এই আসমানগুলোকে সাতটি স্তরে বিভক্ত করেছেন। তিনি বলেন, أَلَمْ تَرَوْا كَيْفَ خَلَقَ اللهُ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ طِبَاقًا ‘তোমরা কি দেখো না কিভাবে আল্লাহ সপ্ত আকাশ সৃষ্টি করেছেন স্তরে স্তরে’ (নূহ ৭১/১৫)?

প্রত্যেক আকাশেই দরজা রয়েছে :

আকাশের প্রত্যেক স্তরেই অসংখ্য সুপ্রশস্ত দরজা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মুখনিঃসৃত মি‘রাজের বর্ণনা সংবলিত হাদীছে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘আমার জন্য বোরাক্ব পাঠানো হ’ল। বোরাক্ব গাধা থেকে বড় এবং খচ্চর থেকে ছোট একটি সাদা রঙের জন্তু। যতদূর দৃষ্টি যায় এক পদক্ষেপে সে ততদূর চলে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, আমি এতে আরোহণ করলাম এবং বায়তুল মুক্বাদ্দাস পর্যন্ত এসে পৌঁছলাম। তারপর অন্যান্য নবীগণ তাদের বাহনগুলো যে খুঁটির সাথে বাঁধলেন, আমি সে খুঁটির সাথে আমার বাহনটিও বাঁধলাম। তারপর মসজিদে প্রবেশ করলাম ও দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করে বের হ’লাম। জিবরীল (আঃ) একটি শরাবের পাত্র এবং একটি দুধের পাত্র নিয়ে আমার কাছে এলেন। আমি দুধ গ্রহণ করলাম। জিবরীল (আঃ) আমাকে বললেন, আপনি ফিতরাতকেই গ্রহণ করলেন। তারপর জিবরীল (আঃ) আমাকে নিয়ে ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ করলেন এবং প্রথম আসমানে পৌঁছে দ্বার খুলতে বললেন। হাদীছে এভাবে এসেছে,

فَاسْتَفْتَحَ جِبْرِيلُ، قِيلَ : مَنْ أَنْتَ، قَالَ : جِبْرِيلُ، فَقِيلَ: وَمَنْ مَعَكَ، قَالَ: مُحَمَّدٌ، قِيلَ: وَقَدْ أُرْسِلَ إِلَيْهِ، قَالَ: قَدْ بُعِثَ إِلَيْهِ، فَفُتِحَ لَنَا-

‘অতঃপর জিবরীল (আঃ) দরজা খুলে দিতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হ’ল, আপনি কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হ’ল আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। বলা হ’ল, (وَقَدْ بُعِثَ إِلَيْهِ) তাকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? বললেন, হ্যাঁ! তাকে ডেকে পাঠানো হয়েছে। অতঃপর আমাদের জন্য দরজা খুলে দেওয়া হ’ল।’ এভাবে জিবরীল (আঃ) প্রত্যেক আসমানে দ্বাররক্ষী ফেরেশগণের অনুমতি গ্রহণ করে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে সাথে নিয়ে সপ্তাকাশে আরোহণ করেছিলেন। অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘আমাদের জন্য আকাশের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়েছিল এবং আমি জান্নাত দেখতে পেয়েছিলাম’।[1]

