বিবিধ বিষয়

প্রবাসীর কথা

প্রত্যেকের নিজস্ব একটা গন্ডি থাকে এবং সেই গন্ডির ভিতরে নিজের কৃতিত্ব প্রকাশ করে থাকে। কর্তৃত্ব চলে সেই গন্ডির ভিতরে। তার বাইরে তার মুদ্রা চলে না। ক্ষমতা প্রদর্শন করে শাসানি ইত্যাদিও নিজের পরিমন্ডলের ভিতরেই প্রয়োগ করতে পারে। এমন মানুষের জন্য তুচ্ছার্থে বলা হয়, ‘কুকুরের ঘেউ-ঘেউ নিজের পাড়ায়।’ নিজ পরিচিতজনদের কাছে মানুষের কদর থাকে। অপরিচিতজনেরা যেহেতু মানীকে চেনে না, তাই তার মান নির্ণয় করতে বিধায় প্রদান করতে পারে না। তাই বলা হয়, ‘আপন গায়ে কুকুর রাজা।’ ‘গাঁয়ের যোগী ভিক পায় না’ এবং ‘গাঁয়ের কনে পোটা-লাগা’ হলেও নিজের দেশের লোক তথা যাদের নিকট পরিচিতি আছে এবং যারা গুণীর গুণ ও কদর মূল্যায়ন করে, তাদের নিকট তিনি মাননীয় হন। অন্যথা পরের গায়ে, বিদেশে বা অপরিচিত স্থানে গুণীর গুণ ও কদর প্রকাশ না পাওয়ার কারণে তিনি মান ও গুণহীনই থেকে যান। এই জন্য বলা হয়, ‘আপন গাঁয়ে ঠাকুর, পরের গাঁয়ে কুকুর।’
বিপদে-আপদে নিজের পরিচিতজন যতটা সাহায্য-সহযোগিতা করে, ততটা অপরিচিত ও অজানা-অচেনা লোকেরা করতে পারে না। মানুষ হিসাবেও বিদেশে মর্যাদা তুলনামূলক কম পাওয়া যায়। অনেক সময় স্বদেশের ঠাকুর, বিদেশে কুকুর হয়ে যায়। অনারব দেশের বড় আরবী শিক্ষিত আরব দেশে এসে নিজের দেশের মতো মান পান না; যেমন এশিয়ার কোন বড় ইংরেজি-শিক্ষিত ইউরোপ-আমেরিকাতে গিয়ে তেমন সম্মান পান না, যতটা স্বদেশে পেয়ে থাকেন। তার উপর যদি তারা আরবী-ইংরেজি ঠিকভাবে বলতে না পারেন, তাহলে তো তথাকার জনসাধারণ এমনকি শিশুদের কাছেও হাসির পাত্র হয়ে উঠেন। আর এ কথার পরীক্ষা করতে পারেন, যারা বাংলার বাইরে অন্য রাজ্যে গেছেন তারাও অনুমান করতে পারেন যারা ঘর-জামাই থাকে অথবা যারা শ্বশুর গ্রামে ঘর বেঁধে বাস করে, তাদের সামাজিক অবস্থা পরিদর্শন করে। একজন আরবী কবি গরীব মানুষের ব্যাপারে লিখেছেন,
يمشي الفقيرُ وكلُّ شيءٍ ضدُّهُ … والناسُ تغلقُ دونَهُ أبوابَها
وتراهُ مبغوضاً وليس بمُذْنبٍ … ويرى العداوةَ لا يرى أسبابَها
حتى الكلابَ إِذا رأتْ ذا ثروةٍ … خَضَعَتْ لديه وحركتْ أذانابَها
وإِذا رأتْ فقيراً عابراً … نَبَحتْ عليه وكشَّرَتْ أنيابَها
‘গরীব রাস্তায় চলে, প্রত্যেক বস্তু যেন তার বিপক্ষে। লোকের তাকে দেখে নিজ নিজ দরজা সশব্দে বন্ধ করে নেয়। লোকেরা তাকে ঘৃণা করে, অথচ সে কোন অপরাধী নয়। সকলকে দেখে তার শত্রু মনে হয়, অথচ শত্রুতার কোন কারণ নেই। এমনকি কুকুরদলও যখন কোন ধনীকে দেখে তখন তার নিকট বিনয় প্রকাশ করে এবং লেজ দুলিয়ে থাকে। অথচ কোন গরীব মানুষকে পার হতে দেখলে তাকে লক্ষ্য করে ভেকাতে শুরু করে এবং দাঁত দেখায়!’
