preloder
ঈমান ও আক্বীদা

শয়তানের চক্রান্ত থেকে আত্মরক্ষার উপায় (২য় কিস্তি)

 ১ম কিস্তি  পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন

৫. শত্রুতা ও বিদ্বেষ  (العداوة والبغضاء) : শয়তান মানুষের মাঝে শত্রুতা ও ঘৃণা সৃষ্টি করে। মহান আল্লাহ বলেন,إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنْتُمْ مُنْتَهُونَ– ‘শয়তান তো কেবল চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও ছালাত হ’তে তোমাদেরকে বিরত রাখতে। অতএব তোমরা নিবৃত্ত হবে কি?’ (মায়েদাহ ৫/৯১)

পরস্পরে ভাল আচরণ করতে হবে। অন্যথা এই দুর্বলতার সুযোগে শয়তান মানুষের মাঝে সংঘর্ষ বাধিয়ে চরম শত্রুতা সৃষ্টি করবে। মহান আল্লাহ বলেন,وَقُلْ لِعِبَادِي يَقُولُوا الَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْزَغُ بَيْنَهُمْ إِنَّ الشَّيْطَانَ كَانَ لِلْإِنْسَانِ عَدُوًّا مُبِينًا– ‘(হে নবী!) তুমি আমার বান্দাদের বল, তারা যেন (পরস্পরে) উত্তম কথা বলে। (কেননা) শয়তান সর্বদা তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উস্কানি দেয়। নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু’ (বনী ইসরাঈল ১৭/৫৩)

এজন্যই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَاليَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ ‘যে আল্লাহ তা‘আলা ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে সে যেন উত্তম কথা বলে অথবা চুপ থাকে’।[1]

৬. সুসজ্জিত করা  (التزيين) : শয়তান মানুষের সামনে পাপ, অশালীন ও অশ্লীল কাজকর্মকে সুন্দর ও সুসজ্জিত করে উপস্থাপন করে। ফলে তাকে ভালকাজ মনে করে মানুষ আমল করে জাহান্নামী হয়ে যায়। শয়তানের এই ভাষাকে মহান আল্লাহ উল্লেখ করে বলেন,قَالَ رَبِّ بِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأُزَيِّنَنَّ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَلَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِيْنَ، إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِيْنَ– ‘সে বলল, হে আমার পালনকর্তা। যেহেতু তুমি আমাকে বিপথগামী করলে, সেহেতু আমিও পৃথিবীতে তাদের নিকট পাপকর্মকে শোভনীয় করব এবং তাদের সবাইকে পথভ্রষ্ট করব। তবে তাদের মধ্য থেকে তোমার নির্বাচিত বান্দারা ব্যতীত’ (হিজর ১৫/৩৯-৪০)। অন্যত্র এসেছে,

وَإِذْ زَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ وَقَالَ لَا غَالِبَ لَكُمُ الْيَوْمَ مِنَ النَّاسِ وَإِنِّي جَارٌ لَكُمْ فَلَمَّا تَرَاءَتِ الْفِئَتَانِ نَكَصَ عَلَى عَقِبَيْهِ وَقَالَ إِنِّي بَرِيءٌ مِنْكُمْ إِنِّي أَرَى مَا لَا تَرَوْنَ إِنِّي أَخَافُ اللهَ وَاللهُ شَدِيدُ الْعِقَابِ-

‘যখন শয়তান (বদরের দিন) কাফেরদের নিকট তাদের কাজগুলিকে শোভনীয় করে দেখিয়েছিল এবং বলেছিল, আজ তোমাদের উপর বিজয়ী হবার মত কোন লোক নেই। আর আমি তোমাদের সাথী আছি। কিন্তু যখন দু’দল মুখোমুখী হ’ল, তখন সে পিঠ ফিরে পালালো এবং বলল, আমি তোমাদের থেকে মুক্ত। আমি যা দেখেছি তোমরা তা দেখনি। আমি আল্লাহকে ভয় করি। আর আল্লাহ কঠিন শাস্তিদাতা’ (আনফাল ৮/৪৮)

আয়াতের প্রেক্ষাপট হ’ল, বদর যুদ্ধের সময় শয়তান মুশরিকদেরকে বিজয়ের আশ্বাস দিয়ে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং তাদের কার্যাবলীকে শোভনীয় করে দেখায়। কিন্তু যখন শয়তান ফেরেশতাদের দল তাদের বিপক্ষে দেখতে পায় তখন পলায়ন করে পিছু হটে যায়। অন্যত্র আল্লাহ বলেন,

تَاللهِ لَقَدْ أَرْسَلْنَا إِلَى أُمَمٍ مِنْ قَبْلِكَ فَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ فَهُوَ وَلِيُّهُمُ الْيَوْمَ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيْمٌ-

‘আল্লাহর কসম! আমরা তোমার পূর্বে বহু জাতির নিকটে রাসূল প্রেরণ করেছি। অতঃপর শয়তান তাদের মন্দ কর্মসমূহকে শোভনীয় করে দেখিয়েছিল। সে আজ তাদের অভিভাবক। আর তাদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি’ (নাহল ১৬/৬৩)। এছাড়াও এব্যাপারে সূরা আন‘আমের ৪৩, নামলের ২৪ এবং আনকাবুতের ৩৮নং আয়াতেও অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে।

