বিবিধ বিষয়

পুত না ভূত

বাংলার অনেক প্রবাদে সন্তানকে ভূত বলা হয়েছে। যেমন, “অভাগিনীর দু’টো পুত, একটা দানা (দানব) একটা ভূত। ভাগ্যবানের দু’টি পুত, একটি বানর একটি ভূত। হয়তো পুত, নয়তো ভূত। পুত নয়, ভূত। পুত পুত পুত, শেষে দেখি ভূত।” ইত্যাদি।

কিন্তু কেন পুতকে ভূত বলা হয়?
যেহেতু তার আচরণ হয় ভুতের মতো, শয়তানের মতো। যা করা মানুষের জন্য উচিত নয়, মুসলিমের জন্য বৈধ নয়, তাই সে করে পিতামাতার সাথে, অন্যান্যদের সাথে।

অনেক সময় সন্তান স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যায়। ফলে নিজেকে মায়ের উপরেও প্রাধান্য দেয়! মায়ের চাইতে নিজের সুখ-সুবিধা বেশি বোঝে। যে মা নিজে কষ্ট করে ছেলেকে আরাম দিয়েছিল, নিজে না খেয়ে ছেলেকে খাইয়েছিল, নিজে না ঘুমিয়ে ছেলেকে ঘুম পাড়িয়েছিল, সেই ছেলে নিজে আরাম ভোগ করে ও মাকে কষ্টে রাখে। নিজে ভালো-মন্দ খায়, মাকে ঠিকমতো বা মোটেই খেতে দেয় না। নিজে আরামসে ঘুমায়, আর মাকে দুঃখের পাথারে রেখে দিবারাত্রি জাগিয়ে রাখে!
‘মা পায় না কাথা সিলায়ের সুতো, বেটার পায়ে চৌদ্দ সিকের জুতো।‘
‘মা খায় ধান ভেনে, বেটা খায় এলাচ কিনে।’
‘মা’র পরনে ছেড়া ত্যানা, পুতে করে বাবুয়ানা।‘
বেটা অনেক সময় মায়ের উপর স্ত্রীকে প্রাধান্য দেয়। মায়ের কথা বিশ্বাস করে না, বউয়ের কথা বিশ্বাস করে। মায়ের সুখ কেটে বউকে দান করে।
‘মাকে বানিয়ে নার, বউয়ের গলায় চন্দ্রহার।‘
মা বলে, ‘বাছার কী দেব তুলনা, মায়ের হাতে তুলের দাঁড়ি মাগের কানে সোনা।‘
‘মা’র গলায় দিয়ে দড়ি, বউকে পরায় ঢাকাই শাড়ি!’
সে বেটার কাছে কি ভাতের আশা করা যায়? দু-মুঠো ভাত পেতে বউয়ের সাথে কিচিরমিচির করতে হয়। ‘বাপের ভাতে যাতায়াতি ভাইয়ের ভাতে কাদামাটি, সোয়ামীর ভাতে অগড়-বগড়, পুতের ভাতে বড়ই ঝগড়।‘
বেচারা ছেলে তখন ‘জরু কা গোলাম’ হয়ে যায়। সমাজের লোক তার কাছে বউয়ের অভিযোগ করলে সে বলে, ‘মা নয় যে তাড়িয়ে দেব, বাপ নয় যে ভাত দেব না, পরের মেয়ে রাখি কোথায়?

অনেক ছেলে মা-বাপের সামনে শ্বশুরবাড়ির লোককে নিয়ে বাড়াবাড়ি করে।
মা বলে, ‘বাছার আমার এত বাড় (বাড়াবাড়ি), ছ’আনার কাপড়ে ন’আনার পাড়!’ ‘মায়ে খায় গু-মুত, শাউড়ি খায় ঘি, এমন দুঃখের হাল কইব কারে কী?’
আর শালা-শালী হয় বড় কুটুম! তারাও নিজের ভাই-বোনের উপর প্রাধান্য পায়। তাদেরকে নিয়েও বাড়াবাড়ি করে। ‘বাপের বেটি মুড়কি পায় না মোন্ডা শালীর পাতে, সহোদরের মুখ দেখে না সখ্য শালার সাথে!’
আসলে সে তখন ‘মা’র পুত নয়, শাশুড়ীর জামাই’ হয়ে যায়। সকল বিষয়ে মায়ের নয়, আম্মার পরামর্শ চায়। মা না হয়ে আম্মা হয় তাঁর মাথা!

