ইলম (ইসলামী জ্ঞান)

যে সকল কর্ম লা‘নত ডেকে আনে

ভূমিকা : মানুষ এমন অনেক কাজ করে থাকে যেগুলি কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। এই কবীরা গুনাহগুলির মধ্যে কিছু আছে যা করলে মানুষের উপর অভিশাপ নেমে আসে। অভিশাপকে আরবীতে বলা হয় ‘লা‘নত’। লা‘নতপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বলা হয় ‘মাল‘ঊন’। নিম্নে এমন কিছু কাজের কথা উল্লেখ করা হ’ল যেগুলি করলে লা‘নত বর্ষিত হয়।

(১) শিরক বা কুফরী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা : শিরক বা কুফরী করার পর তওবা না করে মারা গেলে তাদের উপরে লা‘নত বর্ষিত হয়। আল্লাহ বলেন,إِنَّ الَّذِيْنَ كَفَرُوا وَمَاتُوا وَهُمْ كُفَّارٌ أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ لَعْنَةُ اللهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِيْن ‘নিশ্চয়ই যারা অবিশ্বাস করে এবং অবিশ্বাসী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তাদের উপরে আল্লাহর লা‘নত এবং ফেরেশতা মন্ডলী ও সমগ্র মানব জাতির লা‘নত’ (বাক্বারাহ ২/১৬১-১৬২)

(২) আল্লাহ তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেওয়া : আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে বিভিন্নভাবে কষ্ট দেওয়া লা‘নতের কারণ। আল্লাহ বলেন,إِنَّ الَّذِينَ يُؤْذُوْنَ اللهَ وَرَسُولَهُ لَعَنَهُمُ اللهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأَعَدَّ لَهُمْ عَذَابًا مُهِينًا ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদের প্রতি ইহকালে ও পরকালে লা‘নত করেন। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্ত্তত রেখেছেন লাঞ্ছনাকর শাস্তি’ (আহযাব ৩৩/৫৭)

(৩) গায়রুল্লাহর নামে যবেহ করা : ছালাত-ছিয়াম, যবেহ-কুরবানী কেবল আল্লাহর নামে হ’তে হবে। এসব আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে করা হ’লে, সেটা লা‘নতের কারণ হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, لَعَنَ اللهُ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللهِ ‘যে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে যবেহ করল তার উপর আল্লাহ লা‘নত বর্ষণ করেন’।[1]

(৪) আল্লাহর গ্রন্থে সংযোজন-বিয়োজন করা : মহাগ্রন্থ আল-কুরআন আল্লাহর কিতাব। এতে সংযোজন বিয়োজনের কোন অধিকার কারো নেই। কেউ এরূপ করতে গেলে সে অভিশপ্ত হবে। নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,سِتَّةٌ لَعَنْتُهُمْ وَلَعَنَهُمُ اللهُ وَكُلُّ نَبِيٍّ مُجَابِ الدَّعْوَةِ: الزَّائِدُ فِي كِتَابِ اللهِ، وَالْمُكَذِّبُ بِقَدَرِ اللهِ ‘ছয়জন ব্যক্তিকে আমি লা‘নত করি| আল্লাহ তা‘আলাও তাদের উপর লা‘নত করেন। আর প্রত্যেক নবী যারা মুসতাজাবুদ দাওয়াহ, তারাও তাদের উপর লা‘নত করেন। তন্মধ্যে যে আল্লাহর কিতাবে সংযোজন করে এবং তাক্বদীর বা ভাগ্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে’।[2]