৭. কুমন্ত্রণা  (الوسواس): শয়তান মানুষের মনের মাঝে কুমন্ত্রণা, প্ররোচনা, সংশয়-সংন্দেহ, অবিশ্বাস প্রবেশ করিয়ে পথভ্রষ্ট করার প্রচেষ্টা চালায়। মিথ্যা প্ররোচনার মাধ্যমে আদম ও হাওয়া (আঃ)-কে জান্নাত থেকে বের করে দেয়। এ ঘটনা পবিত্র কুরআনে সবিস্তার বর্ণিত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, فَوَسْوَسَ لَهُمَا الشَّيْطَانُ لِيُبْدِيَ لَهُمَا مَا وُورِيَ عَنْهُمَا مِنْ سَوْآتِهِمَا وَقَالَ مَا نَهَاكُمَا رَبُّكُمَا عَنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ إِلَّا أَنْ تَكُونَا مَلَكَيْنِ أَوْ تَكُونَا مِنَ الْخَالِدِيْنَ- ‘অতঃপর তাদের লজ্জাস্থান যা পরস্পর থেকে গোপন ছিল তা প্রকাশ করে দেবার জন্য শয়তান তাদের কুমন্ত্রণা দিল এবং বলল, তোমাদের প্রতিপালক এই বৃক্ষ থেকে তোমাদের নিষেধ করেছেন কেবল এজন্যে যে, তাহ’লে তোমরা দু’জন ফেরেশতা হয়ে যাবে অথবা এখানে চিরস্থায়ী বসবাসকারী হয়ে যাবে’ (আ‘রাফ ৭/২০)। অন্যত্র এসেছে,

فَوَسْوَسَ إِلَيْهِ الشَّيْطَانُ قَالَ يَا آدَمُ هَلْ أَدُلُّكَ عَلَى شَجَرَةِ الْخُلْدِ وَمُلْكٍ لَا يَبْلَى، فَأَكَلَا مِنْهَا فَبَدَتْ لَهُمَا سَوْآتُهُمَا وَطَفِقَا يَخْصِفَانِ عَلَيْهِمَا مِنْ وَرَقِ الْجَنَّةِ وَعَصَى آدَمُ رَبَّهُ فَغَوَى-

‘অতঃপর শয়তান তাকে কুমন্ত্রণা দিল। সে বলল, হে আদম! আমি কি তোমাকে বলে দেব অনন্ত জীবনদায়িনী বৃক্ষের কথা এবং এমন রাজত্বের কথা যা ক্ষয় হয় না? অতঃপর তারা উভয়ে উক্ত (নিষিদ্ধ) বৃক্ষ হ’তে (ফল) ভক্ষণ করল। ফলে তাদের সামনে তাদের গুপ্তাঙ্গ প্রকাশিত হয়ে পড়ল এবং তারা জান্নাতের বৃক্ষপত্র দ্বারা নিজেদেরকে আবৃত করতে শুরু করল। এভাবে আদম তার প্রতিপালকের অবাধ্যতা করল এবং পথ হারাল’ (ত্ব-হা ২০/১২০-১২১)

আবূ হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, يَأْتِي الشَّيْطَانُ أَحَدَكُمْ فَيَقُوْلُ: مَنْ خَلَقَ كَذَا، مَنْ خَلَقَ كَذَا، حَتَّى يَقُولَ: مَنْ خَلَقَ رَبَّكَ؟ فَإِذَا بَلَغَهُ فَلْيَسْتَعِذْ بِاللهِ وَلْيَنْتَهِ– ‘তোমাদের কারো নিকট শয়তান আসতে পারে এবং বলতে পারে, এ বস্ত্ত কে সৃষ্টি করেছে? ঐ বস্ত্ত কে সৃষ্ট করেছে? এমনকি শেষ পর্যন্ত বলে বসবে, তোমার রবকে কে সৃষ্টি করেছে? যখন ব্যাপারটি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যাবে তখন সে যেন অবশ্যই আল্লাহর নিকট আশ্রয় চায় এবং সে যেন এমন চিন্তা থেকে বিরত হয়ে যায়’।[2]

ছালাতে ওয়াসওয়াসা : আবূ হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, إِنَّ الشَّيْطَانَ يَأْتِي أَحَدَكُمْ فِي صَلَاتِهِ فَيَلْبِسُ عَلَيْهِ، حَتَّى لَا يَدْرِيَ كَمْ صَلَّى، فَإِذَا وَجَدَ ذَلِكَ أَحَدُكُمْ فَلْيَسْجُدْ سَجْدَتَيْنِ وَهُوَ جَالِسٌ– ‘তোমাদের কারো কারো ছালাত আদায়কালে শয়তান আসে এবং ছালাতের বিষয়ে সন্দেহে ফেলে দেয়। ফলে সে বুঝতে পারে না কত রাক‘আত আদায় করল। তোমাদের কারো যদি এই রকম কিছু হয় তবে (শেষ বৈঠকে) বসা অবস্থায় সে যেন দু’টি সিজদাহ করে দেয়’।[3]

৮. আল্লাহর যিকির ভুলে যাওয়া  (النسيان لذكر الله):

শয়তানের কাজ হ’ল আল্লাহর স্মরণ বা যিকির ভুলিয়ে দিয়ে বিপথগামী করা। যেমন- মহান আল্লাহ বলেন,وَقَالَ لِلَّذِيْ ظَنَّ أَنَّهُ نَاجٍ مِنْهُمَا اذْكُرْنِي عِنْدَ رَبِّكَ فَأَنْسَاهُ الشَّيْطَانُ ذِكْرَ رَبِّهِ فَلَبِثَ فِي السِّجْنِ بِضْعَ سِنِيْنَ- ‘অতঃপর যে ব্যক্তি সম্পর্কে (স্বপ্নের ব্যাখ্যা অনুযায়ী) ধারণা ছিল যে, সে মুক্তি পাবে, তাকে ইউসুফ বলে দিল যে, তুমি তোমার মনিবের কাছে (অর্থাৎ বাদশাহর কাছে) আমার বিষয়ে আলোচনা করবে (যাতে তিনি আমাকে মুক্তি দেন)। কিন্তু শয়তান তাকে তার মনিবের কাছে বলার বিষয়টি ভুলিয়ে দেয়। ফলে তাকে কয়েক বছর কারাগারে থাকতে হয়’ (ইউসুফ ১২/৪২)