অতএব এই হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, প্রত্যেক আকাশেই দরজা আছে। আল্লাহ বলেন,يَوْمَ يُنْفَخُ فِي الصُّورِ فَتَأْتُوْنَ أَفْوَاجًا، وَفُتِحَتِ السَّمَاءُ فَكَانَتْ أَبْوَابًا–  ‘যেদিন শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে, অতঃপর তোমরা দলে দলে সমাগত হবে। আর আকাশ খুলে দেওয়া হবে। অতঃপর তা বহু দরজা বিশিষ্ট হবে’ (নাবা ৭৮/১৮-১৯)। কিন্তু পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে এগুলোর সংখ্যা নিরূপণ করা হয়নি। এর সঠিক সংখ্যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। শুধু এতটুকু প্রতিভাত হয় যে, এই দরজাগুলোর সংখ্যা অনেক। ক্বিয়ামতের দিন যখন আসমান বিদীর্ণ হবে, তখন দরজাসমূহ দিয়ে ফেশেতাদের দুনিয়াতে নামিয়ে দেওয়া হবে’ (ফুরক্বান ২৫/২)। এই বিদীর্ণ হওয়ার অর্থ দরজা সমূহ খুলে দেওয়া। দ্বিতীয় ফুঁকদানের পর আসমান ও যমীন পুনরায় বহাল হয়ে যাবে এবং নতুন আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি হবে ও সকল মানুষ মহাপরাক্রান্ত আল্লাহর সম্মুখে উপস্থিত হবে’ (ইবরাহীম ১৪/৪৮)। নতুন সেই পৃথিবী সমতল হবে। তাতে কোনরূপ বক্রতা বা উঁচু-নীচু থাকবে না (ত্বোয়াহা ২০/১০৬-১০৭)

আকাশের দরজার প্রশস্ততা :

আকাশের দরজা সমূহের প্রশস্ততা সম্পর্কে আল্লাহ ভাল জানেন। এর বিশালতা ও ব্যাপ্তী মনুষের জ্ঞান ধারণ করতে অক্ষম। তবে পশ্চিম দিগন্তে আকাশের একটি দরজার প্রশস্ততার ব্যাপারে নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,إِنَّ اللهَ تَعَالَى جَعَلَ بِالْمَغْرِبِ بَابًا، عَرْضُهُ مَسِيْرَةُ سَبْعِيْنَ عَامًا لِلتَّوْبَةِ، لَا يُغْلَقُ مَا لَمْ تَطْلُعِ الشَّمْسُ مِنْ قِبَلِهِ-. ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা তওবাহ কবুলের জন্য পশ্চিম দিকে একটি দরজা খুলে রেখেছেন, যার প্রশস্ততা সত্তর বছরের পথ। সূর্য পশ্চিম দিকে উদয় না হওয়া পর্যন্ত এ দরজা বন্ধ করা হবে না’।[2] এখানে ‘সত্তর বছরের পথ’ (سَبْعِيْنَ عَامًا) বলতে আকাশের সেই দরজার অনির্ধারিত প্রশস্ততাকে বুঝানো হয়েছে, যা শুধু সত্তর বছরের রাস্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তার চেয়ে অনেক বেশী প্রশস্ত। মহান আল্লাহ পাপী বান্দাদের তওবা কবুলের জন্য আকাশের এই দরজাটি সর্বদা খুলে রেখেছেন।

আকাশের দরজা সমূহ খুলে দেওয়ার কারণ :

আকাশের দরজা একটি গায়েবী বিষয়। মুমিন বান্দা বিনা বাক্যব্যয়ে এর উপর দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস স্থাপন করে। আকাশের উন্মুক্ত দরজা দিয়ে ধরার বুকে আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়। বিভিন্ন কারণে আল্লাহ আকাশের দরজা সমূহ খুুলে দেন। যেমন-

ক. ফেরেশতাদের অবতরণের জন্য :