(৪) তাক্বদীরকে অস্বীকার করা : তাক্বদীর বা ভাগ্যকে অস্বীকারকারী অভিশপ্ত। আয়েশা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,سِتَّةٌ لَعَنْتُهُمْ وَلَعَنَهُمُ اللهُ وَكُلُّ نَبِيٍّ كَانَ: الزَّائِدُ فِي كِتَابِ اللهِ، وَالمُكَذِّبُ بِقَدَرِ اللهِ، وَالمُتَسَلِّطُ بِالجَبَرُوتِ لِيُعِزَّ بِذَلِكَ مَنْ أَذَلَّ اللهُ، وَيُذِلَّ مَنْ أَعَزَّ اللهُ، وَالمُسْتَحِلُّ لِحُرُمِ اللهِ، وَالمُسْتَحِلُّ مِنْ عِتْرَتِي مَا حَرَّمَ اللهُ، وَالتَّارِكُ لِسُنَّتِي ‘ছয় ব্যক্তিকে আমি লা‘নত করি, আল্লাহ তা‘আলা লা‘নত করেন এবং প্রত্যেক নবী লা‘নত করেছেন। (তারা হচ্ছে) আল্লাহর কিতাবে সংযোজনকারী, তাক্বদীরকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী, শক্তি দ্বারা ক্ষমতা দখলকারী যে ক্ষমতার বলে সে আল্লাহ তা‘আলা যাকে অপদস্থ করেছেন তাকে সম্মানিত করে এবং আল্লাহ তা‘আলা যাকে সম্মানিত করেছেন তাকে অপদস্থ করে, আল্লাহর নিষিদ্ধ বস্তসমূহকে হালাল জ্ঞানকারী, আমার পরিবার-পরিজনদের মধ্যে যাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা হারাম করেছেন তাদেরকে হালাল জ্ঞানকারী ও আমার সুন্নাত পরিত্যাগকারী’।[3]

(৫) রাসূল (ছাঃ)-এর নাফরমানী করা : যারা রাসূল (ছাঃ)-এর নাফরমানী করে তাদের উপর তিনি লা‘নত করেছেন। আর তারা ক্বিয়ামত দিবসে একে অপরকে লা‘নত করতে থাকবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

يَوْمَ تُقَلَّبُ وُجُوهُهُمْ فِي النَّارِ يَقُولُونَ يَا لَيْتَنَا أَطَعْنَا اللهَ وَأَطَعْنَا الرَّسُولَا- وَقَالُوا رَبَّنَا إِنَّا أَطَعْنَا سَادَتَنَا وَكُبَرَاءَنَا فَأَضَلُّونَا السَّبِيلَا- رَبَّنَا آتِهِمْ ضِعْفَيْنِ مِنَ الْعَذَابِ وَالْعَنْهُمْ لَعْنًا كَبِيرًا

‘যেদিন তাদের মুখমন্ডল আগুনে ওলট-পালট করা হবে, সেদিন তারা বলবে, হায়! যদি আমরা আল্লাহকে মানতাম ও রাসূলকে মানতাম! ‘তারা আরও বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের নেতাদের ও বড়দের আনুগত্য করতাম। অতঃপর তারাই আমাদের পথভ্রষ্ট করেছিল। হে আমাদের প্রতিপালক! তাদেরকে তুমি দ্বিগুণ শাস্তি দাও এবং তাদেরকে মহা অভিশাপ দাও’ (আহযাব ৩৩/৬৬-৬৮)

(৬) মদীনায় বিদ‘আত প্রসার করা : মদীনায় বিদ‘আতের বিস্তার ঘটানো লা‘নতের কারণ। রাসূল (ছাঃ) বলেন,مَنْ أَحْدَثَ فِيهَا حَدَثًا اَوْ اَوَي مُحْدِثًا فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ‘যে তথায় (মদীনায়) নতুন কিছু উদ্ভব ঘটালো (বিদ‘আত করল) অথবা কোন বিদ‘আতীকে আশ্রয় দিল তার উপর আল্লাহ, তার ফেরেশতাগণ এবং সমস্ত মানুষ লা‘নত করেন’।[4] তবে যে কোন স্থানেই বিদ‘আত করা বা প্রসার করা হোক না কেন তা লা‘নত ডেকে আনবে।