কবি উক্ত কবিতা গরীবের ব্যাপারে লিখেছেন। কিন্তু প্রবাসে প্রবাসীদের অনেকের অবস্থা এমনই; বিশেষ করে যারা পরিশ্রমের কাজ করে এবং ঠিকমতো কথা বলতে মুখ চালাতে পারে না।
অর্থোপার্জনের জন্য পরিজন ছেড়ে বিদেশ বাস করে মানুষ কত যে কষ্ট ভোগ করে, তার অনেকটা আমরা অনুমান করতে পারি বিভিন্ন বিদেশীর অবস্থা দর্শন করে। রিয়াদের একটি বহুতলবিশিষ্ট ট্যাক্সি-স্ট্যান্ডের দেওয়ালে কোন হাউস-ড্রাইভার অথবা সাফাইকর্মী লিখেছে, `এর চাইতে কুকুর-বিড়ালের যিন্দেগী অনেক ভালো।’
অনুমান করতে পারেন ফেসবুকের পোস্ট দেখে। এক ভাই নিজ মায়ের উদ্দেশ্যে লিখেছেন,
‘রাতে আসি সকালে যাই,
দুপুর বেলায় খাবার খাই।
কাজে কাজে জীবন শেষ,
এরই নাম যে বিদেশ।
বাড়ির মানুষ মনে করে
আছি কত সুখে,
কী যে ব্যথা জমে আছে
আমার পোড়া বুকে।
অনেক কষ্ট হয় মাগো
ঝরে মাথার ঘাম,
অল্প টাকা রোযগার বলে
কেউ দেয় না দাম।’
হ্যা, বিদেশের কেউ দাম দেয় না, দেশেও কেউ দাম দেয় না। এমনকি মা-বাপ, স্ত্রী-পরিজনও না। তাদের অনেকে আবার সন্দেহ করে, বিদেশে কামায় অনেক, কিন্তু টাকা দিতে চায় না। অবশ্য এ ব্যাপারে অনেকটা দোষ প্রবাসীর নিজের। কারণ সে দেশে গিয়ে যে ঠাটবাট দেখায়, তাতে মনে হয়, সে অনেক উপার্জন করে। এ ছাড়া একই জায়গার দুটি লোক বিদেশে এসে একজনের চর্চা হয়, অনেক টাকা কামায়। তার গাড়ি-বাড়ি দেখে উভয়কে একই নিক্তিতে ওজন করে নিজের লোকটাকে সন্দেহ হয়। অথচ সবার ভাগ্য এক হয় না। পক্ষান্তরে নিচু কাজ হলে অনেকে লজ্জায় গোপন রাখে। অনেকে ঈদের দিনেও না খেয়ে থাকে অথবা কাজ করতে বাধ্য হয়। আর দেশে ফিরে হাত মোটা কি না পরিজনেরা তা দেখে, কিন্তু মুসাফাহা করার সময় হাত শক্ত কেন, তা কেউ জিজ্ঞাসা করে না। বাবা বিদেশে থাকে বলে, ছেলেমেয়েরা ফুর্তি করে, টাকা ওড়ায়, মোবাইল-বাইক ইত্যাদি কেনার বায়না ধরে। স্বামী বিদেশে থাকে বলে স্ত্রীর বিলাসিতা বৃদ্ধি পায়। অলংকারের উপর অলংকার ও বিলাসিতার সামগ্রীর ফরমায়েশ হয়ে থাকে, অথচ স্ত্রী জানে না যে, প্রবাসে তার স্বামী হয়তো যাকাত ও হাদিয়া গ্রহণ করে থাকে। তার স্বামী ঠিকমতো খেতে পায় না, প্রয়োজনমতো লেবাস পরে না; যাতে দুটো পয়সা বাঁচে। ছেলে বিদেশে থাকে এবং মনোমতো টাকা পায় না বলে মা-বাপের সন্দেহ হয়। ভাবে গোপনে ব্যাংক-ব্যালেন্স করছে, শ্বশুর বাড়ির লোককে দিচ্ছে বা শ্বশুর গ্রামে জমি-জায়গা কিনছে ইত্যাদি। টাকা না পাঠাতে পারলে ফোন বন্ধ হয়। কাজ কী করে, কষ্ট কত হয়—তা তাদের দেখার বিষয় নয়, বিষয় হল টাকা কম কেন? অনেক প্রবাসী এমন আছে, যাদের স্বদেশ-বিদেশ উভয়ের জীবনই জ্বালাময় হয়ে ওঠে। তারা হয় বিদেশের কুকুর, আবার স্বদেশেরও কুকুর।
স্ত্রী ছেড়ে বিদেশ-বাস! হতভাগা সে স্বামী।
“নারী ছাড়ি ধন আশে, যেই থাকে পরবাসে,
তারে বড় কেবা আছে দুখী?”