এমন অনেক কুসন্তান আছে, যারা পিতামাতার উপর অত্যাচার করে। অন্যায় আব্দার করে, না মানলে অত্যাচার শুরু করে। অকথ্য ভাষায় গালাগালি থেকে মারধর পর্যন্ত চলে। অনেক সময় খেতে না দিয়ে কষ্ট দেয়। ঘরে বন্ধ রেখে বউকে নিয়ে বেড়াতে যায়। অনেকে খোঁয়াড়ে (বৃদ্ধাশ্রমে) রেখে আসে। মা তখন আফসোস করে কত শ্লোক বলে, ‘বাছার গুণে ঘুম আসে না, কইব কত লীলা, বাপের গলায় শেকল দিয়ে মায়ের ভাঙে পিলা।’
‘অনেক কালের ছিল পাপ, বড় ছেলে সতীনের বাপ।’
আমার ছেলে ‘বুকে খেয়ে মুখে মারে।‘ এখন আমি ‘পুতের মুতে আছাড় খাই।‘
বিশেষ করে পুত্র যদি সবে ধন নীলমণি হয়, তাহলে তো সে মাথায় ওঠে। সে তখন ‘এক মায়ের এক পুত, খায়-দায় যমের দূত’ হয়ে ঘুরে বেড়ায়।

যে ছেলে পাওয়ার জন্য মা কত কেঁদেছিল, সেই ছেলে আজ মাকে কত কাদায়!
‘চাহি চাহি প্রাণ গেল করি বেটা বেটা, সে বেটা মায়ের বুকে মেরে যায় ঝাটা।‘ এই জন্য অনেককে ছেলের আশা করতে শুনলে অনেকে তাদেরকে বলে, ‘ছেলে ছেলে করবে, এমন ছেলে হবে আবার গলায় গেঁথে মরবে।’ তাই তো চাওয়ার সময় চাইতে হয়, নেক সন্তান, শুধু বেটা নয়, নেক বেটা।

আর সংসারে সার্বিক সুখ চাইতে আরো দুআ করতে হয় এই বলে,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ جَارِ السُّوءِ، وَمِنْ زَوجٍ تُشَيِّبُني قَبلَ الْمَشِيبِ، وَمِنْ وَلَدٍ يَكُونُ عَليَّ رَبّاً، وَمِنْ مَالٍ يَكُونُ عَليَّ عَذَاباً، وَمِنْ خَلِيلٍ مَاكِرٍ عَينُهُ تَرَانِي، وَقَلبُهُ يَرْعَانِيْ؛ إِنْ رَأَى حَسَنَةً دَفنَهَا، وَإِنْ رَأَى سَيِّئَةً أَذَاعَهَا.
অর্থাৎ, হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি মন্দ প্রতিবেশী থেকে, এমন স্ত্রী থেকে, যে বৃদ্ধ হওয়ার আগেই আমাকে বৃদ্ধ বানাবে, এমন সন্তান থেকে, যে আমার প্রভু হতে চাইবে, এমন মাল থেকে, যা আমার জন্য আযাব হবে, এবং এমন ধূর্ত বন্ধু থেকে, যার চোখ আমাকে দেখে এবং তার হৃদয় আমার প্রতি লক্ষ্য রাখে, অতঃপর ভাল কিছু দেখলে তা পুতে ফেলে এবং খারাপ কিছু দেখলে তা প্রচার করে। (ত্বাবারানী, সিঃ সহীহাহ ৩১৩৭নং)
এ দুআ কবুল না হলে সন্তান আপনার মাথায় উঠতে পারে। বাঁশ চাইতে কঞ্চি দড় হতে পারে। বাপের তুলনায় নিজেকে বেশি ভালো, জ্ঞানী, ভদ্র ও সমঝদার ধারণা করতে পারে। বাবার উপর দাদাগিরি করতে পারে।
‘বাঁঝা বাঁঝা ক’রে কত বাঁঝীর হলো ছেলে, বাবা না বলে এখন ছেলে দাদা বলে।‘
‘পোদ্দারের পো পন্ডিত হলে, বাপকে বাড়ির কিষাণ বলে।‘
চাষীর ছেলে পন্ডিত হলে, বাড়ি ফিরে বলে ‘চাষ কিয়া চীজ হ্যায়।’ বাবাকে তখন ‘ডোন্ট কেয়ার!’
‘নিত্য চাষার ঝি, বেগুন ক্ষেত দেখে বলে ইয়া আবার কী?’
ঘৃণা করতে শুরু করে চাষ ও চাষী বাবাকে! কথায় কথায় ছোট করে চাষীকে। কোন ত্রুটি হলে ‘চাষী’ বলে খোটা দেয়। নিজের অফিসার বন্ধুদের কাছে তার পরিচয় গোপন করে!