(৭) কবরকে মসজিদ তথা সিজদার স্থানে পরিণত করা : কবরের উপরে বা কবরকে সামনে রেখে সিজদা করলে লা‘নত বা অভিশাপ বর্ষিত হয়। আব্দুল্লাহ বিন আববাস (রাঃ) এবং আয়েশা (রাঃ) উভয়েই বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,لَعْنَةُ اللهِ عَلَى اليَهُودِ وَالنَّصَارَى، اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ ‘আল্লাহ তা‘আলা ইহূদী ও নাছারাদের উপর লা‘নত করেছেন। কারণ তারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে’।[5]

(৮) যে ব্যক্তি কিছাছ বা দিয়াত প্রদানে বাধা দেয় : হত্যার বদলে হত্যা অথবা তার বদলে রক্তমূল্য গ্রহণে বাধা দেওয়া লা‘নতের কারণ। ইবনু আববাস (রাঃ) রাসূল (ছাঃ) হ’তে মারফূরূপে বর্ণনা করেন যে,

َمنْ قَتَلَ فِي عِمِّيَّةٍ أَوْ عَصَبِيَّةٍ بِحَجَرٍ أَوْ سَوْطٍ أَوْ عَصًا فَعَلَيْهِ عَقْلُ الْخَطَأِ، وَمَنْ قَتَلَ عَمْدًا فَهُوَ قَوَدٌ، وَمَنْ حَالَ بَيْنَهُ وَبَيْنَهُ فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ، لَا يُقْبَلُ مِنْهُ صَرْفٌ وَلَا عَدْلٌ-

‘যে ব্যক্তি অন্ধ বিদ্বেষ অথবা গোত্রীয় বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে পাথর, চাবুক অথবা লাঠির আঘাতে হত্যাকান্ড ঘটায় তার উপর ভুলবশত হত্যার দিয়াত তথা রক্তমূল্য ধার্য হবে। আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করবে তার উপর ক্বিছাছ বাধ্যকর হবে। আর যে ব্যক্তি হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তির মধ্যে প্রতিবন্ধক হবে তার উপরে আল্লাহর, ফেরেশতামন্ডলীর এবং মানবজাতির অভিসম্পাত। তার নফল ও ফরয কোন ইবাদতই কবুল করা হবে না’।[6]

অর্থাৎ যারা খুনীকে বাঁচানোর চেষ্টা করে বা বিভিন্ন কৌশলে আসল খুনীর বিষয়টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে চেষ্টা করে তাদের উপর আল্লাহ, ফেরেশতা এবং সমগ্র মানবজাতির পক্ষ হ’তে লা‘নত বর্ষিত হ’তে থাকে।

(৯) আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা : আল্লাহ তা‘আলা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীদের উপরে লা‘নত করেছেন। তিনি বলেছেন, فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ تَوَلَّيْتُمْ أَنْ تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوْا أَرْحَامَكُمْ، أُولَئِكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللهُ فَأَصَمَّهُمْ وَأَعْمَى أَبْصَارَهُمْ- ‘যদি তোমরা (জিহাদ থেকে) মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহ’লে সম্ভবতঃ তোমরা জনপদে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে। এদের প্রতিই আল্লাহ অভিসম্পাৎ করেন। অতঃপর তাদেরকে তিনি বধির করেন ও তাদের চক্ষুগুলিকে দৃষ্টিহীন করে দেন’ (মুহাম্মাদ ৪৭/২৩)

যারা আত্মীয়দের মাঝে সম্পর্ক নষ্ট করে এবং দূরত্ব সৃষ্টি করে তাদের উপর আল্লাহ এবং তার রাসূল লা‘নত করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَالَّذِيْنَ يَنْقُضُونَ عَهْدَ اللهِ مِنْ بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللهُ بِهِ أَنْ يُوصَلَ وَيُفْسِدُوْنَ فِي الْأَرْضِ أُولَئِكَ لَهُمُ اللَّعْنَةُ وَلَهُمْ سُوءُ الدَّارِ ‘পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে এবং যে সম্পর্ক অটুট রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে ও পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে, তাদের জন্য রয়েছে অভিসম্পাৎ এবং তাদের জন্য রয়েছে মন্দ আবাস’ (রা‘দ ১৩/২৫)

