আখলাক | ব্যক্তিত্ব | পরিবারিক আদর্শ

একজন আদর্শবান ব্যক্তির গুণাবলী (৫ম কিস্তি)

(১০) দানশীলতা :
এমন একটি মহৎগুণ যার মাধ্যমে একজন মানুষ শ্রেষ্ঠ মানুষে পরিণত হয়। দানের মাধ্যমে একজন মানুষ সকলের প্রিয়পাত্র ও আশীর্বাদপ্রাপ্ত হয়। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে সক্ষম হয়। ফলে সে জাহান্নামের কঠিন আযাব হ’তে মুক্তি লাভ করে। মহান আল্লাহ বলেন, وَمَا أَنْفَقْتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَهُوَ يُخْلِفُهُ وَهُوَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ ‘আর তোমরা যা কিছু (তাঁর পথে) পথে ব্যয় করবে, তিনি তার বদলা দিবেন। তিনিই শ্রেষ্ঠ রূযীদাতা’ (সাবা ৩৪/৩৯)। তিনি অন্যত্র বলেন وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ خَيْرٍ فَلِأَنْفُسِكُمْ وَمَا تُنْفِقُونَ إِلَّا ابْتِغَاءَ وَجْهِ اللَّهِ وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ خَيْرٍ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تُظْلَمُونَ  ‘আর তোমরা তো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্যে ব্যয় করো না। উত্তম সম্পদ হ’তে তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে, তার পুরস্কার তোমরা পুরাপুরি পেয়ে যাবে। তোমাদের প্রতি কোনরূপ অন্যায় করা হবে না’ (বাক্বারাহ ২/২৭২)। তিনি আরো বলেন, الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ سِرًّا وَعَلَانِيَةً فَلَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ ‘যারা তাদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে রাত্রে ও দিনে, গোপনে ও প্রকাশ্যে, তাদের জন্য উত্তম পারিতোষিক রয়েছে তাদের প্রতিপালকের নিকটে। তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তান্বিত হবে না’ (বাক্বারাহ ২/২৭৪)। অত্র আয়াতে মহান আল্লাহ তা‘আলা ঐসব লোকদের প্রশংসা করেছেন যারা আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী তাঁর পথে খরচ করে। তাদের জন্য পূর্ণ প্রতিদান রয়েছে। আর তারা যে কোন ভয় ও চিন্তা হ’তে নিরাপত্তা লাভ করবে। পরিবারের খরচ বহন করার কারণেও তাদেরকে প্রতিদান দেয়া হবে।
দান করার তাগিদ দিয়ে রাসূলুল্লাহ বহু হাদীছ পেশ করেছেন। তন্মধ্যে কতিপয় নিম্নরূপ।
আদি ইবনু হাতিম (রাঃ) বলেন, আমি নবী করীম (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, اتَّقُوا النَّارَ وَلَوْ بِشِقِّ تَمْرَةٍ ‘তোমরা জাহান্নাম থেকে বাঁচ; যদিও একটুকরা খেজুর দান কর হয়’।[1]
জাবির (রাঃ) বলেন, مَا سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ شَيْئًا قَطُّ فَقَالَ لَا ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট এমন কোন জিনিসই চাওয়া হয়নি, যার জবাবে তিনি না বলেছেন’।[2]
ইবনু মাসঊদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, لَا حَسَدَ إِلَّا فِي اثْنَتَيْنِ رَجُلٍ آتَاهُ اللَّهُ مَالًا فَسَلَّطَهُ عَلَى هَلَكَتِهِ فِي الْحَقِّ وَرَجُلٍ آتَاهُ اللَّهُ الْحِكْمَةَ فَهُوَ يَقْضِي بِهَا وَيُعَلِّمُهَا ‘কেবল দু’টি বিষয়ে ঈর্ষা করা যায়। (১) ঐ ব্যক্তির প্রতি যাকে মহান আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন অতঃপর তাকে হক্ব পথে অকাতরে দান করার ক্ষমতা  দিয়েছেন। (২) ঐ ব্যক্তির প্রতি যাকে আল্লাহ হিকমত দান করেছেন, অতঃপর সে তার দ্বারা  ফায়সালা করে ও শিক্ষা  দেয়’।[3]
আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَا مِنْ يَوْمٍ يُصْبِحُ الْعِبَادُ فِيهِ إِلاَّ مَلَكَانِ يَنْزِلاَنِ فَيَقُولُ أَحَدُهُمَا اللَّهُمَّ أَعْطِ مُنْفِقًا خَلَفًا، وَيَقُولُ الآخَرُ اللَّهُمَّ أَعْطِ مُمْسِكًا تَلَفًا- ‘প্রতিদিন সকালে দু’জন ফেরেশতা অবতরণ করেন। তাদের একজন বলেন, হে আল্লাহ! দাতাকে তার দানের বিনিময় দিন। আর অপরজন বলেন, হে আল্লাহ! কৃপণকে ধ্বংস করে দিন’।[4]
আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, أَنْفِقْ يَا ابْنَ آدَمَ أُنْفِقْ عَلَيْكَ ‘হে আদম সন্তান! তুমি দান কর; আল্লাহ তোমাকে দান করবেন’।[5]
আসমা বিনতে আবু বকর (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাকে বললেন, انْفَحِى أَوِ انْضَحِى أَوْ أَنْفِقِى وَلاَ تُحْصِى فَيُحْصِىَ اللَّهُ عَلَيْكِ وَلاَ تُوعِى فَيُوعِىَ اللَّهُ عَلَيْكِ ‘তুমি সম্পদ বেঁধে (জমা করে) রেখনা, এরূপ করলে তোমার নিকট (আসা থেকে) তা বেঁধে রাখা হবে। অন্য বর্ণনায় আছে, খরচ কর, গুণে রেখনা। এরূপ করলে আল্লাহও তোমাকে গুণে গুণে দেবেন। আর তুমি জমা করে রেখ না, এরূপ করলে আল্লাহও তোমার প্রতি (খরচ না করে) জমা করে রাখবেন’।[6]
আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ تَصَدَّقَ بِعَدْلِ تَمْرَةٍ مِنْ كَسْبٍ طَيِّبٍ  وَلاَ يَقْبَلُ اللَّهُ إِلاَّ الطَّيِّبَ  وَإِنَّ اللَّهَ يَتَقَبَّلُهَا بِيَمِينِهِ، ثُمَّ يُرَبِّيهَا لِصَاحِبِهِ كَمَا يُرَبِّى أَحَدُكُمْ فَلُوَّهُ حَتَّى تَكُونَ مِثْلَ الْجَبَلِ ‘যে ব্যক্তি বৈধ উপায়ে উপার্জিত অর্থ থেকে একটি খেজুর পরিমাণও কিছু দান করে; আর আল্লাহ তা বৈধ উপার্জন ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণই করেন না। সে ব্যক্তির ঐ দানকে আল্লাহ ডান হাতে গ্রহণ করেন। অতঃপর তা ঐ ব্যক্তির জন্য লালন-পালন করে থাকেন; যেমন তোমাদের কেউ তার শাবককে লালন-পালন করে থাকে। পরিশেষে তা পাহাড়ের মত হয়ে যায়’।[7]
(১১) কৃপণতা হ’তে বেঁচে থাকা :
দানশীলতার সম্পূর্ণ বিপরীত হ’ল কৃপণতা। দানশীল ব্যক্তিকে যেমন সকলে শ্রদ্ধা করে অনুরূপ কৃপণ ব্যক্তিকে সবাই ঘৃণা করে। যার অন্তরে কৃপণতা রয়েছে সে কখনই সফলতা লাভ করত পার না। কৃপণ ব্যক্তির জন্য আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নামের পথ সুগম করে দেন। কৃপণতা এমন একটি মন্দ গুণ যা মানুষকে কলুষিত করে ফেলে। সুতরাং শ্রেষ্ঠ মানুষ হ’তে হলে আমাদেরকে অবশ্যই কৃপণতা পরিহার করে চলতে হবে।
আল্লাহ বলেন, وَأَمَّا مَنْ بَخِلَ وَاسْتَغْنَى – وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَى – فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْعُسْرَى – وَمَا يُغْنِي عَنْهُ مَالُهُ إِذَا تَرَدَّى –   ‘পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কৃপণতা করে ও বেপরোয়া র এবং উত্তম বিষয়কে মিথ্যা মনে করে। অচিরেই আমরা তাকে কঠিন পথের জন্য সহজ করে দেব। তার ধন-সম্পদ তার কোন কাজে আসবে না, যখন সে ধ্বংস হবে’ (লাইল /৮-১১)।