আকাশের দরজা খুলে দেওয়ার অন্যতম কারণ হ’ল ফেরেশতাদের অবতরণ। হাদীছে এসেছে ‘একদিন জিবরীল (আঃ) নবী কারীম (ছাঃ)-এর কাছে বসেছিলেন। এ সময় জিবরীল (আঃ) উপরের দিক হ’তে দরজা খোলার শব্দ শুনলেন। তিনি উপরের দিকে মাথা উঠালেন এবং বললেন, আসমানের এ দরজাটি আজ খোলা হ’ল। এর আগে আর কখনো তা খোলা হয়নি। রসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, এ দরজা দিয়ে একজন ফেরেশতা নামলেন। তখন জিবরীল (আঃ) বললেন, যে ফেরেশতা যমীনে নামলেন, আজকে ছাড়া কখনো তিনি যমীনে নামেননি।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, তিনি সালাম করলেন। তারপর আমাকে বললেন, أَبْشِرْ بِنُورَيْنِ أُوتِيتَهُمَا لَمْ يُؤْتَهُمَا نَبِىٌّ قَبْلَكَ فَاتِحَةُ الْكِتَابِ وَخَوَاتِيمُ سُورَةِ الْبَقَرَةِ لَنْ تَقْرَأَ بِحَرْفٍ مِنْهُمَا إِلَّا أَعْطَيْتُه، ‘আপনি দু’টি নূরের সুসংবাদ গ্রহণ করুন। এটা আপনার আগে আর কোন নবীকে দেওয়া হয়নি। তা হ’ল সূরা ফাতিহা ও সূরা বাক্বারাহর শেষাংশ। আপনি এই দু’টির যে কোন বাক্যই পাঠ করুন না কেন নিশ্চয়ই আপনাকে তা দেয়া হবে।[3]

খ. বৃষ্টি বর্ষণের জন্য :

বৃষ্টি বর্ষণের জন্য আল্লাহ আকাশের দরজাগুলো খুলে দেন। যখন নূহ (আঃ) আল্লাহর কাছে তাঁর সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে দো‘আ করেছিলেন, তখন আল্লাহ আসমানের দরজা খুলে দিয়ে বৃষ্টি বর্ষণ করে নূহ (আঃ)-এর কওমকে মহাপ্লাবনে নিমজ্জিত করেছিলেন। আল্লাহ বলেন, فَدَعَا رَبَّهُ أَنِّي مَغْلُوبٌ فَانْتَصِرْ. فَفَتَحْنَا أَبْوَابَ السَّمَاءِ بِمَاءٍ مُنْهَمِرٍ ‘তখন সে তার প্রতিপালককে আহবান করে বলল যে, আমি অক্ষম। অতএব তুমি (ওদের থেকে) প্রতিশোধ নাও। অতঃপর আমরা আকাশের দরজাসমূহ খুলে দিলাম মুষলধারে বৃষ্টিসহ’ (ক্বামার ৫৪/১০-১১)।

গ. তওবা কবুলের জন্য :

পাপ সংঘটিত হওয়ার পর মানুষ যদি অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, তাহ’লে তার অনুতপ্ত হৃদয়ের করুণ আকুতি আকাশের দরজা দিয়ে আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়। কারণ মহান আল্লাহ তাঁর গোনাহগার বান্দার তওবা কবুল করার জন্য আকাশের পশ্চিম দিগন্তের একটি দরজা সর্বদা খুলে রেখেছেন। পাপী বান্দার তওবা কবুল করার জন্য তিনি সর্বদা ক্ষমার হাত প্রসারিত করে রেখেছেন, যেন বান্দা তাঁর নিকটেই প্রত্যাবর্তিত হয়।

ঘ. মুমিন বান্দার নেক আমল গ্রহণ করার জন্য :

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মুখনিঃসৃত হাদীছে কতিপয় আমলের বর্ণনা রয়েছে, সেই আমলগুলো একনিষ্ঠতার সাথে সম্পাদিত হওয়ার সাথে সাথে আকাশের দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং তা কবুল করা হয়। যেমন- রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) দুপুরে সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে যাওয়ার পর যোহরের ফরয ছালাতের পূর্বে নিয়মিত চার রাক‘আত সুন্নাত ছালাত আদায় করতেন। তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হ’লে তিনি বলেন, إِنَّهَا سَاعَةٌ تُفْتَحُ فِيْهَا أَبْوَابُ السَّمَاءِ وَأُحِبُّ أَنْ يَصْعَدَ لِيْ فِيْهَا عَمَلٌ صَالِحٌ- ‘এটা এমন একটা সময় যখন আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, আর এই সময়ে আমার একটি নেক আমল উত্থিত হোক তা আমি ভালবাসি’।[4]