(১০) স্ত্রীর পায়ুপথে সহবাস করা : যারা স্ত্রীর পায়ুপথে সহবাস করে তাদের উপর রাসূল (ছাঃ) লা‘নত করেছেন। তিনি বলেছেন,مَلْعُوْنٌ مَنْ أَتَى امْرَأَتَهُ فِيْ دُبُرِهَا- ‘যে ব্যক্তি স্ত্রীর পায়ুপথে সহবাস করে সে মাল‘ঊন তথা অভিশপ্ত’।[7]

(১১) সমকামীতা : পুরুষে-পুরুষে ও নারীতে-নারীতে জৈবিক চাহিদা নিবারণের জন্য লজ্জাস্থান ব্যবহার করাকে সমকামীতা বলে। যা অভিশাপের কারণ। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, مَلْعُونٌ مَنْ عَمِلَ عَمَلَ قَوْمِ لُوطٍ ‘যারা কওমে লূতের ন্যায় কাজ করে তাদের উপর লা‘নত বর্ষিত হোক’।[8]

(১২) নকল চুল লাগানো, ভ্রূপ্লাগ করা : নকল চুল লাগানো ও ভ্রূপ্লাগ করলে লা‘নত বর্ষিত হয়। আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন, لَعَنَ اللهُ الوَاصِلَةَ وَالمُسْتَوْصِلَةَ، وَالوَاشِمَةَ وَالمُسْتَوْشِمَةَ ‘যে মহিলা পরচুলা লাগিয়ে দেয় এবং যাকে পরচুলা লাগানো হয়, আর যে মহিলা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে উলকি উৎকীর্ণ করে এবং যে উলকি উৎকীর্ণ করায় আল্লাহ তাদেরকে অভিশাপ করেছেনÕ|[9] অনুরূপভাবে ভ্রূপ্লাগ করে আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন ঘটানো নিষেধ। রাসূল (ছাঃ) বলেন,لَعَنَ اللهُ الْوَاشِمَاتِ وَالْمُسْتَوْشِمَاتِ، وَالْمُتَنَمِّصَاتِ وَالْمُتَفَلِّجَاتِ لِلْحُسْنِ، الْمُغَيِّرَاتِ خَلْقَ اللهِ. مَا لِى لاَ أَلْعَنُ مَنْ لَعَنَ رَسُولُ اللهِ  صلى الله عليه وسلم وَهْوَ فِى كِتَابِ اللهِ  ‘সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য যে নারী উল্কি উৎকীর্ণ করে ও করায়, যে নারী ভ্রূ উপড়ে ফেলে এবং যে নারী দাঁত কেটে চিকন করে দাঁতের মাঝখানে ফাঁক করে- যে কাজগুলো দ্বারা আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে রূপান্তর ঘটে, এদের উপর আল্লাহ অভিশাপ বর্ষণ করুন। আমি কেন তার উপর অভিশাপ করব না, যাদের উপর আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) অভিশাপ করেছেন এবং মহান আল্লাহর কিতাবেই তা বিদ্যমান আছে’।[10] আল্লাহ বলেন, وَلَآمُرَنَّهُمْ فَلَيُغَيِّرُنَّ خَلْقَ اللهِ ‘আমি (শয়তান) তাদেরকে আদেশ করব যেন তারা আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন করে’ (নিসা ৪/১১৯)

