preloder
ইলম (ইসলামী জ্ঞান)

যে সকল কর্ম লা‘নত ডেকে আনে (পূর্ব প্রকাশিতের পর)

(২৬) কাফেরদের উপর লা‘নত : মহান আল্লাহ স্বয়ং যাদেরকে অভিসম্পাত করেন তাদের মধ্যে কাফেররা অন্যতম। তিনি বলেন, إِنَّ الله لَعَنَ الْكَافِرِيْنَ وَأَعَدَّ لَهُمْ سَعِيْرًا ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফেরদের লা‘নত করেছেন এবং তাদের জন্য জাহান্নাম প্রস্ত্তত রেখেছেন’ (আহযাব ৩৩/৬৪)। তিনি অন্যত্র বলেন,

وَلَمَّا جَاءَهُمْ كِتَابٌ مِنْ عِنْدِ اللهِ مُصَدِّقٌ لِمَا مَعَهُمْ وَكَانُوْا مِنْ قَبْلُ يَسْتَفْتِحُوْنَ عَلَى الَّذِيْنَ كَفَرُوْا فَلَمَّا جَاءَهُمْ مَا عَرَفُوْا كَفَرُوْا بِهِ فَلَعْنَةُ اللهِ عَلَى الْكَافِرِيْنَ-

‘আর যখন তাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ হ’তে কিতাব (কুরআন) এসে গেল, যা সত্যায়নকারী ছিল (তওরাত-ইনজীলের), যা তাদের কাছে রয়েছে। অথচ ইতিপূর্বে তারা (শেষনবীর মাধ্যমে) কাফেরদের উপর বিজয় কামনা করত। অবশেষে যখন তাদের নিকট পরিচিত সেই কিতাব (কুরআন) এসে গেল তারা তাকে অস্বীকার করল। অতএব কাফেরদের উপরে আল্লাহর অভিসম্পাৎ’ (বাক্বারাহ ২/৮৯)

(২৭) ইহুদীদের উপর লা‘নত : ইহুদীরা হ’ল অভিশপ্ত জাতি। আর এই অভিশাপ তারা নিজেরাই নিজেদের নছীবে টেনে এনেছে। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন,

قُلْ هَلْ أُنَبِّئُكُمْ بِشَرٍّ مِنْ ذَلِكَ مَثُوبَةً عِنْدَ اللهِ مَنْ لَعَنَهُ الله وَغَضِبَ عَلَيْهِ وَجَعَلَ مِنْهُمُ الْقِرَدَةَ وَالْخَنَازِيرَ وَعَبَدَ الطَّاغُوْتَ أُولَئِكَ شَرٌّ مَكَانًا وَأَضَلُّ عَنْ سَوَاءِ السَّبِيلِ-

‘বল! আমি যে তোমাদেরকে (আমাদের প্রতি তোমাদের শত্রুতার চাইতে) পরিণামের দিক দিয়ে নিকৃষ্টতম লোকদের বিষয়ে খবর দিব? (তারা হ’ল ইহুদী) যাদেরকে আল্লাহ লা‘নত করেছেন ও তাদের উপর ক্রুদ্ধ হয়েছেন এবং তাদের মধ্য থেকে কিছু লোককে করেছেন বানর, শূকর ও শয়তানের পূজারী। ওরাই হ’ল নিকৃষ্টতম মর্যাদার অধিকারী এবং সরল পথ হ’তে সর্বাধিক বিপথগামী’ (মায়েদাহ ৫/৬০)

অন্যত্র আল্লাহ বলেন,أُولَئِكَ الَّذِيْنَ لَعَنَهُمُ الله وَمَنْ يَلْعَنِ الله فَلَنْ تَجِدَ لَهُ نَصِيْرًا- ‘এদের প্রতি আল্লাহ অভিসম্পাৎ করেছেন। আর আল্লাহ যাকে অভিসম্পাৎ করেন, তুমি তার জন্য কোন সাহায্যকারী পাবে না’ (নিসা ৪/৫২)

(২৮) মুনাফিক পুরুষ-নারীদের উপর লা‘নত : কাফের-মুশরিকদের চাইতে মুনাফিকরা অধিক নিকৃষ্ট। কারণ এদেরকে চেনা যায় না। এরা মুখে একরকম প্রকাশ করে আবার অন্তরে