মূসা (আঃ) এক যুবককে নিয়ে খিজির (আঃ)-এর সাক্ষাতে বের হ’লেন। একটি মাছ ছিল তাদের গন্তব্যের চিহ্ন। মাছটি যেখানে জীবিত হয়ে সমুদ্রে চলে যাবে সেখানে সে সাক্ষাৎ পাবে বলে নির্দেশনা দেয়া ছিল। কিন্তু যুবক তা বলতে ভুলে যায়। মাছের বিষয়ে মূসা (আঃ) যুবককে জিজ্ঞেস করলে সে উত্তর দিলقَالَ أَرَأَيْتَ إِذْ أَوَيْنَا إِلَى الصَّخْرَةِ فَإِنِّيْ نَسِيْتُ الْحُوْتَ وَمَا أَنْسَانِيْهُ إِلَّا الشَّيْطَانُ أَنْ أَذْكُرَهُ وَاتَّخَذَ سَبِيْلَهُ فِي الْبَحْرِ عَجَبًا- ‘যুবক বলল, আপনি কি খেয়াল করে দেখেছেন যখন আমরা একটি প্রস্তর খন্ডে বিশ্রাম নিয়েছিলাম, সেখানে আমি মাছের কথা ভুলে গিয়েছিলাম। শয়তানই আমাকে ওর কথা স্মরণ রাখতে ভুলিয়ে দিয়েছিল। সে বিস্ময়করভাবে নিজের পথ করে সমুদ্রে নেমে গেল (কাহাফ ১৮/৬৩; বুখারী হা/৭৪)

আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, হে লোক সকল! আমাকে কদরের রাত সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছিল এবং আমি তোমাদের তা জানানোর জন্য বের হয়ে আসলাম। কিন্তু দুই ব্যক্তি ঝগড়া করতে করতে আমার নিকটে উপস্থিত হ’ল এবং তাদের সাথে ছিল শয়তান। তাই আমি তা ভুলে গেছি’।[4]

৯. প্ররোচনা দেওয়া  (النزع): শয়তান মানুষের মাঝে বিভিন্ন কৌশলে প্ররোচনা দেয়। মহান আল্লাহ বলেন,وَقُلْ لِعِبَادِيْ يَقُولُوا الَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْزَغُ بَيْنَهُمْ إِنَّ الشَّيْطَانَ كَانَ لِلْإِنْسَانِ عَدُوًّا مُبِيْنًا- ‘(হে নবী!) তুমি আমার বান্দাদের বল, তারা যেন (পরস্পরে) উত্তম কথা বলে। (কেননা) শয়তান সর্বদা তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উস্কানি দেয়। নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু’ (বনী ইসরাঈল ১৭/৫৩)

শয়তান ইউসুফ (আঃ)-এর ভাইদের মধ্যে যে বিভেদ সৃষ্টি করেছিল তা সকলেরই জানা। মহান আল্লাহ সূরা ইউসুফের ১০০নং আয়াতে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। আর এমন পরিস্থিতির মোকাবেলায় মহান আল্লাহ বলেন,وَإِمَّا يَنْزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللهِ إِنَّهُ سَمِيْعٌ عَلِيْمٌ- ‘শয়তানের কুমন্ত্রণা যদি তোমাকে প্ররোচিত করে, তাহ’লে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ কর। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ’ (আ‘রাফ ৭/২০০; ফুছছিলাত বা হা-মীম-সাজদাহ ৪১/৩৬)

১০. ধোঁকা দেওয়া  (الغرور): শয়তান মানুষকে নানাভাবে ধোঁকা দেয়। সে মানুষকে ছলনা ও ধোঁকাপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দেয়। মহান আল্লাহ বলেন, وَمَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطَانُ إِلَّا غُرُوْرًا- ‘শয়তান তাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেয়, তা ছলনা মাত্র’ (বাণী ইসরাঈল ১৭/৬৪)

আদম ও হাওয়া (আঃ) স্বয়ং এমন ধোঁকা ও প্রতারণার শিকার হন। মহান আল্লাহ বলেন,فَدَلَّاهُمَا بِغُرُورٍ فَلَمَّا ذَاقَا الشَّجَرَةَ بَدَتْ لَهُمَا سَوْآتُهُمَا وَطَفِقَا يَخْصِفَانِ عَلَيْهِمَا مِنْ وَرَقِ الْجَنَّةِ ‘এভাবে তাদের দু’জনকে ধোঁকার মাধ্যমে সে ধীরে ধীরে ধ্বংসে নামিয়ে দিল। অতঃপর যখন তারা উক্ত বৃক্ষের স্বাদ আস্বাদন করল, তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের সামনে প্রকাশ হয়ে পড়ল। ফলে তারা জান্নাতের পাতাসমূহ দিয়ে তা ঢাকতে লাগল’ (আ‘রাফ ৭/২২)। অন্যত্র তিনি বলেন,

يَعِدُهُمْ وَيُمَنِّيهِمْ وَمَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطَانُ إِلَّا غُرُوْرًا– ‘সে তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেয় ও মিথ্যা আশ্বাস দেয়। আর শয়তান তাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেয়, তা প্রতারণা বৈ কিছু নয়’ (নিসা ৪/১২০)

ধোঁকা দিয়ে শয়তান মানুষের মাঝে ফিতনা সৃষ্টি করে। এমনকি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে দেয়। জাবির (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