(১৩) পুরুষের বেশধারী নারী ও নারীর বেশধারী পুরুষ : যে নারী পুরুষের লেবাস গ্রহণ করে এবং যে পুরুষ নারীদের লেবাস, চাল-চলন নকল করে তাদের উপর আল্লাহর রাসূলের লা‘নত বর্ষিত হয়। আব্দুল্লাহ বিন আববাস (রাঃ) বলেন, لَعَنَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ المُتَشَبِّهِينَ مِنَ الرِّجَالِ بِالنِّسَاءِ، وَالمُتَشَبِّهَاتِ مِنَ النِّسَاءِ بِالرِّجَالِ- ‘আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) নারীর বেশ ধারণকারী পুরুষদেরকে এবং পুরুষের বেশ ধারণকারী মহিলাদেরকে অভিশাপ করেছেন’।[11]

(১৪) হিললা বিবাহ দেয়া ও যার জন্য দেয়া হয় : তালাকপ্রাপ্তা মহিলাকে স্বামীর জন্য হালাল করার উদ্দেশ্যে শর্তসাপেক্ষে সাময়িক বিবাহ প্রদানকে ‘হিল্লাহ’ বিবাহ বলে। এ ধরনের কাজ লা‘নতের কারণ। উকবাহ বিন আমের (রাঃ) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِالتَّيْسِ الْمُسْتَعَارِ، قَالُوا : بَلَى يَا رَسُولَ اللهِ، قَالَ: هُوَ الْمُحَلِّلُ، لَعَنَ اللهُ الْمُحَلِّلَ وَالْمُحَلَّلَ لَهُ- ‘আমি কি তোমাদেরকে ভাড়াটে পাঁঠা সম্পর্কে অবহিত করব না? তারা বললেন, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বলেন, সে হ’ল হালালকারী। আল্লাহ হালালকারী এবং যার জন্য হালাল করা হয় তাদের উভয়কে অভিসম্পাত করেছেন’।[12]

(১৫) ঘুষ দাতা ও ঘুষ গ্রহীতার উপর লা‘নত : আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) বলেছেন, ঘুষ আদান-প্রদান করা লা‘নতের কারণ। হাদীছে এসেছে,لَعَنَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الرَّاشِي وَالْمُرْتَشِي ‘আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ঘুষ দাতা এবং ঘুষ গ্রহীতার উপর লা‘নত করেছেন’।[13]

(১৬)  চৌর্যবৃত্তি : আল্লাহ তা‘আলা চোরদের প্রতি লা‘নত করেছেন। বর্তমানে যেসব বড় বড় কর্মকর্তা পুকুর চুরিতে লিপ্ত আছেন তাদের পরকালে ভয়াবহ অবস্থা হবে। আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেছেন, নবী করীম (ছাঃ) বলেন,لَعَنَ اللهُ السَّارِقَ، يَسْرِقُ البَيْضَةَ فَتُقْطَعُ يَدُهُ، وَيَسْرِقُ الحَبْلَ فَتُقْطَعُ يَدُهُ- ‘চোরের উপর আল্লাহর লা‘নত নিপতিত হয়, যখন সে একটি ডিম চুরি করে এবং এর জন্য তার হাত কাটা যায়। আর সে একটি রশি চুরি করে এবং এর জন্য তার হাত কাটা যায়’।[14]

হাদীছটির ব্যাখ্যায় আ‘মাশ (রহঃ) বলেন,كَانُوا يَرَوْنَ أَنَّهُ بَيْضُ الحَدِيدِ، وَالحَبْلُ كَانُوا يَرَوْنَ أَنَّهُ مِنْهَا مَا يَسْوَى دَرَاهِمَ- ‘ডিম দ্বারা লোহার টুকরা এবং রশি দ্বারা কয়েক দিরহাম মূল্যমানের রশিকে বোঝানো হয়েছে’।[15]