অনেক ছেলে অকৃতজ্ঞ নেমকহারাম হয়। তার মনে বিশাল ঔদ্ধত্য কাজ করে। কোন হিতোপদেশ কানে ভরতে চায় না। শাসন করলে আরো টেরামি দেখায়। হুমকি দিলে চ্যালেঞ্জ নেয়। তখন তার হাল হয়, ‘ভাঙ্গব তবু মচকাব না।‘
ঘর থেকে বের করে দেব বললে বলে, ‘ঘর-ভাড়া দিয়ে দেব।’
মা যখন বলে, ‘আমার ১০ মাসের পেটের ঘর-ভাড়াটা মিটিয়ে দে’, তখন সে বলে, ‘কে বলেছিল পেটে ধরতে?!
কোন কোন ছেলে আবার ঘর ছেড়ে পালিয়েও যায়। যেমন কোন কোন কুকন্যা পছন্দের নাগর নিয়ে মা-বাপের কোল ছেড়ে বাড়ি ত্যাগ করে!

নেমকহারাম ছেলে-মেয়েরা মা-বাপের অকৃতজ্ঞতা করে, অবাধ্যাচরণ ও বিরুদ্ধাচরণ করে! অজ্ঞান ও অমানুষের মতো শিক্ষিতরাও তাই করে। ‘অজ্ঞানের কালে জানে না, আর অমানুষের কালে মানে না।‘ কিন্তু শিক্ষিত হওয়া আর জ্ঞানী মানুষ হওয়া দুটি আলাদা জিনিস।

অবশ্য সন্তান অবাধ্য হওয়ার পিছনে অনেক সময় তরবিয়তের ক্রটি থাকে।
অনেক সময় মুরুব্বীর অনুপস্থিতি এর জন্য দায়ী।
অনেক সময় অবাধ্য স্ত্রী দায়ী। যেহেতু সে পিছনে ছেলেমেয়ের কাছে বাপের গীবত করে তাদেরকে বিদ্রোহী করে তোলে। আর একটা কারণ পিতামাতার অভাব হতে পারে। কারণ ‘এ সংসারে দিতে পারলে শালার বেটাও বাপ কয়, আর দিতে না পারলে নিজের বেটাও শালা কয়!’
অন্য একটা কারণ মূর্খতা হতে পারে। আর ভূক্তভোগীরা জানে, ‘ছ্যাঁদা ঘটি চোরা গাই, চোর পড়শী ধূর্ত ভাই। মূর্খ ছেলে স্ত্রী নষ্ট, এ কয়টি বড় কষ্ট।’ ‘মূর্খ পুত্র আর বিধবা কন্যা, সংসারে বয়ে আনে দুঃখের বন্যা।‘
বলা বাহুল্য, প্রত্যেকেই পুত নামক ভূত থেকে পানাহ চান। আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম।


—আব্দুল হামীদ আল-ফাইযী আল-মাদানী

#SotterDikeAhobban

Tags

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close