إِنَّ إِبْلِيْسَ يَضَعُ عَرْشَهُ عَلَى الْمَاءِ، ثُمَّ يَبْعَثُ سَرَايَاهُ، فَأَدْنَاهُمْ مِنْهُ مَنْزِلَةً أَعْظَمُهُمْ فِتْنَةً، يَجِيْءُ أَحَدُهُمْ فَيَقُوْلُ: فَعَلْتُ كَذَا وَكَذَا، فَيَقُوْلُ: مَا صَنَعْتَ شَيْئًا، قَالَ ثُمَّ يَجِيْءُ أَحَدُهُمْ فَيَقُوْلُ: مَا تَرَكْتُهُ حَتَّى فَرَّقْتُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ امْرَأَتِهِ، قَالَ: فَيُدْنِيْهِ مِنْهُ وَيَقُوْلُ: نِعْمَ أَنْتَ قَالَ الْأَعْمَشُ: أُرَاهُ قَالَ: فَيَلْتَزِمُهُ-

‘ইবলীস পানির উপর তার সিংহাসন স্থাপন করতঃ তার বাহিনী প্রেরণ করে। তাদের মধ্যে তার সর্বাধিক নৈকট্য প্রাপ্ত সেই, যে সর্বাধিক ফেতনা সৃষ্টিকারী। তাদের একজন এসে বলে, আমি অমুক অমুক কাজ করেছি। সে বলে তুমি কিছুই করনি। অতঃপর অন্যজন এসে বলে, অমুকের সাথে আমি সকল প্রকার ধোঁকার আচরণই করেছি। অবশেষে তার ও তার স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছি। অতঃপর শয়তান তাকে তার নিকটবর্তী করে নেয় এবং বলে হ্যাঁ, তুমি একটি বড় কাজ করেছ। বর্ণনাকারী আ‘মাশ (রাঃ) বলেন, আমার মনে হয়, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, অতঃপর শয়তান তাকে তার বুকের সাথে জড়িয়ে নেয়’।[5]

কবরবাসীরা কারো কল্যাণ বা অকল্যাণ করতে পারে না। তাই কবরবাসীদের নিকট কোন কিছু কামনা করা জায়েয নয় বরং শিরক। যদিও কোন কোন কবর থেকে অলৌকিক কিছু প্রকাশ পেয়ে থাকে। যেমন- কবর থেকে আলো বের হওয়া, সুঘ্রান বের হওয়া ইত্যাদি।[6]

আমরা অনেক সময় শুনে থাকি কারো কবরের উপর ঐ মৃত ব্যক্তিকেই দাঁড়ানো অবস্থায় বা বসা অবস্থায় অথবা অন্য কোন অচেনা মৃত ব্যক্তিকে দেখেছে। আবার ভাঙ্গা কবরে সাপ পেঁচানো লাশ দেখেছে। এগুলো সবই শয়তানের ধোঁকা মাত্র। মনে রাখতে হবে কবরের কোন শাস্তি নবী ব্যতীত দুনিয়ার মানুষ ও জিনকে দেখানো হবে না।[7] অতএব কেউ যদি অনুরূপ দেখে তবে বুঝতে হবে এটা শয়তানের কাজ ছাড়া কিছুই নয়।

১১. পরীক্ষা করা, বিপদে ফেলা, গোলযোগ সৃষ্টি করা (الفةنة): যুগে যুগে শয়তান মানুষের মাঝে গোলযোগ সৃষ্টি করে পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা করেছে। মহান আল্লাহ বলেন,

وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُوْلٍ وَلَا نَبِيٍّ إِلَّا إِذَا تَمَنَّى أَلْقَى الشَّيْطَانُ فِي أُمْنِيَّتِهِ فَيَنْسَخُ اللهُ مَا يُلْقِي الشَّيْطَانُ ثُمَّ يُحْكِمُ اللهُ آيَاتِهِ وَاللهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ، لِيَجْعَلَ مَا يُلْقِي الشَّيْطَانُ فِتْنَةً لِلَّذِيْنَ فِيْ قُلُوْبِهِمْ مَرَضٌ وَالْقَاسِيَةِ قُلُوْبُهُمْ وَإِنَّ الظَّالِمِيْنَ لَفِي شِقَاقٍ بَعِيدٍ-

‘আমরা তোমার পূর্বে এমন কোন রাসূল প্রেরণ করিনি যে, তারা যখনই কিছু পাঠ করেছে, তখনই শয়তান উক্ত পাঠে কিছু মিশিয়ে দিয়েছে। তখন আল্লাহ দূর করে দেন শয়তান যা মিশিয়ে দেয়। অতঃপর আল্লাহ স্বীয় আয়াত সমূহকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়। এটা এ কারণে যে, শয়তান যা মিশ্রণ করে, তিনি তা পরীক্ষা স্বরূপ করে দেন তাদের জন্য, যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে এবং যারা পাষাণ হৃদয়। বস্ত্ততঃ অত্যাচারীরা দূরতম যিদের মধ্যে রয়েছে’ (হজ্জ ২২/৫২-৫৩)

হুযায়ফা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, চাটাই বুননের মত এক এক করে ফিৎনা মানুষের অন্তরে আসতে থাকে। যে অন্তরে তা গেঁথে যায়, তাতে একটি করে কালো দাগ পড়ে। আর যে অন্তর তা প্রত্যাখ্যান করে, তাতে একটি করে শুভ্রোজ্জ্বল চিহ্ন পড়বে। এমনি করে দু’টি অন্তর দু’ধরনের হয়ে যায়। একটি শ্বেত পাথরের মত; আসমান ও যমীন যতদিন থাকবে ততদিন কোন ফিৎনা তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আর অপরটি হয়ে যায় উল্টানো কালো কলসির মত। প্রবৃত্তি তার মধ্যে যা উপস্থাপন করেছে তাছাড়া ভালমন্দ বলতে সে কিছুই চিনে না।[8]