ইমাম নববী (রাঃ) বলেন,إِنَّ الْمُرَادَ بِالْبَيْضَةِ بَيْضَةُ الْحَدِيدِ الَّتِي يُغَطَّى بِهَا الرَّأْسُ فِي الْحَرْبِ وَبِالْحَبْلِ الْوَاحِدِ مِنْ حِبَالِ السَّفِينَةِ وَكُلُّ وَاحِدٍ مِنْ هَذَيْنِ يَبْلُغُ دَنَانِيرَ كَثِيْرَةً- ‘এর দ্বারা লোহার হেলমেট উদ্দেশ্য, যা দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে মাথা ঢেকে রাখা হয়। আর রশি দ্বারা নৌকার বা জাহাযের রশিকে বুঝানো হয়েছে। আর এর প্রত্যেকটির মূল্যই প্রচুর পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রার মূল্যের সমান’।[16]

(১৭) মাদকের সাথে সংশ্লিষ্টতা : মদ পান করা, মদ বহনকারী, মদ বিক্রেতা ইত্যাদি কাজে জড়িতদের উপর আল্লাহর লা‘নত হয়। আনাস বিন মালেক (রাঃ) বলেন,لَعَنَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الخَمْرِ عَشَرَةً: عَاصِرَهَا، وَمُعْتَصِرَهَا، وَشَارِبَهَا، وَحَامِلَهَا، وَالمَحْمُولَةُ إِلَيْهِ، وَسَاقِيَهَا، وَبَائِعَهَا، وَآكِلَ ثَمَنِهَا، وَالمُشْتَرِي لَهَا، وَالمُشْتَرَاةُ لَه- ‘মদের সাথে সম্পৃক্ত দশ শ্রেণীর লোককে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) লা‘নত করেছেন। মদ প্রস্ত্ততকারী, যে মদ প্রস্ত্তত করতে বলে, পানকারী, বহনকারী, যার জন্য বহন করা হয়, যে পান করায়, বিক্রয়কারী, এর মূল্য গ্রহণকারী, যে মদ ক্রয় করে এবং যার জন্য ক্রয় করা হয়’।[17]

উল্লেখ্য, মানুষের মস্তিষ্ককে যা আচ্ছন্ন করে তা মাদক। তা পানীয় হোক বা খাদ্য। যে সমস্ত খাদ্য ও পানীয়তে নেশা সৃষ্টিকারী বস্ত্ত রয়েছে তা বর্জন করতে হবে। গুল, জর্দা, তামাক, বিড়ি, সিগারেট, ভদকা, কোকেন ইত্যাদি সবই এর অন্তর্ভুক্ত তথা হারাম।

(১৮) দুনিয়া স্বয়ং লা‘নতপ্রাপ্ত : আবূ হুরায়রা (রাঃ) হাদীছ বর্ণনা করেছেন। যেখানে নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,الدُّنْيَا مَلْعُونَةٌ، مَلْعُونٌ مَا فِيهَا، إِلَّا ذِكْرَ اللهِ، وَمَا وَالَاهُ، أَوْ عَالِمًا، أَوْ مُتَعَلِّمًا ‘নিঃসন্দেহে দুনিয়া অভিশপ্ত। অভিশপ্ত তার মধ্যে যা কিছু আছে (সবই)। তবে আল্লাহর যিকর এবং তার সাথে সম্পৃক্ত জিনিস, আলেম ও তালেবে-ইলম ব্যতীত’।[18]

আমরা যে দুনিয়া অর্জনের জন্য সর্বদা ব্যস্ত থাকি, আল্লাহ ও রাসূলকে ভুলে থাকি, ইবাদত থেকে গাফেল থাকি সেই মরিচিকাতুল্য দুনিয়া সম্পর্কে হাদীছের এই কঠিনবাণী সম্পর্কে নিশ্চয়ই আমাদেরকে ভাবতে হবে।