অত্র আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি কৃপণতা করল অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী তাঁর পথে ব্যয় করল না; তাঁকে যথাযথ ভয় করল না, তাঁর ওয়াদাকৃত পুরষ্কারকে মিথ্যারোপ করল, তাঁর অঙ্গীকারের প্রতি অবিশ্বাস করল, আর যা কিছু মন্দ তা গ্রহণ করল, তার জন্য আমি কঠোর পরিণাম অর্থাৎ জাহান্নামের পথকে সুগম করে দিব। যেমন মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেন, وَنُقَلِّبُ أَفْئِدَتَهُمْ وَأَبْصَارَهُمْ كَمَا لَمْ يُؤْمِنُوا بِهِ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَنَذَرُهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُونَ ‘আর আমরাও ঘুরিয়ে দেব তাদের অন্তর ও দৃষ্টিসমূহকে। যেমন তারা প্রথমবার এতে ঈমান আনেনি। আর আমরা তাদেরকে তাদের অবাধ্যতার মধ্যেই বিভ্রান্ত থাকতে দেব’ (আন‘আম ৬/১১০)। মহান আল্লাহ বলেন, وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ ‘এটিই তোমাদের কল্যাণকর। বস্ত্ততঃ যারা হৃদয়ের কার্পন্য হ’তে মুক্ত তারাই সফলকাম’ (তাগাবুন ৬৪/১৬)।
কৃপণতা হ’তে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ইরশাদ করেছেন, জাবির (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, اتَّقُوا الظُّلْمَ فَإِنَّ الظُّلْمَ ظُلُمَاتٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَاتَّقُوا الشُّحَّ فَإِنَّ الشُّحَّ أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ حَمَلَهُمْ عَلَى أَنْ سَفَكُوا دِمَاءَهُمْ وَاسْتَحَلُّوا مَحَارِمَهُمْ- ‘অত্যাচার করা হ’তে বেঁচে থাক। কেননা অত্যাচার ক্বিয়ামতের দিন অন্ধকারের কারণ হবে। আর কৃপণতা থেকে দূরে থাক। কেননা কৃপণতা তোমাদেরে পূর্ববর্তীদেরকে ধ্বংস করে দিয়ছে। কৃপণতাই তাদেরকে প্ররোচিত করেছিল। ফলে তারা নিজেদের রক্তপাত ঘটিয়েছিল এবং তাদের উপর হারামকৃত বস্ত্ত সমূহকে হালাল করে নিয়েছিল’।[8]
আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছেন, مَثَلُ الْبَخِيلِ وَالْمُنْفِقِ كَمَثَلِ رَجُلَيْنِ، عَلَيْهِمَا جُبَّتَانِ مِنْ حَدِيدٍ، مِنْ ثُدِيِّهِمَا إِلَى تَرَاقِيهِمَا، فَأَمَّا الْمُنْفِقُ فَلاَ يُنْفِقُ إِلاَّ سَبَغَتْ أَوْ وَفَرَتْ عَلَى جِلْدِهِ حَتَّى تُخْفِىَ بَنَانَهُ وَتَعْفُوَ أَثَرَهُ، وَأَمَّا الْبَخِيلُ فَلاَ يُرِيدُ أَنْ يُنْفِقَ شَيْئًا إِلاَّ لَزِقَتْ كُلُّ حَلْقَةٍ مَكَانَهَا، فَهُوَ يُوَسِّعُهَا وَلاَ تَتَّسِعُ –  ‘কৃপণ ও দানশীলের দৃষ্টান্ত এমন দুই ব্যক্তির মত যাদের পরিধানের দু’টি লোহার বর্ম রয়েছে। যা তাদের বুক থেকে টুটি পর্যন্ত বিস্তৃত। সুতরাং দানশীল যখন দান করে তখনই সেই বর্ম তার সারা দেহে বিস্তৃত হয়ে যায়। এমনকি তা তার আঙ্গুল গুলোকেও ঢেকে ফেলে এবং তার পদচিহ্ন (পাপ বা ত্রুটি) মুছে দেয়। পক্ষান্তরে কৃপণ যখনই কিছু দান করার ইচ্ছা করে, তখনই বর্মের প্রতিটি আংটা যথাস্থানে এঁটে যায়। সে তা প্রশস্ত করতে চাইলেও তা প্রশস্ত হয় না’।[9]
(১২) বিনয়-নম্র হওয়া :