উপরোক্ত ফিৎনা মূলতঃ শয়তান দ্বারা প্রসার লাভ করে। যারা বুঝতে পারে তারা ফিৎনা থেকে বাঁচতে পারে। অন্যথায় এমন ফিৎনায় পতিত হ’তে হবে। এমন সকল ফিৎনা থেকে বাঁচার জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ ‘কোন পুরুষ যখন কোন স্ত্রী লোকের সঙ্গে নির্জনে সাক্ষাৎ করে তখন এদের সঙ্গে অবশ্যই তৃতীয়জন থাকে শয়তান’।[9]

একজন মানুষ শয়তানের কুমন্ত্রণায় পড়ে এমন ফিৎনা ফাসাদে জড়িয়ে পড়ে। এর ভয়াবহতা সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, وَالْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ ‘বস্ত্ততঃ ফিৎনা সৃষ্টি করা হত্যার চেয়েও বড় পাপ’ (বাক্বারাহ ২/১৯১)। একশ্রেণীর লোক কুরআন দ্বারা ফিৎনা সৃষ্টির লক্ষ্যে আয়াতের অপব্যাখ্যায় লিপ্ত হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,فَأَمَّا الَّذِيْنَ فِي قُلُوْبِهِمْ زَيْغٌ فَيَتَّبِعُوْنَ مَا تَشَابَهَ مِنْهُ ابْتِغَاءَ الْفِتْنَةِ- ‘অতঃপর যাদের অন্তরে বক্রতা রয়েছে, তারা অস্পষ্ট আয়াতগুলির পিছে পড়ে ফিৎনা সৃষ্টির জন্য এবং তাদের মনমত ব্যাখ্যা দেবার জন্য’ (আলে ইমরান ৩/৭)

১২. কু-কর্ম, অশ্লীলতা ও নিন্দনীয় কর্মের আদেশ দেয় (الفحشاء والمنكر) : মহান আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا لَا تَتَّبِعُوْا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ وَمَنْ يَتَّبِعْ خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ فَإِنَّهُ يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَلَوْلَا فَضْلُ اللهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ مَا زَكَى مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ أَبَدًا وَلَكِنَّ اللهَ يُزَكِّي مَنْ يَشَاءُ وَاللهُ سَمِيْعٌ عَلِيْمٌ-

‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না। যে ব্যক্তি শয়তানের অনুসরণ করে, সে তো তাকে নির্লজ্জতা ও মন্দ কাজের নির্দেশ দেয়। যদি তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকত তাহ’লে তোমাদের কেউ কখনো পবিত্র হ’তে পারতে না। তবে আল্লাহ যাকে চান তাকে পবিত্র করেন এবং আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও জানেন’ (নূর ২৪/২১)। তিনি আরো বলেন,إِنَّمَا يَأْمُرُكُمْ بِالسُّوْءِ وَالْفَحْشَاءِ وَأَنْ تَقُوْلُوْا عَلَى اللهِ مَا لَا تَعْلَمُوْنَ- ‘সে তো তোমাদের কেবল মন্দ ও অশ্লীল কাজের এবং আল্লাহ সম্বন্ধে তোমরা যা জানো না এমনসব বিষয় তোমাদের বলার নির্দেশ দেয়’ (বাক্বারাহ ২/১৬৯)

শয়তানের নির্দেশে কখনো অশ্লীল কাজে জড়িত হওয়া যাবে না। মহান আল্লাহ বলেন,قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوْا بِاللهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللهِ مَا لَا تَعْلَمُوْنَ– ‘তুমি বল, নিশ্চয়ই আমার প্রভু প্রকাশ্য ও গোপন সকল প্রকার অশ্লীলতা হারাম করেছেন এবং হারাম করেছেন সকল প্রকার পাপ ও অন্যায় বাড়াবাড়ি। আর তোমরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করো না যে বিষয়ে তিনি কোন প্রমাণ নাযিল করেননি এবং আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কথা বল না যে বিষয়ে তোমরা কিছু জান না’ (আ‘রাফ ৭/৩৩)

একবার হজ্জের সময় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর পিছনে ফযল ইবনে আববাস (রাসূলের চাচাত ভাই) উটে আরোহী অবস্থায় ছিলেন। এক যুবতী মহিলা বৃদ্ধ পিতার বদলী হজ্জের ফৎওয়া তলব করতে আসলে তিনি ফযলের ঘাড় ঘুরিয়ে অন্য দিকে করে দিলেন। আববাস (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আপনার চাচাত ভাইয়ের ঘাড় ঘুরিয়ে দিলেন কেন? তিনি বললেন, আমি দেখলাম, এরা দু’জন হ’ল যুবক-যুবতী। আমি তাদেরকে শয়তান থেকে নিরাপদ মনে করিনি।[10] এতে বুঝা যায় অশ্লীল ও অপসন্দনীয় কিছু ঘটার সন্দেহপূর্ণ অবস্থাতেই শতর্ক হ’তে হবে।

১৩. বিপদগ্রস্তকে একা ফেলে চলে যাওয়া, বিপদ কালে ধোঁকা দেয়া, পথভ্রষ্ট করা, নিরাশ করা (الخذلان) :

যারা শয়তানের ধোঁকায় পড়ে রাসূল (ছাঃ)-এর পথের সাথে অন্য পথ অবলম্বন করে চলে, তারা হাশরের মাঠে নিজেদের হাত কামড়িয়ে আফসোস করবে এবং বলবে,لَقَدْ أَضَلَّنِيْ عَنِ الذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جَاءَنِيْ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِلْإِنْسَانِ خَذُولًا، ‘আমার কাছে উপদেশ (কুরআন) আসার পর সে  আমাকে পথভ্রষ্ট করেছিল। বস্ত্ততঃ শয়তান মানুষের জন্য পথভ্রষ্টকারী’ (ফুরক্বান ২৫/২৯)