যে সময়গুলোতে আকাশের দরজা সমূহ খুলে দেওয়া হয় :

১. আযানের সময় :

যখন মুওয়াযযিন আযান দেয়, তখন আযানের সুমধুর সুরের মুর্ছনায় আকাশ-বাতাশ বিমোহিত হয়। মহান আল্লাহর বড়ত্ব বিঘোষিত হওয়ার সেই শুভক্ষণে বান্দার দো‘আ কবুলের জন্য আকাশের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। আযান ও ইক্বামতের মধ্যবর্তী সময়ের দো‘আ আল্লাহ কখনো ফিরিয়ে দেন না। আবু উমামা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) ইরশাদ করেছেন,إِذَا نُودِيَ بِالصَّلاَةِ فُتِحَتْ أَبْوَابُ السَّمَاءِ وَاسْتُجِيبَ الدُّعَاءُ، ‘যখন আযান দেওয়া হয়, তখন আকাশের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং দো‘আ কবুল করা হয়’।[5]

২. ইক্বামতের প্রাক্কালে ছালাতে সারিবদ্ধ হওয়ার সময় :

ইক্বামতকে হাদীছে দ্বিতীয় আযান বলা হয়েছে। যখন ছালাতের জন্য ইক্বামত দেওয়া হয়, তখন আল্লাহ আকাশের দরজা খুলে দেন।

জাবের (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

إذا صفَّ الناسُ للصلاةِ، وصَفُّوا للقتال، فُتحتْ أبوابُ السماءِ وأبوابُ الجنةِ، وغُلّقتْ أبوابُ النارِ، وزُيِّن الحورُ العين واطَّلعن، فإذا أقبل الرجل قلن: اللهم انصره، وإذا أَدبر احتجَبْنَ منه وقلن: اللهم اغفر له.

‘যখন মানুষ ছালাতের জন্য কাতারবদ্ধ হয় এবং জিহাদের জন্য সারিবদ্ধ হয়ে দাড়াঁয়, তখন আকাশের দরজাগুলো উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর আনতনয়না হূরদেরকে সাজিয়ে দেওয়া হয় এবং তারা আত্মপ্রকাশ করে। যখন ব্যক্তিটি (ছালাতে বা জিহাদে) উকি মারে, তখন হূরেরা তার জন্য দো‘আ করে বলে, হে আল্লাহ! তাকে সাহায্য কর। আর যখন সে পশ্চাদপসরণ করে, তখন তারা আত্মগোপন করে এবং বলতে থাকে, হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা কর’।[6]

৩. মধ্যরাত্রির পর থেকে ফজরের পূর্ব পর্যন্ত :

দিনের শেষে পৃথিবী যখন আঁধারের কোলে ঢলে পড়ে, রাতের আকাশে চাঁদ-সেতারার আনাগোনা শুরু হয়, রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে গোটা প্রকৃতি যখন নিস্তব্ধতা ও নিস্পন্দতার চাদরে আচ্ছাদিত হয়ে যায়, মধ্যরাত্রিতে আল্লাহর হুকুমে তখন আকাশের দরজা সমূহে খুলে দেওয়া হয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন,

تُفْتَحُ أَبْوَابُ السَّمَاءِ نِصْفَ اللَّيْلِ فَيُنَادِي مُنَادٍ: هَلْ مِنْ دَاعٍ فَيُسْتَجَابَ لَهُ؟ هَلْ مِنْ سَائِلٍ فَيُعْطَى؟ هَلْ مِنْ مَكْرُوبٍ فَيُفَرَّجَ عَنْهُ؟ فَلَا يَبْقَى مُسْلِمٌ يَدْعُو بِدَعْوَةٍ إِلَّا اسْتَجَابَ اللهُ لَهُ إِلَّا زَانِيَةٌ تَسْعَى بِفَرْجِهَا أَوْ عَشَّارٌ.