বিনয়-নম্রতা এমন একটি গুণ যার দ্বারা মানুষ চরম শত্রুকেও পরম বন্ধুতে পরিণত করতে পারে। বিনয়ী ও নম্র মানুষ সকলের প্রিয় হ’তে পারে। এ জন্যই মহান আল্লাহ মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে ইরশাদ করেছেন, أَفَرَأَيْتَ إِنْ مَتَّعْنَاهُمْ سِنِينَ  ‘ভেবে দেখ, যদি আমরা তাদেরকে বহু বছর যাবৎ ভোগ-বিলাসের সুযোগ দেই’ (শু‘আরা ২৬/২০৫)। মহান আল্লাহ আরো বলেন, يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَنْ يَرْتَدَّ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি স্বীয় দ্বীন হ’তে ফিরে যায়, (তাদের বদলে) অচিরেই আল্লাহ এমন একটি সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন, যাদেরকে আল্লাহ ভালবাসবেন এবং তারা আল্লাহকে ভালবাসবে। যারা মুসলমানদের প্রতি বিনয়ী হবে এবং কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে’ (মায়েদা ৫/৫৪)।
অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদের গুণাবলী বর্ণনা করে বলছেন যে তারা তাদের বন্ধুদের (মুসলমানদের) প্রতি খুবই কোমল ও নম্র হবে, কিন্তু কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর হবে। যেমন অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ ‘মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আর যারা তার সাথী, তারা অবিশ্বাসীদের প্রতি কঠোর ও নিজেদের মধ্যে রহমদিল’ (ফাৎহ ৪৮/২৯)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বন্ধুদের সামনে ছিলেন হাসিমুখ ও প্রফুলল হৃদয়, আর শত্রুদের সামনে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও সংগ্রামী বীর পুরুষ’।[10]
বিনয় ও নম্রতার মূর্ত প্রতীক রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,  وَإِنَّ اللَّهَ أَوْحَى إِلَىَّ أَنْ تَوَاضَعُوا حَتَّى لاَ يَفْخَرَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ وَلاَ يَبْغِى أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ– ‘আল্লাহ তা‘আলা আমার নিকট অহী পাঠালেন যে, তোমরা পরস্পরে নম্র ব্যবহার কর। যাতে কেউ যেন কারো প্রতি গর্ব না করে এবং কেউ যেন কারো প্রতি যুলুম না করে’।[11]
আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ وَمَا زَادَ اللَّهُ عَبْدًا بِعَفْوٍ إِلاَّ عِزًّا وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلاَّ رَفَعَهُ اللهُ– ‘ছাদাকা করলে সম্পদ কমে যায় না এবং ক্ষমা করলে আল্লাহ সম্মান বাড়িয়ে দেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয় আল্লাহ তাকে মর্যাদায় উচ্চকিত করেন’।[12] আবু হুরায়রা (রাঃ) আরও বর্ণনা করেছেন যে, নবী (ছাঃ) বলেছেন, لَوْ دُعِيتُ إِلَى ذِرَاعٍ أَوْ كُرَاعٍ لأَجَبْتُ، وَلَوْ أُهْدِىَ إِلَىَّ ذِرَاعٌ أَوْ كُرَاعٌ لَقَبِلْتُ-  ‘যদি আমাকে ছাগলের পা অথবা বাহু খাওয়ানোর জন্য দাওয়াত দেয়া হয় তাহ’লে আমি নিশ্চয় কবুল করব। আর যদি আমাকে পা অথবা বাহু উপঢৌকন দেয়া হয় তাহ’লে আমি নিশ্চয় তা গ্রহণ করব’।[13]
(১৩) অহংকার পরিহার করা :
বাংলায় অহংকার, দম্ভ বা গর্ব, ইংরেজীতে Yarity, Pride, Egoism আরবীতে الكبر، الاعجاب পরিভাষায় অহংকার হ’ল সত্য প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা। অহংকার বা দম্ভ করতে নিষেধ করে মহান আল্লাহ বলেন, وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّكَ لَنْ تَخْرِقَ الْأَرْضَ وَلَنْ تَبْلُغَ الْجِبَالَ طُولًا  ‘পৃথিবীতে দম্ভভরে বিচরণ করো না। নিশ্চয়ই তুমি ভূ-পৃষ্ঠকে বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় কখনো পাহাড় সমান হতে পারবে না (বনী ইসরাঈল ১৭/৩৭)।
অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় বান্দাকে দর্প ভরে বাবুয়ানা চালে চলতে নিষেধ করেছেন। উদ্ধত ও অহংকারী লোকদের এটা অভ্যাস। এরপর তাদেরকে নিচু করে দেখবার জন্য মহান আল্লাহ বলেন, তুমি যতই মাথা উচু কর চলনা কেন, তুমি পাহাড়ের উচ্চতা থেকে নিচেই থাকবে। আর যতই খট খট করে দম্ভভরে মাটির উপর দিয়ে চলনা কেন, তুমি যমীনকে তোমার পদভারে বিদীর্ণ করতে পারবে না বরং এরূপ লোকদের অবস্থা বিপরীত হয়ে থাকে’।[14]
অন্যত্র  মহান আল্লাহ বলেন, وَلَا تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ ‘আর অহংকারবশে তুমি মানুষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না এবং যমীনে উদ্ধতভাবে চলাফেরা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন দাদ্ভিম ও অহংকারীকে ভালবাসেন না’ (লোকমান ৩১/১৮)।
আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِى قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ قَالَ رَجُلٌ إِنَّ الرَّجُلَ يُحِبُّ أَنْ يَكُونَ ثَوْبُهُ حَسَنًا وَنَعْلُهُ حَسَنَةً. قَالَ إِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ وَغَمْطُ النَّاسِ-‘যার অন্তরে অনু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। একটি লোক বলল, মানুষতো ভালবাসে সে তার পোষাক সুন্দর হোক ও তার জুতা সুন্দর হোক তাহ’লে? তিনি বললেন, আল্লাহ সুন্দর তিনি সৌন্দর্যকে ভালবাসে। অহংকার হ’ল সত্য প্রত্যাখান করা এবং মানুষকে তুচ্ছ জ্ঞান করা’।[15]
সালামাহ ইবনু আকওয়া (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, أَنَّ رَجُلاً أَكَلَ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِشِمَالِهِ فَقَالَ كُلْ بِيَمِينِكَ قَالَ لاَ أَسْتَطِيعُ قَالَ لاَ اسْتَطَعْتَ مَا مَنَعَهُ إِلاَّ الْكِبْرُ قَالَ فَمَا رَفَعَهَا إِلَى فِيهِ- ‘এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট তার বাম হাত দ্বারা খেল। তিনি (সে) বললেন, তোমার ডান হাত দ্বারা খাও। সে বলল, আমি অপারগ। তিনি বললেন, তুমি যেন ডান হাতে খেতে না পার। রাসূলুল্লা (ছাঃ) এর কথা মানতে তাকে অহংকারই বাঁধা দিয়েছিল। বর্ণনাকারী বলেন, তারপর থেকে সে তার ডান হাত মুখে পর্যন্ত উঠাতে পারেনি’।[16]
হারেছ ইবনু ওহাব (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, أَلاَ أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ النَّارِ كُلُّ عُتُلٍّ جَوَّاظٍ مُسْتَكْبِرٍ- ‘আমি রাসূললুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, আমি কি তোমাদের জাহান্নামীদের সম্পর্কে অবহিত করব না? তারা হল প্রত্যেক রুঢ় স্বভাব, কঠিন হৃদয় অহংকারী ব্যক্তি’।[17]
আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, لاَ يَنْظُرُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِلَى مَنْ جَرَّ إِزَارَهُ بَطَرًا– ‘আল্লাহ তা‘আলা ক্বিয়ামতের দিন ঐ  ব্যক্তির প্রতি দৃষ্টিপাত করবেন না, যে অহংকারের সাথে তার লুঙ্গি ছেঁচড়ায়’।[18]
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে, ثَلاَثَةٌ لاَ يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلاَ يُزَكِّيهِمْ قَالَ أَبُو مُعَاوِيَةَ وَلاَ يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ شَيْخٌ زَانٍ وَمَلِكٌ كَذَّابٌ وَعَائِلٌ مُسْتَكْبِرٌ ‘আল্লাহ তা‘আলা ক্বিয়ামতের দিন তিন শ্রেণীর লোকের সাথে কথা বলবেন তাদেরকে পবিত্র করবেন এবং তাদের প্রতি রহমাতের দৃষ্টিপাত করবেন না আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি। তারা হ’ল ব্যভিচারী বৃদ্ধ, মিথ্যা শাসক, অহংকারী গরীব’।[19]