বিদেশে কত কষ্ট। কেউ কি চায় প্রিয়জন ছেড়ে দূরে থাকতে? সুতরাং যাদের উপায় আছে, তাদের বিদেশ ত্যাগ করে বাড়ি ফিরা উচিত। মহানবী (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অপ্রয়োজনে সফরে থাকতে পছন্দ করতেন না। তিনি বলেছেন,
(( السَّفَرُ قِطْعَةٌ مِنَ العَذَابِ، يَمْنَعُ أحَدَكُمْ طَعَامَهُ وَشَرابَهُ وَنَوْمَهُ، فَإذَا قَضَى أحَدُكُمْ نَهْمَتَهُ مِنْ سَفَرِهِ ، فَلْيُعَجِّلْ إِلَى أهْلِهِ )).
“সফর আযাবের অংশ বিশেষ। সফর তোমাদেরকে পানাহার ও নিদ্রা থেকে বিরত রাখে। সুতরাং যখন তোমাদের কারো সফরের উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে যাবে, তখন সে যেন বাড়ি ফিরার জন্য তাড়াতাড়ি করে।” (বুখারী ১৮০৪, ৩০০১, ৫৪২৯, মুসলিম ৫০৭০নং)
কবি বলেছেন,
“এই সংকটময় কর্মজীবন মনে হয় মরু-সাহারা,
দুরে মায়াময় পুরে দিতেছে দৈত্য পাহারা।
তবে ফিরে যাওয়া ভালো তাহাদের পাশে
পথ চেয়ে আছে যাহারা।”
কোন স্ত্রীই চায় না, তার স্বামী বিদেশে থাক। কিন্তু বিদেশে না থাকলে উপায়ও তো নেই। এ কথা সবারই জানা যে, দরজা দিয়ে অভাব ঢুকলে জানালা দিয়ে ভালোবাসা লুকিয়ে পালিয়ে যায়। আজ স্ত্রী লিখছে, “দেশে ফিরে এসো। নুন ছিটিয়ে ভাত খেয়ে গাছ তলায় পড়ে থাকব। এক সাথে থাকব, সুখে থাকব।” কিন্তু কাল যখন তার স্বামী বাড়ি ফিরে আসবে এবং লিপস্টিক না পাবে, তখন তাকে কত কথা বলে লজ্জা দেবে, কত পা ঠুকবে, নাকে কাদবে!
আবার আজ যখন স্ত্রীরই বিলাস-সখের জন্য স্বামী বিদেশে আসে, তখন অনেক স্ত্রী তার খিয়ানত করে, তার প্রেমে অপরকে শরীক করে পরকীইয়া করে। তাহলে “হাসবুনাল্লাহু অনি’মাল অকীল” বলা ছাড়া তার আর কী উপায় আছে?
এদিকে বিদেশে থাকলে, স্বামী স্ত্রীর প্রতি বেশী আশঙ্কা, বেশী সন্দেহ করে, এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং সে যেখানে যেভাবে থাকতে বলে, তার সন্দেহ দূর করার জন্য স্ত্রীর উচিত সেইভাবে থাকা। আর মিথ্যা বলে ধোকা না দেওয়া। কারণ, স্ত্রীর মিথ্যাবাদিতা একবার প্রমাণিত হলে, প্রেমের শিশমহল ভেঙ্গে যেতে পারে।
বিদেশে থাকলে সন্তানদের তরবিয়তের যে কত ক্ষতি হয়, তা বলাই বাহুল্য। বাদশা মনসূর তার জেলে বন্দী বনী উমাইয়্যার কয়দীদের প্রশ্ন করেছিলেন যে, দীর্ঘদিন ধরে জেলে বন্দী থাকার ফলে তোমাদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি কি হয়েছে বলে মনে কর? কয়দীরা জবাবে বলেছিল, “আমাদের ছেলে-মেয়েদের তরবিয়ত।”
একটি হাদীসে মহানবী (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুসলিমদেরকে ‘গুরাবা’ বা বিদেশীদের সাথে তুলনা করেছেন।
((بدأ الإسلام غريباً وسيعود كما بدأ غريباً، فطوبى للغرباء)).