অন্যত্র আরেকটি হাদীছে বলা হয়েছে, জাবের (রাঃ) বলেন,

مَرَّ بِالسُّوقِ، دَاخِلًا مِنْ بَعْضِ الْعَالِيَةِ، وَالنَّاسُ كَنَفَتَهُ، فَمَرَّ بِجَدْيٍ أَسَكَّ مَيِّتٍ، فَتَنَاوَلَهُ فَأَخَذَ بِأُذُنِهِ، ثُمَّ قَالَ : أَيُّكُمْ يُحِبُّ أَنَّ هَذَا لَهُ بِدِرْهَمٍ؟ فَقَالُوا : مَا نُحِبُّ أَنَّهُ لَنَا بِشَيْءٍ، وَمَا نَصْنَعُ بِهِ؟ قَالَ : أَتُحِبُّونَ أَنَّهُ لَكُمْ؟ قَالُوا : وَاللهِ لَوْ كَانَ حَيًّا، كَانَ عَيْبًا فِيهِ، لِأَنَّهُ أَسَكُّ، فَكَيْفَ وَهُوَ مَيِّتٌ؟ فَقَالَ : فَوَاللهِ لَلدُّنْيَا أَهْوَنُ عَلَى اللهِ، مِنْ هَذَا عَلَيْكُمْ-

‘একদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আলিয়া (অঞ্চল) হ’তে মদীনায় আসার পথে এক বাজার দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উভয় পার্শ্বে বেশ লোকজন ছিল। যেতে যেতে তিনি ক্ষুদ্র কান বিশিষ্ট একটি মৃত বকরীর বাচ্চার নিকট পৌঁছলেন। অতঃপর তিনি এর কান ধরে বললেন, তোমাদের কেউ কি এক দিরহামের বিনিময়ে এটা নিতে আগ্রহী হবে। তখন উপস্থিত লোকেরা বলল, কোন কিছুর বিনিময়ে আমরা উহা নিতে আগ্রহী নই এবং এটি নিয়ে আমরা কি করব? তখন রাসুলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, (বিনা পয়সায়) তোমরা কি উহা নিতে আগ্রহী? তারা বলল, এ যদি জীবিত থাকতো তবুও তো এটা দোষী। কেননা এর কান হচ্ছে ক্ষুদ্র। আর এখন তো তা মৃত, কিভাবে আমরা তা গ্রহণ করব? অতঃপর রাসূল (ছাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম! এ ছাগলটি তোমাদের নিকট যতটা তুচ্ছ, আল্লাহর নিকটে দুনিয়া এর চেয়েও অধিক তুচ্ছ’।[19]

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেন,

إِنَّ الدُّنْيَا حُلْوَةٌ خَضِرَةٌ، وَإِنَّ اللهَ مُسْتَخْلِفُكُمْ فِيهَا، فَيَنْظُرُ كَيْفَ تَعْمَلُونَ، فَاتَّقُوا الدُّنْيَا وَاتَّقُوا النِّسَاءَ، فَإِنَّ أَوَّلَ فِتْنَةِ بَنِي إِسْرَائِيلَ كَانَتْ فِي النِّسَاءِ وَفِي حَدِيثِ ابْنِ بَشَّارٍ: لِيَنْظُرَ كَيْفَ تَعْمَلُونَ –

‘নিশ্চয়ই দুনিয়া মিষ্ট সবুজ (সুস্বাদু দর্শনীয়), আল্লাহ তা‘আলা সেখানে তোমাদের খলীফা হিসাবে পাঠিয়েছেন। অতঃপর তিনি দেখেন তোমরা কি কর? অতএব তোমরা দুনিয়া ও নারী থেকে সাবধান থাক। কেননা বনী ইসরাঈলদের মধ্যে যে প্রথম ফিতনা দেখা দিয়েছিল তা ছিল নারীকে কেন্দ্র করে’।[20]

উল্লেখ্য, পুরুষেরা যেমনভাবে নারীদের হ’তে বেঁচে থাকবে তেমনিভাবে নারীরাও পুরুষ হ’তে সর্বাত্মকভাবে বেঁচে থাকবে। কেননা এ হুকুমের মধ্যে উভয়েই শামিল। এরকম আরো অনেক হাদীছ রয়েছে যেখানে দুনিয়াবিমুখ হ’তে বলা হয়েছে।