* সৈয়দপুর, নীলফামারী।

তার ভিন্নটা লালন করে। এদের প্রতি লা‘নত বর্ষিত হয়। মহান আল্লাহ বলেন,وَعَدَ الله الْمُنَافِقِيْنَ وَالْمُنَافِقَاتِ وَالْكُفَّارَ نَارَ جَهَنَّمَ خَالِدِيْنَ فِيْهَا هِيَ حَسْبُهُمْ وَلَعَنَهُمُ الله وَلَهُمْ عَذَابٌ مُقِيْمٌ- ‘আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ ও নারী এবং কাফিরদের জন্য জাহান্নামের আগুনের ওয়াদা করেছেন। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। এটাই তাদের জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তাদেরকে লা‘নত করেছেন। আর তাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী শাস্তি’ (তাওবা ৯/৬৮)

(২৯) যারা আল্লাহ সম্পর্কে মন্দ ধারণা পোষণ করে : যারা আল্লাহ সম্পর্কে মন্দ ধারণা রাখে তাদের উপর লা‘নত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَيُعَذِّبَ الْمُنَافِقِيْنَ وَالْمُنَافِقَاتِ وَالْمُشْرِكِيْنَ وَالْمُشْرِكَاتِ الظَّانِّيْنَ بِاللهِ ظَنَّ السَّوْءِ عَلَيْهِمْ دَائِرَةُ السَّوْءِ وَغَضِبَ الله عَلَيْهِمْ وَلَعَنَهُمْ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيْرًا- ‘আর যাতে তিনি শাস্তি দিতে পারেন মুনাফিক পুরুষ ও নারীদের এবং মুশরিক পুরুষ ও নারীদের। যারা আল্লাহ সম্পর্কে মন্দ ধারণা পোষণ করে। তাদের জন্য রয়েছে মন্দ পরিণাম। আল্লাহ তাদের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন ও তাদের উপর লা‘নত করেছেন এবং তাদের জন্য জাহান্নাম প্রস্ত্তত রেখেছেন। আর কতই না মন্দ সেই ঠিকানা!’ (ফাতহ ৪৭/৬)

(৩০) ধর্মকে মানার ক্ষেত্রে কুট কৌশলের আশ্রয় নেয়া : আল্লাহ তা‘আলা ইহুদীদের উপর লা‘নত করেছেন কারণ তারা ধর্মকে মানার ক্ষেত্রে বাহানা ও কুট কৌশলের আশ্রয় নিত। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, আমি ওমর (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি,

قَاتَلَ الله فُلاَنًا، أَلَمْ يَعْلَمْ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ لَعَنَ الله اليَهُوْدَ، حُرِّمَتْ عَلَيْهِمُ الشُّحُوْمُ فَجَمَّلُوْهَا، فَبَاعُوْهَا-

‘আল্লাহ অমুক ব্যক্তিকে ধ্বংস করুন! সে কি জানে না যে, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, আল্লাহ ইহুদীদের উপর লা‘নত করুন। তাদের জন্য চর্বি হারাম করা হয়েছিল। তখন তারা তা গলিয়ে বিক্রি করতে লাগল’।[1]

(৩১) জমির নিশানা পরিবর্তন করা : অন্যের জমিকে অন্যায়ভাবে দখল করা কবীরা গুনাহ। এটা এমন গুনাহ যা আল্লাহ কখনো ক্ষমা করবেন না। কারণ এটা বান্দার হকের সাথে সম্পৃক্ত। বর্তমানে এই গুনাহের কাজটি অহরহ ঘটছে। জাল দলীল করে অন্যের জমি দখল করা এতটাই ন্যক্কারজনক ও জঘন্য অপরাধ যে, এমন কাজ সম্পাদনকারীর উপর লা‘নত বর্ষিত হ’তে থাকে। এ সম্পর্কে ছাহাবী আমের বিন ওয়াছিলাহ (রাঃ) বলেন,