বদরের যুদ্ধের পূর্বে কাফেরদেরকে শয়তান খুব সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল কিন্তু যখন বিপদ ঘনীভূত হয়ে আসল তখন সে তার দলবল নিয়ে কাফের কুরাইশদেরকে মাঠে ফেলে পলায়ন করল।

কখনো কখনো শয়তান অনেককে কুফুরী করতে আদেশ দিয়ে তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। মহান আল্লাহ বলেন,كَمَثَلِ الشَّيْطَانِ إِذْ قَالَ لِلْإِنْسَانِ اكْفُرْ فَلَمَّا كَفَرَ قَالَ إِنِّيْ بَرِيْءٌ مِنْكَ إِنِّي أَخَافُ اللهَ رَبَّ الْعَالَمِيْنَ– ‘তাদের দৃষ্টান্ত শয়তানের মত, যে মানুষকে বলে কুফরী কর। অতঃপর যখন সে কুফরী করে, তখন বলে আমি তোমার থেকে মুক্ত। আমি বিশ্ব চরাচরের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি’ (হাশর ৫৯/১৬)

১৪. ভাল ও কল্যাণমূলক কাজে বাধা প্রদান করা الصد عن) (الخير : মহান আল্লাহ বলেন,إِنَّمَا يُرِيْدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنْتُمْ مُنْتَهُوْنَ- ‘শয়তান তো কেবল চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও ছালাত হ’তে তোমাদেরকে বিরত রাখতে। অতএব এক্ষণে তোমরা নিবৃত্ত হবে কি?’ (মায়েদাহ ৫/৯১)

এমনিভাবে শয়তান সাবা বাসীদেরকে আল্লাহর ইবাদত থেকে সূর্যের ইবাদতে মত্ত রাখে। মহান আল্লাহ বলেন, (হুদহুদ পাখির ভাষায়)وَجَدْتُهَا وَقَوْمَهَا يَسْجُدُوْنَ لِلشَّمْسِ مِنْ دُوْنِ اللهِ وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ فَصَدَّهُمْ عَنِ السَّبِيْلِ فَهُمْ لَا يَهْتَدُوْنَ- ‘আমি তাকে ও তার সম্প্রদায়কে দেখলাম তারা আল্লাহকে ছেড়ে সূর্যের পূজা করছে। শয়তান তাদের কর্মসমূহকে তাদের নিকট শোভনীয় করে দিয়েছে এবং তাদেরকে (আল্লাহর) পথ থেকে বিরত রেখেছে। ফলে তারা সুপথপ্রাপ্ত হয় না’ (নমল ২৭/২৪)

আল্লাহ তা‘আলা সতর্ক করে দিয়ে বলেন,وَلَا يَصُدَّنَّكُمُ الشَّيْطَانُ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُبِيْنٌ- ‘আর শয়তান যেন তোমাদেরকে (আমার অনুসরণ থেকে) বিরত না রাখে। সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু’ (যুখরুফ ৪৩/৬২)

যারা আল্লাহর রাস্তায় তথা কল্যাণের পথে বাধা প্রদান করে তাদের অশুভ পরিণতির কথা উল্লেখ করে মহান আল্লাহ বলেন, الَّذِيْنَ كَفَرُوا وَصَدُّوا عَنْ سَبِيلِ اللهِ زِدْنَاهُمْ عَذَابًا فَوْقَ الْعَذَابِ بِمَا كَانُوا يُفْسِدُوْنَ- ‘যারা কুফরী করেছিল এবং আল্লাহর পথে বাধা দান করেছিল, আমরা তাদের শাস্তির উপর শাস্তি বাড়িয়ে দেব। কারণ তারা (পৃথিবীতে) অশান্তি সৃষ্টি করত’ (নাহল ১৬/৮৮)

১৫. পরাভূত করা, বশীভূত করা (الاستحواذ) : যারা সত্যিকার মিথ্যাবাদী শয়তান তাদেরকে পরাভূত করে নিজেদের দলভুক্ত করে নিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,يَوْمَ يَبْعَثُهُمُ اللهُ جَمِيْعًا فَيَحْلِفُوْنَ لَهُ كَمَا يَحْلِفُوْنَ لَكُمْ وَيَحْسَبُوْنَ أَنَّهُمْ عَلَى شَيْءٍ أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ الْكَاذِبُونَ، اسْتَحْوَذَ عَلَيْهِمُ الشَّيْطَانُ فَأَنْسَاهُمْ ذِكْرَ اللهِ أُولَئِكَ حِزْبُ الشَّيْطَانِ أَلَا إِنَّ حِزْبَ الشَّيْطَانِ هُمُ الْخَاسِرُوْنَ- ‘যে দিন আল্লাহ তাদের সবাইকে পুনরুত্থিত করবেন তখন তারা আল্লাহর সামনে শপথ করবে। যেমন তারা তোমাদের সামনে শপথ করে এবং তারা ধারণা করে যে, তারা যথেষ্ট হেদায়াতের উপর রয়েছে। সাবধান! ওরাই হ’ল মিথ্যাবাদী। শয়তান তাদের উপর বিজয়ী হয়েছে …’ (মুজাদালা ৫৮/১৮-১৯)

আবুদ দারদা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, مَا مِنْ ثَلَاثَةٍ فِيْ قَرْيَةٍ وَلَا بَدْوٍ لَا تُقَامُ فِيهِمُ الصَّلَاةُ إِلَّا قَدِ اسْتَحْوَذَ عَلَيْهِمُ الشَّيْطَانُ، فَعَلَيْكُمْ بِالْجَمَاعَةِ؛ فَإِنَّمَا يَأْكُلُ الذِّئْبُ الْقَاصِيَةَ– ‘যখন কোন গ্রামে বা বন-জঙ্গলে তিন জন লোক একত্রিত হয় এবং জামা‘আতে ছালাত আদায় না করে তখন শয়তান তাদের উপর প্রভুত্ব বিস্তার করে। অতএব তোমরা জমা‘আতে ছালাত আদায় কর। কেননা দলচ্যুত বকরীকে নেকড়ে বাঘে ভক্ষণ করে থাকে’।[11]