অর্থাৎ, ইসলাম অসহায় বিদেশীর মত মুষ্টিমেয় কতক লোক নিয়ে এ পৃথিবীতে তার যাত্রা শুরু করেছে এবং ঐ বিদেশীর মতই সে এ পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে। অতএব আনন্দ, কল্যাণ ও শুভপরিণাম সেই অচেনা বিদেশীর মত মুষ্টিমেয় মানুষদের জন্য। (মুসলিম ১৪৫নং)
কেন ইসলাম প্রবাসী বা বিদেশীর মতো?
প্রবাসী বা বিদেশী যখন প্রবাসে, বিদেশে বা ভিন দেশে কোন কাজের খাতিরে যায় বা থাকে, তখন সেখানকার জীবন যে কত তিক্তময় তা কেবল আমাদের মত প্রবাসীরাই জানে।
বিদেশী হয় সমাজে অজানা, অচেনা, অপাঙক্তেয়। যেখানেই যায় সেখানেই নিজেকে লাঞ্ছিত, ঘৃণিত, অবহেলিত, পদদলিত, অপমানিত অসহায় ও নিরুপায় মনে হয়। সমাজে কারও সাথে তার পরিচয় নেই। সমাজে কেউ তার সহায় নয়, বন্ধু নয়। যে কাজ সহজে হয়, সে কাজ বেগানার জন্য বড় কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
কোন এক ভিন গাঁয়ে বড় ক্ষুধার্ত ছিলাম। যোহরের নামায হল। আমি মসজিদের বারান্দায় বসে গেলাম। সকলেই এক এক করে মসজিদ থেকে বের হয়ে গেল। কেউ জিজ্ঞাসাও করল না যে, তুমি কোথাকার? কোথায় কি জন্য এসেছ? হয়তোবা এই মনে করে যে, আমি কারো মেহেমান। অবশ্য আমার ক্ষুধার্ত উদাস মুখখানার দিকে কেউ ভালো করে তাকালে অনায়াসে বুঝতে পারত যে, আমি এখানে অপরিচিত ও ভুখাফাকা মুসাফির।
এমনি করে দ্বিতীয় জামাআত হল। তারাও বের হয়ে গেল। তৃতীয় জামাআতের লোক বের হয়ে গেলে আর হয়তো কেউ মসজিদ আসবে না এই আশঙ্কায় আমার ধৈর্য ও লজ্জার বাঁধ ভেঙ্গে গেল। আমি একজনের কাছে ফিসফিসিয়ে আমার খিদের কথা বলতে বাধ্য হলাম। আমার জীবনের সেই প্রথম অভিজ্ঞতায় জানলাম যে, ক্ষুধার কত জ্বালা। অন্ন-ভিক্ষা কত লাঞ্ছনার কাজ। জীবনে স্নেহময়ী মায়ের কাছে, প্রেমময়ী স্ত্রীর কাছে বহুবার ভাত চেয়ে খেয়েছি। কিন্তু ঐ ব্যক্তি ছাড়া আর কারো কাছে আমি চেয়ে খাইনি। জীবনের সেই প্রথম ভিক্ষা বিদেশে। আল্লাহ করুন, যেন সেটাই আমার শেষ।
বিদেশে বহু ঈদ করেছি, বহু বিবাহ-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছি। কিন্তু সেখানে কত যে লাঞ্ছনা, কত যে বেদনা তা আমার মত বিদেশীরাই জানে। সাথে খেতে বসলে লোকেরা তাকাতাকি করে। ইশারায়-ইঙ্গিতে আমার পরিচয় জানতে চায়। কেউ বা নাক সিটকে সশব্দে অপরকে প্রশ্ন করেই ফেলে, ‘এশ শু’ (ওটা আবার কে)? তখন সে মুখ ভেংচিয়ে জবাব দেয়, হিন্দী ।
সহকর্মী সউদী সাথীদের চাওয়া মতে সর্বদা সউদী লেবাসে থাকি। অনেকের এটা সহ্য হয় না। আমি বিদেশী তাদের স্বদেশী পরিচ্ছদ পরব কেন? প্রায় লোকেই কটাক্ষ হানে ব্যঙ্গ করে। শিশুরা ঢিল মারে। এক মহিলা দলের সামনে একা পড়লে একজন বলে উঠল, ‘উহ! লাবেস শিমাগ!’ (সউদী নয় অথচ মাথায় রুমাল নিয়েছে!) অপরজন তার জবাবে বলল, ‘শিমাগ বাসসাম বাদ।’ (অর্থাৎ, বাসসাম কোম্পানীর ভাল রুমাল আবার!)