كُنْتُ عِنْدَ عَلِيِّ بْنِ أَبِيْ طَالِبٍ، فَأَتَاهُ رَجُلٌ، فَقَالَ مَا كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُسِرُّ إِلَيْكَ، قَالَ فَغَضِبَ، وَقَالَ مَا كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُسِرُّ إِلَيَّ شَيْئًا يَكْتُمُهُ النَّاسَ، غَيْرَ أَنَّهُ قَدْ حَدَّثَنِي بِكَلِمَاتٍ أَرْبَعٍ، قَالَ فَقَالَ مَا هُنَّ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ؟ قَالَ : قَالَ : لَعَنَ اللهُ مَنْ لَعَنَ وَالِدَهُ، وَلَعَنَ اللهُ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللهِ، وَلَعَنَ اللهُ مَنْ آوَى مُحْدِثًا، وَلَعَنَ اللهُ مَنْ غَيَّرَ مَنَارَ الْأَرْضِ-

‘আমি আলী ইবনু আবী তালিব (রাঃ)-এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। এক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে বলল, নবী করীম (ছাঃ) আপনাকে গোপনে কি বলেছিলেন? বর্ণনাকারী বলেন, তিনি রেগে গেলেন এবং বললেন, নবী করীম (ছাঃ) মানুষের নিকট থেকে গোপন করে আমার কাছে একান্তে কিছু বলেননি। তবে তিনি আমাকে চারটি কথা বলেছেন। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর লোকটি বলল, হে আমীরুল মুমিনীন! সে চারটি কথা কি? তিনি বললেন, (১) যে ব্যক্তি তার পিতাকে লা‘নত করে, আল্লাহ তাকে লা‘নত করেন। (২) যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে যবেহ করে আল্লাহ তার উপর লা‘নত করেন। (৩) ঐ ব্যক্তির উপরও আল্লাহ লা‘নত করেন, যে কোন বিদ‘আতী ব্যক্তিকে আশ্রয় দেয় এবং (৪) যে ব্যক্তি জমির সীমানা চিহ্নসমূহ (আইল) পরিবর্তন করে, তার উপর আল্লাহ লা‘নত করেন ।[2]

(৩২) পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া : পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া কবীরা গুনাহ। এর পরিণাম খুবই ভয়াবহ। হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : لَعَنَ الله سَبْعَةً مِنْ خَلْقِهِ مِنْ فَوْقِ سَبْعِ سَمَوَاتِهِ، وَرَدَّدَ اللَّعْنَةَ عَلَى وَاحِدٍ مِنْهُمْ ثَلَاثًا، وَلَعَنَ كُلَّ وَاحِدٍ مِنْهُمْ لَعْنَةً تَكْفِيهِ، فَقَالَ: مَلْعُونٌ مَنْ عَقَّ وَالِدَيْهِ –

আবূ হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহ সপ্ত আসমানের উপর থেকে সাত প্রকারের ব্যক্তিকে লা‘নত করেন। আর তিনি তিনবার করে লা‘নত বর্ষণ করতে থাকেন। অথচ প্রত্যেকের ধ্বংসের জন্য একটি লা‘নতই যথেষ্ট। (তন্মধ্যে একটি হ’ল) যে মা-বাবার অবাধ্য হয়’।[3]

(৩৩) পিতা-মাতাকে গালি দেওয়া : আতা খুরাসানী (রহঃ) বলেন, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, مَلْعُوْنٌ مَنْ سَبَّ شَيْئًا مِنْ وَالِدَيْه-ِ ‘যে তার পিতা-মাতাকে গালি দেয় সে অভিশপ্ত’।[4]

(৩৪) পিতা-মাতা ও সন্তানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা : যে ব্যক্তি পিতা-মাতা ও সন্তানের মধ্যেকার সম্পর্কে বিচ্ছেদ ঘটায় সে অভিশপ্ত। হাদীছে এসেছে,

عَنْ عِمْرَانَ بْنِ حُصَيْنٍ، رَضِيَ الله عَنْهُ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : مَلْعُوْنٌ مَنْ فَرَّقَ بَيْنَ الْوَالِدَةِ وَوَلَدِهَا-

ইমরান বিন হুছাইন (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পিতা-মাতা ও সন্তানের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটায় সে অভিশপ্ত’।[5]

বর্তমানে অনেক স্ত্রীই তার স্বামীকে খোটা ও কান কথা দিয়ে স্বামীর মনকে বিষিয়ে তোলে। ফলে সেই স্বামী নিজের মা-বাবার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে বা বাহ্যিকভাবে মিশলেও মনে প্রাণে নিজের মা-বাবাকে ঘৃণা ও বোঝা মনে করতে থাকে। এক্ষেত্রে যে সম্পর্ক ছিন্ন করে তার উপর যেমন লা‘নত বর্ষিত হয়। তেমনিভাবে যে অন্যের কথায় প্রভাবিত হয়ে সম্পর্কে অবনতি ঘটায় সেও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী হিসাবে অভিশপ্ত হয়।