উক্ত রাবী হতেই বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, الْعِزُّ إِزَارُهُ وَالْكِبْرِيَاءُ رِدَاؤُهُ فَمَنْ يُنَازِعُنِى عَذَّبْتُهُ- ‘সম্মান আমার লুঙ্গি এবং অহংকার আমার চাদর। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার কাছে থেকে এর মধ্যে কোন একটি টেনে নিতে চাইবে তাহ’লে আমি তাকে শাস্তি দিব’।[20]
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে আরো বর্ণিত হয়েছে, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,بَيْنَمَا رَجُلٌ يَمْشِى فِى حُلَّةٍ، تُعْجِبُهُ نَفْسُهُ مُرَجِّلٌ جُمَّتَهُ، إِذْ خَسَفَ اللَّهُ بِهِ، فَهْوَ يَتَجَلَّلُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ-  ‘একদা এক ব্যক্তি একজোড়া পোষাক পরে গর্ব ভরে মাথা আচড়ে অহংকারের সাথে চলা ফেরা করছিল। ইত্যবসরে আল্লাহ তাকে ধসিয়ে দিলেন। সুতরাং সে ক্বিয়ামত পর্যন্ত মাটির গভীর নেমে যেতই থাকবে’।[21]
(১৪) সচ্চরিত্রবান হওয়া :
আরবী حسن الخلق، مثالى ইংরেজী Honest, Idealist আর বাংলায় আদর্শবান সচ্চরিত্রবান ইত্যাদি। সচ্চরিত্রতার গুনটি যার মধ্যে থাকবে সেই জগতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। এই গুনটি একজন মানুষকে যাবতীয় অশ্লীল কর্ম থেকে বিরত রাখে। চরিত্র একবার কলুষিত হলে তা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত দুষ্কর। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ও আদর্শবান মানুষ ছিলেন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, وَإِنَّ لَكَ لَأَجْرًا غَيْرَ مَمْنُونٍ ‘আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী’ (কলম ৬৮/৪)।
ক্বাতাদাহ (রহঃ) বলেন, আয়েশা (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর চরিত্র সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বললেন, তাঁর চরিত্র হ’ল কুরআন। অর্থাৎ কুরআনে যা কিছু রয়েছে তা যেন তারই অভ্যাস ও মহৎ চরিত্রের বর্ণনা’।[22]
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, كَانَ النَّبِىُّ صلى الله عليه وسلم أَحْسَنَ النَّاسِ خُلُقًا ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সব মানুষের চাইতে সুন্দর চরিত্রের অধিকারী ছিলেন’।[23]
উক্ত রাবী হতেই বর্ণিত তিনি বলেন, مَا مَسِسْتُ حَرِيرًا وَلاَ دِيبَاجًا أَلْيَنَ مِنْ كَفِّ النَّبِىِّ  صلى الله عليه وسلم وَلاَ شَمِمْتُ رِيحًا قَطُّ أَوْ عَرْفًا قَطُّ أَطْيَبَ مِنْ رِيحِ أَوْ عَرْفِ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم– ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) অপেক্ষা অধিকতর কোমল কান পুরু বা পাতলা রেশম আমি স্পর্শ করিনি। আর তাঁর শরীরের সুগন্ধ অপেক্ষা অধিকতর সুগন্ধ কোন বস্ত্ত আমি কখনো শুকিনি। আর আমি দশ বছর পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর খিদমত করেছি। তিনি কখনো আমার একথা জিজ্ঞেস করেননি কোন কাজ করে বসলে তিনি একথা জিজ্ঞেস করেননি যে, তুমি একাজ কেন করলে? এবং কোন কাজ না করলে তিনি বলেন নি তা কেন করলে না’? [24]