‘মধ্যরাত্রিতে আকাশের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। অতঃপর একজন ঘোষক ঘোষণা করতে থাকেন। কোন আহবানকারী আছে কি? তার সেই আহবানে সাড়া দেওয়া হবে। কোন যাচ্ঞাকারী আছে কি? তাকে প্রদান করা হবে। আছে কি কোন বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি? তার বিপদ দূর করে দেওয়া হবে। এই সময় কোন মুসলিম বান্দা যে দো‘আ করে, আল্লাহ তার সে দো‘আ কবুল করেন। তবে সেই যেনাকারিণীর দো‘আ কবুল করা হয় না, যে তার লজ্জাস্থানকে ব্যভিচারে নিয়োজিত রাখে এবং যে ব্যক্তি অপরের মাল আত্মসাৎ করে’।[7]

ফজর উদিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সেই দরজগুলো খোলা থাকে এবং মানবমন্ডলীকে অবিরত আহবান করা হয়। অতঃপর দুই-তৃতীয়াংশ রজনী অতিক্রান্ত হওয়ার পর আরশের মালিক স্বয়ং দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাস‘উদ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ইরশাদ করেছেন,

إِذَا كَانَ ثُلُثُ اللَّيْلِ الْبَاقِي يَهْبِطُ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا، ثُمَّ يَفْتَحُ أَبْوَابَ السَّمَاءِ، ثُمَّ يَبْسُطُ يَدَهُ فَيَقُولُ: هَلْ مِنْ سَائِلٍ يُعْطَى سُؤْلَهُ؟ وَلَا يَزَالُ كَذَلِكَ حَتَّى يَسْطَعَ الْفَجْرُ.

‘যখন রাতের এক-তৃতীয়াংশ বাকী থাকে, তিনি (আল্লাহ) দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন। অতঃপর আকাশের দরজা সমূহ খুলে দেওয়া হয়। তারপর তিনি স্বীয় হাত প্রসারিত করে বলতে থাকেন, আছে কি কোন প্রার্থনাকারী? তার দাবী অনুযায়ী তাকে তা প্রদান করা হবে। আর ফজরের আভা স্পষ্ট হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এটা চলতে থাকে’।[8] এভাবে মহান আল্লাহ প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে দুনিয়ার আসমানে নেমে এসে অভাবী বান্দার মনের অভিলাষ পূর্ণ করার জন্য, পাপীকে ক্ষমা করার জন্য এবং সঙ্কটাপন্ন মানবতার দুঃখ লাঘব করার জন্য আহবান করতে থাকেন। বরকতস্নাত সেই শুভক্ষণে যারা অলসতার চাদর ছুড়ে ফেলে একনিষ্ঠচিত্তে আল্লাহর ইবাদতে প্রণত হ’তে পারে, তারাই সৌভাগ্যের স্বর্ণালী তোরণ পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হবেন ইনশাআল্লাহ।

৪. সোমবার ও বৃহস্পতিবার :

সোমবার ও বৃহস্পতিবার এই দুই দিন আকাশের দরজা এবং জান্নাতের ফটক সমূহ খুলে দেওয়া হয়। দয়াময় আল্লাহ ক্ষমাপ্রার্থী বান্দার পাপ মোচন করে দেন এবং তার সাপ্তাহিক নেক আমল কবুল করেন। আবূ হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

تُفْتَحُ أَبْوَابُ السَّمَاءِ يَوْمَ الاِثْنَيْنِ وَيَوْمَ الْخَمِيسِ فَيُغْفَرُ لِكَلِّ عَبْدٍ لاَ يُشْرِكُ بِاللهِ شَيْئاً إِلاَّ رَجُلاً كَانَتْ بَيْنَهُ وَبَيْنَ أَخِيهِ شَحْنَاءُ فَيَقُولُ أَنْظِرُوْا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا-