(৩৫) মুমিনদেরকে কষ্ট ও ধোঁকা দেওয়া : যারা  মুমিনদের সাথে প্রতারণা করে, তাদেরকে ধোঁকা দেয় তারা অভিশপ্ত। মুমিনের সাথে হোক বা অন্যের সাথে হোক প্রতারণা করা ও কষ্ট দেয়া হারাম। প্রথম খলীফা আবূ বকর ছিদ্দীক্ব (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَلْعُوْنٌ مَنْ ضَارَّ مُؤْمِنًا أَوْ مَكَرَ بِه ‘ঐ ব্যক্তি অভিশপ্ত যে অন্য মুমিনের ক্ষতি করে বা তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে’।[6]

অমুসলিম দেশগুলিতে পথে-ঘাটে, বাজারে মুসলিমদেরকে দাড়ি রাখার কারণে, ইসলামী পোষাক-পরিচ্ছদের জন্য কটু কথা শুনতে হয়। তাদেরকে শারীরিকভাবে হেস্তনেস্ত করা হয়। শুধু তাই নয়। এমনকি মুসলিম দেশগুলিতেও এমনটা হয়ে থাকে। এভাবে কোন মুসলিম নারী-পুরুষকে কষ্ট দেয়া, তাদের সাথে মন্দ আচরণ করার ব্যাপারে হাদীছে কঠোর হুঁশিয়ার বাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। রাসূল (ছাঃ) বলেন,مَنْ آذَى الْمُسْلِمِيْنَ فِيْ طُرُقِهِمْ وَجَبَتْ عَلَيْهِ لَعْنَتُهُمْ- ‘যে মুসলিমদেরকে তাদের পথে-ঘাটে কষ্ট প্রদান করে, তার উপর মুসলিমদের লা‘নত অবধারিত হয়ে যায়’।[7]

মুসলিম মেয়েদেরকে উত্যক্ত করা, দাড়ি রাখার কারণে ছেলেদেরকে মন্দ কথা বলা, নিরপরাধ মুসলিম নারী-পুরুষদেরকে জঙ্গি বলা, কাঠমোল্লা বলে অপমান করা ইত্যাদি সবই লা‘নত ডেকে আনবে। সুতরাং এগুলি থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।

(৩৬) ইচ্ছাকৃত মুমিনদেরকে হত্যা করা : একজন মুসলিমকে গালি দেয়া পাপের কাজ। তার সাথে লড়াই করা কুফরী কাজ। কিন্তু কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করে তাহ’লে সে লা‘নতের হকদার হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন,

وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيْهَا وَغَضِبَ اللهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيْمًا-

‘যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করে, তার শাস্তি হ’ল জাহান্নাম। সেখানেই সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন, তাকে অভিসম্পাৎ করেছেন এবং তার জন্য ভীষণ শাস্তি প্রস্ত্তত রেখেছেন’ (নিসা ৪/৯৩)

(৩৭) পশুর অঙ্গহানি করা : জীব-জন্তু, পশু-পাখী হ’ল আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য বিশেষ নে‘মত। এগুলির দ্বারা আমরা অনেক উপকার লাভ করি। এগুলির অঙ্গহানি করাও লা‘নতের কারণ।

عَنْ ابْنِ عُمَرَ لَعَنَ النَّبِيُّ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ مَثَّلَ بِالحَيَوَانِ-

‘ইবনু ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন যে, ‘নবী করীম (ছাঃ) তাদের উপর লা‘নত করেছেন, যারা পশুর অঙ্গ বিকৃত করে’।[8]

(৩৮) পশুর সাথে বলাৎকার করা : পশুর সাথে যৌনকর্ম করা অত্যন্ত বিকৃত মানসিকতার পরিচায়ক। এহেন নোংরা-অশ্লীলতা সম্পর্কে ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, مَلْعُوْنٌ مَنْ وَقَعَ عَلَى بَهِيْمَةٍ ‘যে পশুর সাথে অপকর্ম করে সে ব্যক্তি অভিশপ্ত’।[9] এমন অপকর্মের শাস্তিও হাদীছে বলে দেয়া হয়েছে। নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,