হুযায়ফাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে আহার করতে বসলে তিনি খাবারে হাত না রাখা পর্যন্ত আমরা হাত দিতাম না। একদা আমরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে খাবার খেতে উপস্থিত হ’লাম।

فَجَاءَتْ جَارِيَةٌ كَأَنَّهَا تُدْفَعُ، فَذَهَبَتْ لِتَضَعَ يَدَهَا فِي الطَّعَامِ، فَأَخَذَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِيَدِهَا، ثُمَّ جَاءَ أَعْرَابِيٌّ كَأَنَّمَا يُدْفَعُ فَأَخَذَ بِيَدِهِ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ الشَّيْطَانَ يَسْتَحِلُّ الطَّعَامَ أَنْ لَا يُذْكَرَ اسْمُ اللهِ عَلَيْهِ، وَإِنَّهُ جَاءَ بِهَذِهِ الْجَارِيَةِ لِيَسْتَحِلَّ بِهَا فَأَخَذْتُ بِيَدِهَا، فَجَاءَ بِهَذَا الْأَعْرَابِيِّ لِيَسْتَحِلَّ بِهِ فَأَخَذْتُ بِيَدِهِ، وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، إِنَّ يَدَهُ فِي يَدِي مَعَ يَدِهَا وَزَادَ فِي آخِرِ الْحَدِيثِ: ثُمَّ ذَكَرَ اسْمَ اللهِ وَأَكَلَ-

‘হঠাৎ একটি বালিকা এমনভাবে এল, যেন তাকে পিছন থেকে ধাক্কা দেওয়া হচ্ছিল। সে নিজ হাতে খাবার গ্রহণ করতে উদ্যত হয়েছিল, এমন অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার হাত ধরে নিলেন। তারপর এক বেদুঈনও অনুরূপভাবে এসে খাবারে হাত দিতে উদ্যত হ’লে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার হাত ধরে নিলেন এবং বললেন, যে খাবারে আল্লাহর নাম নেওয়া হয়নি শয়তান সে খাদ্যকে হালাল মনে করে। এই মেয়েটিকে এবং বেদুঈনটিকে শয়তানই নিয়ে এসেছে যেন তার দ্বারা নিজের জন্য খাদ্য হালাল করে নিতে পারে। কিন্তু আমি ওদের হাত ধরে ফেললাম। সেই মহান সত্তার কসম! যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে, শয়তানের হাত ঐ দু’জনের হাতের সঙ্গে আমার হাতে ধরা পড়েছিল। অতঃপর তিনি বিসমিল্লাহ বলে আহার করলেন’।[12]

উল্লেখিত হাদীছ থেকে বুঝা যায়, শয়তান তাদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে পরাভূত করে ফেলেছিল কিন্তু রাসূল (ছাঃ)-এর সামনে টিকতে পারেনি।

ইবনুল ক্বাইয়িম আল-জাওযিইয়া (রঃ) বলেন, সাবধান! জেনে রেখ! ইবলীসের প্রথম প্ররোচনা হ’ল মানুষকে ইলম অর্জনে বাধা প্রদান করা। কারণ ইলম হ’ল হেদায়াতের আলো। যদি এই আলো নিভিয়ে দিতে পারে তাহ’লে মানুষকে জাহিলিয়াতের অন্ধকারে যেমন খুশি তেমন ডুবিয়ে দিতে পারে। এমনকি তাদের ভক্তদের বিবাহের মত সুন্নাত পরিত্যাগ করতে উদ্বুদ্ধ করে। সংসার বিরাগী করে ছূফী মতবাদের দিকে ঠেলে দেয়। গ্রহণ করে বৈরাগ্য সাধন, ইবাদত করে পাহাড়ে বসে, ত্যাগ করে জুম‘আ ও জামা‘আত।[13]

১৬. প্ররোচনা দেওয়া, বার্তা পাঠানো (الايحاء) :

শয়তান তার সমর্থকদের মাঝে প্ররোচনা দেয়, অবহিত করে। ফলে ঝগড়া-বিবাদ ও ফিৎনা-ফাসাদ বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَإِنَّ الشَّيَاطِيْنَ لَيُوْحُوْنَ إِلَى أَوْلِيَائِهِمْ لِيُجَادِلُوكُمْ وَإِنْ أَطَعْتُمُوهُمْ إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُوْنَ- ‘আর শয়তানরা তাদের বন্ধুদের প্ররোচনা দেয় যেন তারা তোমাদের সাথে বিতন্ডা করে। তবে যদি তোমরা তাদের (শিরকী যুক্তির) আনুগত্য কর, তাহ’লে তোমরা অবশ্যই মুশরিক হয়ে যাবে’ (আন‘আম ৬/১২১)। তিনি আরো বলেন, وَكَذَلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِيٍّ عَدُوًّا شَيَاطِينَ الْإِنْسِ وَالْجِنِّ يُوحِي بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ زُخْرُفَ الْقَوْلِ غُرُورًا ‘এভাবে আমরা প্রত্যেক নবীর জন্য মানুষ ও জিনের মধ্য থেকে বহু শয়তানকে শত্রুরূপে নিযুক্ত করেছি। তারা প্রতারণার উদ্দেশ্যে একে অপরকে চাকচিক্যপূর্ণ কথা দ্বারা প্ররোচনা দেয়’ (আন‘আম ৬/১১২)

ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন নূহ (আঃ)-এর কওমের ভাল লোকগুলো মৃত্যুবরণ করল তখন শয়তান তাদের নিকট বার্তা পাঠাল যে,أَنِ انْصِبُوا إِلَى مَجَالِسِهِمُ الَّتِي كَانُوا يَجْلِسُونَ أَنْصَابًا وَسَمُّوهَا بِأَسْمَائِهِمْ، فَفَعَلُوا، فَلَمْ تُعْبَدْ، حَتَّى إِذَا هَلَكَ أُولَئِكَ وَتَنَسَّخَ العِلْمُ عُبِدَتْ ‘তারা যেখানে বসে মজলিস করত, সেখানে তোমরা কতিপয় মূর্তি স্থাপন কর এবং ঐ সমস্ত পুন্যবান লোকের নামেই এগুলোর নামকরণ কর। কাজেই তারা তাই করল, কিন্তু তখনও ঐসব মূর্তির পূজা করা হ’ত না। তবে মূর্তি স্থাপনকারী লোকগুলো মারা গেলে এবং মূর্তিগুলোর ব্যাপারে সত্যিকারের জ্ঞান বিলুপ্ত হ’লে লোকজন তাদের পূজা আরম্ভ করে দেয়’।[14]

আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, আল্লাহ আসমানে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা জারী করলে ফেরেশতারা বিনয়াবনত হয়ে পাখা ঝাপটাতে থাকে। … ফেরেশতাদের পারস্পরিক আলোচনা শয়তান ওঁৎ পেতে শোনে এবং ভূপৃষ্ঠে অবস্থানকারী তাদের সাঙ্গপাঙ্গদের কাছে তা পৌঁছে দেয়। কখনো তা নিম্নে অবস্থানকারীদের কাছে পৌঁছানোর পূর্বে তাদের প্রতি উল্কাপিন্ড নিক্ষেপ করা হয়। শ্রুত কথা তারা পৃথিবীতে এসে গণক অথবা যাদুকরের সামনে পেশ করে। আবার কখনো তারা কিছুই শুনতে পায় না বরং নিজেদের পক্ষ থেকে তা গণক ও যাদুকরের মুখে তাদের কথার সাথে সত্য মিথ্যা যোগ করে পেশ করে। তাই কেবল সত্য সেটিই হয় যা তারা আসমান থেকে শোনে’।[15]

১৭. অপচয় করা (التبذير) :

মহান আল্লাহ অপচয় করতে নিষেধ করে বলেন,وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا، إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا- ‘আর তুমি মোটেই অপব্যয় করো না। নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান স্বীয় প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ’ (বনী ইসরাঈল ১৭/২৬-২৭)

অপচয়রোধে হাদীছে কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারিত হয়েছে,

عَنِ المُغِيرَةِ بْنِ شُعْبَةَ، قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” إِنَّ اللَّهَ حَرَّمَ عَلَيْكُمْ: عُقُوقَ الأُمَّهَاتِ، وَوَأْدَ البَنَاتِ، وَمَنَعَ وَهَاتِ، وَكَرِهَ لَكُمْ قِيلَ وَقَالَ، وَكَثْرَةَ السُّؤَالِ، وَإِضَاعَةَ المَالِ

‘মুগীরা বিন শু‘বাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের জন্য হারাম করেছেন, মায়েদের অবাধ্যাচরণ করা, অধিকার প্রদানে বিরত থাকা ও অনধিকার কিছু প্রার্থনা করা এবং জীবন্ত কন্যা প্রোথিত করা। আর তোমাদের জন্য অপসন্দ করেছেন, ভিত্তিহীন বাজে কথা বলা, অধিক প্রশ্ন করা, ধন-সম্পদ অপচয় করা’।[16]

দয়াময় আল্লাহর বান্দাদের গুণাবলী উল্লেখ করতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেন,وَالَّذِيْنَ إِذَا أَنْفَقُوْا لَمْ يُسْرِفُوْا وَلَمْ يَقْتُرُوْا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا- ‘তারা যখন ব্যয় করে, তখন অপব্যয় করে না বা কৃপণতা করে না। বরং তারা এতদুভয়ের মধ্যবর্তী অবস্থায় থাকে’ (ফুরক্বান ২৫/৬৭)

তাহ’লে বুঝা গেল অপচয়কারী শয়তানের ভাই, আর অপচয় না করা হচ্ছে দয়াময় (রহমান) আল্লাহর খাঁটি বান্দা হিসাবে নিজেকে পরিগণিত করা।

[চলবে]

 

[1]. বুখারী হা/৬০১৮।

[2]. বুখারী হা/৩২৭৬; মুসলিম হা/১৩৪

[3]. তিরমিযী হা/৩৯৭; বুখারী, মুসলিম

[4]. মুসলিম হা/১১৬৭

[5]. মুসলিম  হা/২৮১৩

[6]. ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম, ঈমান  অধ্যায়, পর্ব-৭৯

[7]. বুখারী হা/১২৭৩।

[8]. মুসলিম হা/১৪৪

[9]. তিরমিযী হা/১১৭১

[10]. তিরমিযী হা/৮৮৫

[11]. নাসাঈ হা/৮৪৭; মিশকাত হা/১০৬৭; ইবনে কাছীর ৪/৪২১

[12]. বুখারী হা/৩২৮০; মুসলিম হা/২০১৭; আবূদাঊদ হা/৩৭৬৬

[13]. সার সংক্ষেপ : ইগাছাতুল লাহফান ফি মাছায়িদিশ শায়ত্বান ১/১৬

[14]. বুখারী হা/৪৯২০

[15]. বুখারী হা/৪৭০১; ইবনে মাজাহ হা/১৯৪; তিরমিযী হা/৩২২৩

[16]. বুখারী হা/৫৯৭৫; মুসলিম হা/৫৯৩


মুহাম্মাদ খায়রুল ইসলাম*
* সহকারী শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, নওদাপাড়া, রাজশাহী।

সুএঃমাসিক আত-তাহরীক 

#SotterDikeAhobban

Tags

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close