‘সোমবার ও বৃহস্পতিবার জান্নাতের দরজা সমূহ খুলে দেওয়া হয়। এরপর প্রত্যেক বান্দাকে ক্ষমা করা হয়, যে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করে না। তবে সেই ব্যক্তিকে ক্ষমা করা হয় না, যার ভাই ও তার মাঝে শত্রুতা রয়েছে। তখন বলা হয়- এই দুই জনকে রেখে দাও বা অবকাশ দাও যতক্ষণ না তারা আপোষে মীমাংসা করে নেয়’।[9]

৫. রামাযান মাসে :

নাজাতের সুসংবাদ নিয়ে ও ক্ষমার পসরা সাজিয়ে রামাযান মাস প্রতি বছর আমাদের মাঝে আগমন করে। মানব জাতিকে রহমত ও মাগফিরাতের ফল্গুধারায় সিক্ত করার জন্য এ মাসে আকাশের দরজা, রহমতের দরজা ও জান্নাতের দরজা সমূহ খুলে দেওয়া হয়। আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

إِذا دخل شهر رَمَضَانُ فُتِحَتْ أَبْوَابُ السَّمَاءِ وَفِي رِوَايَةٍ: فُتِّحَتْ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ جَهَنَّمَ وَسُلْسِلَتِ الشَّيَاطِينُ. وَفِي رِوَايَةٍ: فُتِحَتْ أَبْوَابُ الرَّحْمَةِ.

‘যখন রামাযান মাস আগমন করে, তখন আকাশের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। অপর বর্ণনায় রয়েছে, জান্নাতের দরজা সমূহ খুলে দেওয়া হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়। আরেক বর্ণনায় রয়েছে, রহমতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়’।[10]

৬. মৃত্যুর পর মুমিন বান্দার আত্মা উপরে উঠানোর সময় :

মুমিন বান্দার জান কবয করার পর তার আত্মার সৌরভে আকাশ-বাতাশ সুরভিত হয়ে যায় এবং আকাশের দরজা খুলে দেওয়া হয়। তার মৃত্যুতে আরশের নিকটতম ফেরেশতারা খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায়। খন্দকের যুদ্ধে সা‘দ বিন মু‘আয (রাঃ) শাহাদত বরণের পর তাকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বলেছিলেন,هَذَا الَّذِيْ تَحَرَّكَ لَهُ الْعَرْشُ، وَفُتِحَتْ لَهُ أَبْوَابُ السَّمَاءِ، وَشَهِدَهُ سَبْعُوْنَ أَلْفًا مِنَ الْمَلَائِكَةِ، لَقَدْ ضُمَّ ضَمَّةً، ثُمَّ فُرِّجَ عَنْهُ- ‘এই সেই ব্যক্তি, যার মৃত্যুতে আরশ কেঁপে উঠেছিল এবং আকাশের দরজাগুলো খুুলে দেওয়া হয়েছিল। আর তার জানাযায় অংশগ্রহণ করেছিলেন সত্তর হাযার ফেরেশতা। অথচ তার কবর সংকীর্ণ হয়েছিল। অতঃপর (রাসূল (ছাঃ)-এর দো‘আর বদৌলতে) পরে তা প্রশস্ত করে দেওয়া হয়েছিল।[11]