একজন বলল, সাদীক! তুমি হিন্দী না সউদী। আমি বললাম, হিন্দী। বলল, তাহলে তুমি সউদী লেবাস কেন পরেছ? আমি বললাম, সউদীদেরকে ভালোবাসি তাই।
আর একজন বলল, তুমি হিন্দী না সউদী? আমি উপহাস ছলে বলি, আমি সউদী। বলে, তুমি মিথ্যা কেন বলছ। আমি বলি, মিথ্যা নয়। আল্লাহর রসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
((من تشبه بقوم فهو منهم)).
(অর্থাৎ, যে যে জাতির সাদৃশ্য ধারণ করে, সে তাদেরই একজন।) অতএব আমি সউদীদের সাদৃশ্য ধারণ করেছি। তাই আমি সউদী। তাছাড়া আমি সউদীদেরকে ভালোবাসি। আর মহানবী (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
((المرء مع من أحب)).
(অর্থাৎ, যে যাকে ভালোবাসে সে তারই সঙ্গী হয়।)
অতঃপর
أحب الصالحين ولست منهم … لعل الله يرزقني صلاحا
কবির এই কবিতা ছত্রের অনুকরণে বললাম,
أحب السعوديين ولست منهم … لعل الله يرزقني سعادة
(অর্থাৎ, আমি সউদীদেরকে ভালোবাসি, অথচ আমি সউদী নই। সম্ভবতঃ আল্লাহ আমাকে সাআদত বা সুখ দান করবেন।)
এ কথা শুনে চট করে সে ব্যঙ্গাচ্ছলে বলল, ‘ও-, য়্যাতাকাল্লামু আরাবী বাদ!’ (অর্থাৎ, ও-, আবার আরবী বলতেও পারে!) বিদেশে বহু কথা ও কাজ নিয়ে নাকাল ও নাজেহাল হতে হয়। কথা ভালো হলেও তাতে খামাখা হেসে ওঠে লোকে। তবে সবাই যে সমান তা নয়। বলা বাহুল্য, ঐ একজন বিদেশীর মতই ইসলামের অবস্থা। বিশ্ব সমাজের কাছে ইসলাম ঐরূপ প্রবাসীর মত অবহেলিত ও অসহায়। বিশাল জনসংখ্যার মাঝে খাটি মুসলিম নেহাতই কম। এ জন্যই অনেকে আফসোস করে বলেছেন, ‘ইসলাম দার কিতাব অ মুসলিম দার গোর।‘ (অর্থাৎ, ইসলাম আছে কিতাবের মাঝে মুসলিম আছে গোরে। কবি নজরুলের ভাষায় ও ‘ইসলাম কেতাবে শুধু মুসলিম গোরস্থান।’) আসল ইসলাম কুরআনহাদীসে সীমাবদ্ধ আছে এবং খাটি মুসলিম সাহাবা-তাবেঈনগণ গোরস্থানে সমাধিস্থ আছেন। বর্তমান সমাজে তাদের নজীর মেলা দায়।
ইসলাম সমাজে অচেনা মুসাফিরের মত অসহায়। ইসলাম মানতে গিয়ে মুসলিম নিজের পরিবার-পরিজনের কাছেও যেন অপরিচিত বলে পরিগণিত হয়। মনে হয়, সে আমলে সে একা, অসহায়। কেউ তার সঙ্গী-সহায়ক নেই।
ইসলামকে কেউ চেনা দেয় না, তাকে কেউ চিনতে চেষ্টা করে না। বরং না চিনেই দূর থেকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায়, তাকে দেখে দরজা বন্ধ করে। অচিন দেশের শত্রুর মত ইসলাম মার খায় পথে পথে।
আর এতে কোন সন্দেহ নেই যে, সেই মুষ্টিমেয় কতক খাটি মুসলিম হলেন আহলে সুন্নাহ বা আহলে হাদীস। যারা সকল প্রকার বাতিল ও নকল ফির্কা, মযহাব, দল, মত ইত্যাদি থেকে পবিত্র থেকে গুটি কয়েক লোক নিয়ে পৃথিবীর বুকে কিয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকবেন।


সংগ্রহে : আব্দুল হামীদ আল-ফাইজী আল-মাদানী

এ সম্পর্কিত অন্যান্য পোস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close