(১৯) যুলুম করা : যালিমদের উপর আল্লাহ লা‘নত করেন। তিনি বলেছেন, أَلَا لَعْنَةُ اللهِ عَلَى الظَّالِمِينَ ‘জেনে রাখ! যালিমদের উপর আল্লাহ লা‘নত করেন’ (হূদ ১১/১৮)

(২০) মানুষকে অস্ত্র দ্বারা ভয় দেখানো : যে ব্যক্তি মানুষকে ধারালো হাতিয়ার দ্বারা ভয় দেখায় বা ইশারা করে তার উপর ফেরেশতাগণ লা‘নত করেন।

عَنِ ابْنِ سِيرِينَ، سَمِعْتُ أَبَا هُرَيْرَةَ، يَقُولُ : قَالَ أَبُو الْقَاسِمِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : مَنْ أَشَارَ إِلَى أَخِيهِ بِحَدِيدَةٍ، فَإِنَّ الْمَلَائِكَةَ تَلْعَنُهُ، حَتَّى يَدَعَهُ وَإِنْ كَانَ أَخَاهُ لِأَبِيهِ وَأُمِّهِ –

ইবনু সীরীন (রহঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি আবূ হুরায়রা (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আবূল কাসিম (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রতি (লৌহ নির্মিত) অস্ত্র উত্তোলন করে সে তা ত্যাগ না করা পর্যন্ত ফেরেশতাগণ তাকে লা‘নত করতে থাকে যদিও তার সহোদর ভাই হয়’।[21]

বর্তমানে যেসকল মানুষ নিজের ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের ছত্রছায়ায় অস্ত্রের মহড়া প্রদর্শন করে এবং যারা ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে খারেজীদের অনুকরণে অস্ত্রধারণ করে তারা সবাই এই হাদীছের বিধানের অন্তর্ভুক্ত।

(চলবে)

[1]. ছহীহ মুসলিম হা/১৯৭৮। 

[2]. ইবনু বাত্তা, আল-ইবানাতুল কুবরা হা/১৫৩১, ছহীহ। 

[3]. তিরমিযী হা/২১৫৪, হাসান।

[4]. মুসলিম হা/১৩৬৬, ১৯৭৮।

[5]. বুখারী হা/৪৩৫। 

[6]. ইবনু মাজাহ হা/২৬৩৫; ছহীহুল জামে‘ হা/২১৯৫। 

[7]. আবূদাঊদ হা/২১৬২, হাসান। 

[8]. তিরমিযী হা/১৪৫৬; ছহীহুল জামে‘ হা/৫৮৯১।  

[9]. বুখারী হা/৫৯৩৭। 

[10]. বুখারী হা/৫৯৪৮; মুসলিম হা/২১২৫; আবূদাঊদ হা/৪১৬৯; মিশকাত হা/৪৪৩১।

[11]. বুখারী হা/৫৮৮৫।

[12]. আবূদাঊদ হা/২০৭৬, হাসান। 

[13]. আবূদাঊদ হা/৩৫৮০, ছহীহ।  

[14]. বুখারী হা/৬৭৮৩।   

[15]. বুখারী হা/৬৭৮৩।   

[16]. শরহে ছহীহ মুসলিম ১/২০৮।   

[17]. তিরমিযী হা/১২৯৫, ছহীহ।  

[18]. ইবনু মাজাহ হা/৪১১২, হাসান।    

[19]. মুসলিম হা/২৯৫৭; মিশকাত হা/৫১৫৭।    

[20]মুসলিম হা/২৭৪২    

[21]মুসলিম হা/২৬১৬


আহমাদুল্লাহ/সৈয়দপুর, নীলফামারী।

সুএঃ মাসিক আত-তাহরীক অক্টোবর ২০১৮

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য পোস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close