নাওয়াস ইবনু সামআন (রাঃ) বলেন, سَأَلْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَنِ الْبِرِّ وَالإِثْمِ فَقَالَ الْبِرُّ حُسْنُ الْخُلُقِ وَالإِثْمُ مَا حَاكَ فِى صَدْرِكَ وَكَرِهْتَ أَنْ يَطَّلِعَ عَلَيْهِ النَّاسُ– ‘আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে পূন্য ও পাপ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, পূন্য হল সচ্চরিত্রতার নাম। আর পাপ হল তাই যা তোমার অন্তরে সন্দেহ সৃষ্টি করে এবং লোকে তা জেনে ফেলুক এ কথা তুমি অপছন্দ কর’।[25]
আবু দারদা (রাঃ) বর্ণিত নবী (ছাঃ) বলেন, مَا شَىْءٌ أَثْقَلُ فِى مِيزَانِ الْمُؤْمِنِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ خُلُقٍ حَسَنٍ وَإِنَّ اللَّهَ لَيَبْغَضُ الْفَاحِشَ الْبَذِىءَ-  ‘ক্বিয়ামতের দিন ওজন করা দাঁড়িপাল্লায় সচ্চরত্রিতার চেয়ে অন্য কোন বস্ত্তই অধিক ভারী হবে না। আর আল্লাহ তা‘আলা অশ্লীল ও নোংরাকে অপছন্দ করেন’।[26]
আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জিজ্ঞেস করলেন যে, أَتُدْرُونَ مَا أَكْثَرُ مَا يُدْخِلُ النَّاسَ الْجَنَّةَ؟ تَقْوَى اللَّهِ، وَحُسْنُ الْخُلُقِ أَتُدْرُونَ مَا أَكْثَرُ مَا يُدْخِلُ النَّاسَ النَّارَ؟ الْأَجْوَفَانِ: الْفَمُ وَالْفَرْجُ- ‘কোন আমল মানুষকে বেশী জান্নাতে নিয়ে যাবে? তিনি বললেন, আল্লাহভীতি ও সচ্চরিত্র। আর তাঁকে প্রশ্ন করা হল যে, কোন আমল মানুষকে বেশী জাহান্নামে নিয়ে যাবে? তিনি বললেন, মুখ ও যৌনাঙ্গ’।[27]
আবূ হুরায়রা (রাঃ) অন্যত্র বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا وَخِيَارُكُمْ خِيَارُكُمْ لِنِسَائِهِمْ خُلُقًا- ‘মুমিনদের মধ্যে সে ব্যক্তি পূর্ণ মুমিন, যে তাদের মধ্যে চরিত্রের দিক দিয়ে সর্বোত্তম। আর  তোমাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি তারা যারা তাদের স্ত্রীদের নিকট উত্তম’।[28]
আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, إِنَّ الْمُؤْمِنَ لَيُدْرِكُ بِحُسْنِ خُلُقِهِ دَرَجَةَ قَائِمِ اللَّيْلِ وَصَائِمِ النَّهَارِ- ‘অবশ্যই মুমিন তার সচ্চরিত্রতার কারণে দিনে রোযাদার এবং রাতে ইবাদতকারীর মর্যাদ লাভ করে’।[29]
ইমাম তিরমিযী আব্দুল্লাহ ইবনু মুবারক (রহঃ) হতে বর্ণনা করেন, তিন বলেছেন, সচ্চরিত্রতা হল সর্বদা হাসিমুখে থাকা। মানুষের উপকার করা এবং কাউকে কষ্ট না দেওয়া।
(১৫) ক্ষমাশীল হওয়া :
বাংলায় ক্ষমা করা, মাফ করা। আর ইংরেজী প্রতিশব্দ হ’ল Forqive, Excuse, Pardon, Remit। আরবীতে العفو। ‘ক্ষমা’ দু’টি অক্ষরের একটি ছোট শব্দ। কিন্তু এর তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা হ’তে হ’লে একজন মানুষকে অবশ্যই ক্ষমাশীলতার গুণে গুণান্বিত হ’তে হ’বে। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ ‘তুমি ক্ষমার নীতি গ্রহণ কর। লোকদের সৎকাজের আদেশ দাও এবং মূর্খদের এড়িয়ে চল’ (আরাফ ৭/১৯৯)।
অত্র আয়াত সম্পর্কে উয়াইনা (রহঃ) বলেন, যখন মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (ছাঃ) জিবরাঈল (আঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, হে জিবরাঈল (আঃ)-এর উদ্দেশ্য কী? তিনি উত্তরে বললেন, আল্লাহ আপনাকে নির্দেশ দিয়েছে যে, কেউ আপনার উপর অত্যাচার করলে আপনি তাকে ক্ষমা করে দিবেন, যে আপনাকে দান থেকে বঞ্চিত করবে তাকে আপনার দান করবেন। এবং যে আপনার আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, আপনি তার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখবেন।[30]