বারা ইবনে আযেব (রাঃ) বলেন, একদা আমরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে এক জানাযার ছালাতের জন্য রওয়ানা হ’লাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কবরের নিকটে বসে পড়লেন। আর আমরাও তাঁকে ঘিরে নীরবে বসে পড়লাম, যেন আমাদের মাথার উপর পাখি বসে আছে। মৃত ব্যক্তিকে সমাহিত করার পর তিনি তিন বার বললেন, ‘আমি আল্লাহর নিকটে কবরের আযাব থেকে আশ্রয় চাচ্ছি’। অতঃপর তিনি বললেন, যখন মুমিন ব্যক্তি দুনিয়ার সম্পর্ক ছিন্ন করে আখেরাতের পথে পাড়ি জমায় (অর্থাৎ তার মৃত্যু সময় ঘনিয়ে আসে), তখন ফেরেশতারা খুশিতে আত্মহারা হয়ে তার নিকটে অবতরণ করে, যেন আনন্দে তাদের চেহারাগুলোতে সূর্য কিরণ ঝলমল করছে। তাদের প্রত্যেকের নিকটে থাকে একটি কাফন ও সুগন্ধি। দৃষ্টি সীমানার ব্যাপ্তী নিয়ে তারা তার পাশে বসে পড়ে। অতঃপর তার রূহ যখন বের হয়ে আসে, আসমান ও যমীনের মধ্যবর্তী এবং আকাশের নিকটস্থ প্রত্যেক ফেরেশতা তার জন্য দো‘আ করতে থাকে এবং তার জন্য আকাশের দরজা সমূহ খুলে দেওয়া হয়। আর আকাশের দ্বাররক্ষী ফেরেশতারা তার রূহ নিয়ে উপরে আরোহনের জন্য আল্লাহর কাছে আরয করে। অপর বর্ণনায় রয়েছে, ‘প্রত্যেক আকাশের ফেরেশতারা এই পবিত্র আত্মাকে অভ্যর্থনা জানায় এবং আত্মাটি নিয়ে সপ্তম আকাশে উপনীত হয়। তখন আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে বলেন,اكْتُبُوْا كِتَابَ عَبْدِيْ فِيْ عِلِّيِّيْنَ، وَأَعِيْدُوْهُ إِلَى الْأَرْضِ، فَإِنِّيْ مِنْهَا خَلَقْتُهُمْ، وَفِيْهَا أُعِيْدُهُمْ، وَمِنْهَا أُخْرِجُهُمْ تَارَةً أُخْرَى- ‘আমার বান্দার আমলনামা ইল্লিয়্যিনে লিখে রাখ এবং তাকে যমীনে ফিরিয়ে নিয়ে যাও। নিশ্চয়ই আমি তাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, মাটিতেই তাদেরকে ফিরিয়ে দিব এবং মাটি থেকেই তাদেরকে পুনরায় উত্থিত করব’।[12]

পরিশেষে বলব, যে সময়ে আকাশের দরজা খোলা হয়, সে সময় আল্লাহ বান্দাদের ক্ষমা করেন ও দো‘আ কবুল করেন। তাই এ সময়ে বেশী বেশী তওবা ও ইস্তেগফার করা দরকার। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফীক দিন-আমীন!

 

[1]. বুখারী হা/৩৮৮৭; মুসলিম হা/১৬২, ১৬৪; মিশকাত হা/৫৮৬২।

[2]. তিরমিযী হা/৩৫৩৬; মিশকাত হা/২৩৪৫।  

[3]. মুসলিম হা/৮০৬; নাসাঈ হা/৯১২; মিশকাত হা/২১২৪।

[4]. তিরমিযী হা/৪৭৮; ইবনু মাজাহ হা/১১৫৭; মিশকাত হা/১১৬৯।

[5]. আহমাদ হা/১৪৭৩০; ছহীহাহ হা/১৪১৩; ছহীহ আত-তারগীব হা/২৬০।

[6]. ছহীহ আত-তারগীব হা/১৩৭৭।

[7]. ছহীহাহ হা/১০৭৩; ছহীহুল জামে‘ হা/২৯৭১; ছহীহ আত-তারগীব হা/২৩৯১।

[8]. আহমাদ হা/৩৬৭৩; ইরওয়া ২/১৯৯, হা/৬।

[9]. আহমাদ হা/১০০০৭, সনদ ছহীহ।

[10]. মুত্তাফাক আলাইহ, মিশকাত হা/১৯৫৬।

[11]. নাসাঈ হা/২০৫৫; মিশকাত হা/১৩৬; ছহীহাহ হা/৩৩৪৫।

[12]আহমাদ, মিশকাত হা/১৬৩০, সনদ ছহীহ।


আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
ছাত্র, আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
উৎস: মাসিক আত-তাহরীক জুন ২০১৮    

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য পোস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close