মহান আল্লাহ আরো বলেন, وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا أَلَا تُحِبُّونَ أَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ ‘তারা যেন তাদের মার্জনা করে ও দোষ-ত্রুটি এড়িয়ে যায়। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করেন? বস্ত্ততঃ আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়াবান’ (নূর ২৪/২২)। আল্লাহ বলেন, وَلَمَنْ صَبَرَ وَغَفَرَ إِنَّ ذَلِكَ لَمِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ ‘আর যে ব্যক্তি ধৈর্যধারণ করে ও ক্ষমা করে, নিশ্চয়ই সেটি হবে শ্রেষ্ঠ কর্মসমূহের অন্তর্ভুক্ত’ (শুরা ৪২/৪৩)। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষ বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর ক্ষমাশীলতার অনুপম দৃষ্টান্ত বর্ণিত হয়েছে অসংখ্য হাদীছে। তন্মধ্যে কয়েকটি নিম্নে আলোকপাত করা হ’ল।
আনাস (রাঃ) বলেন, كُنْتُ أَمْشِى مَعَ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم وَعَلَيْهِ بُرْدٌ نَجْرَانِىٌّ غَلِيظُ الْحَاشِيَةِ، فَأَدْرَكَهُ أَعْرَابِىٌّ فَجَذَبَهُ جَذْبَةً شَدِيدَةً، حَتَّى نَظَرْتُ إِلَى صَفْحَةِ عَاتِقِ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم قَدْ أَثَّرَتْ بِهِ حَاشِيَةُ الرِّدَاءِ مِنْ شِدَّةِ جَذْبَتِهِ، ثُمَّ قَالَ مُرْ لِى مِنْ مَالِ اللَّهِ الَّذِى عِنْدَكَ فَالْتَفَتَ إِلَيْهِ، فَضَحِكَ ثُمَّ أَمَرَ لَهُ بِعَطَاءٍ– ‘একদা আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে পথ চলছিলাম। সে সময় তাঁর উপর মোটা পেড়ে একখানী নাজরানী চাদর ছিল। অতঃপর পথে এক বেদুঈনের সঙ্গে দেখা হ’ল। সে তাঁর চাদর ধরে খুব জোরে টান দিল। আমি নবী (ছাঃ)-এর কাঁধের এক পাশে দেখলাম যে, খুব জোরে টান দেয়ার কারণে চাদরের পাড়ের দাগ পড়ে গেছে। অতঃপর সে বলল, ওহে মুহাম্মাদ! তোমার নিকট আল্লাহর সে মাল আছে, তা থেকে আমাকে দেয়ার আদেশ কর। তিনি তার দিকে মুখ ফিরিয়ে হাসলেন। অতঃপর তাকে কিছু মাল দেয়ার নির্দেশ দিলেন’।[31]
ইবনে মাসঊদ (রাঃ) বলেন, كَأَنِّي أَنْظُرُ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَحْكِي نَبِيًّا مِنَ الْأَنْبِيَاءِ، ضَرَبَهُ قَوْمُهُ فَأَدْمَوْهُ وَهُوَ يَمْسَحُ الدَّمَ عَنْ وَجْهِهِ وَيَقُولُ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِقَوْمِي فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ– ‘আমি যেন এখনো রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে নবীদের মধ্যে এক নবীর ঘটনা বর্ণনা করতে দেখছি। তাঁর সম্প্রদায় তাঁকে রক্তাক্ত করে দিয়েছে। আর তিনি তাঁর চেহারা  হ’তে রক্ত মুছছেন আর বলছেন, হে আল্লাহ! তুমি আমার সম্প্রদায়কে ক্ষমা করে দাও। কেননা তারা অজ্ঞ’।[32]

(ক্রমশঃ)


[লেখক : সভাপতি, দিনাজপুর সাংগঠনিক যেলা ]
উৎস: মাসিক তাওহীদে ডাক

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য পোস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close