مَنْ أَتَى بَهِيْمَةً فَاقْتُلُوْهُ وَاقْتُلُوْهَا مَعَهُ قَالَ : قُلْتُ لَهُ : مَا شَأْنُ الْبَهِيْمَةِ؟ قَالَ : مَا أُرَاهُ قَالَ ذَلِكَ إِلَّا أَنَّهُ كَرِهَ أَنْ يُؤْكَلَ لَحْمُهَا، وَقَدْ عُمِلَ بِهَا ذَلِكَ الْعَمَلُ-

‘যদি কেউ কোন পশুর সাথে অপকর্ম করে, তবে তাকে হত্যা করবে এবং সে পশুকেও তার সাথে হত্যা করবে। রাবী বলেন, আমি ইবনু আববাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, পশুর অপরাধ কি? তিনি বলেন, আমার মনে হয়, তিনি সে পশুর গোশত খাওয়া ভাল মনে করেননি, যার সাথে এরূপ কুকর্ম করা হয়েছে’।[10] তবে এ অপরাধের দন্ড দেশের সরকার কার্যকর করবেন।

(৩৯) উপকারীর দানকে অস্বীকার করা : উপকারীর উপকার অস্বীকার করা অভিশাপের কারণ। এ প্রসঙ্গে আবূ জা‘ফর মুহাম্মাদ বিন আলী হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, وُجِدَ فِيْ قَائِمِ سَيْفِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَحِيْفَةٌ فِيْهَا مَكْتُوْبٌ مَلْعُوْنٌ مَنْ جَحَدَ نِعْمَةَ مَنْ أَنْعَمَ عَلَيْهِ- ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর একটি তলোয়ারের উপর লেখা ছিল যে, যে উপকারীর উপকারকে অস্বীকার করে সে অভিশপ্ত’।[11]

(৪০) মিথ্যা বলা : যারা মিথ্যাচার করে তাদের উপর লা‘নত বর্ষিত হয়। আল্লাহ বলেন,وَالْخَامِسَةُ أَنَّ لَعْنَتَ اللهِ عَلَيْهِ إِنْ كَانَ مِنَ الْكَاذِبِيْنَ- ‘আর পঞ্চমবারে বলবে, সে যদি মিথ্যাবাদী হয় তবে তার উপর আল্লাহর অভিশাপ হৌক’ (নূর ৭/২৪)। যদিও এটা লে‘আনের ক্ষেত্রে নাযিল হয়েছে তবুও মিথ্যা বললে যে লা‘নত বর্ষিত হয় তার প্রমাণ এখানে পাওয়া যায়।

(৪১) ছাহাবীদেরকে গালি-গালাজ করা : ছাহাবীরা হ’লেন নবী করীম (রাঃ)-এর সুখ-দুঃখের সাথী। তারা ইসলাম গ্রহণ করার পর থেকে আমৃত্যু অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন। দ্বীন ইসলামের জন্য তারা ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। তাদেরকে আল্লাহ দুনিয়াতেই জান্নাতী হিসাবে ঘোষণা করেন। তাদেরকে গালি-গালাজ করা লা‘নত ডেকে আনে। হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ : قَالَ أُنَاسٌ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : يَا رَسُوْلَ اللهِ، أَنَّا نُسَبُّ، فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : مَنْ سَبَّ أَصْحَابِي فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللهِ، وَالْمَلَائِكَةِ، وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ-

‘আনাস বিন মালেক (রাঃ) বলেন, কতিপয় ছাহাবী বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমাদেরকে গালি-গালাজ করা হয়। তখন তিনি বললেন, ‘যে আমার ছাহাবীদেরকে গালি দেয় তার উপর আল্লাহ, ফেরেশতাগণ ও সকল মানুষের লা‘নত’।[12]

(৪২) কুরআন-হাদীছের বিধানকে গোপন করা : জেনে-বুঝে কুরআন-হাদীছের ইলমকে গোপন করা কবীরা গুনাহ। তাদের উপরে আল্লাহর লা‘নত। মহান আল্লাহ বলেন,

إِنَّ الَّذِيْنَ يَكْتُمُوْنَ مَا أَنْزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَى مِنْ بَعْدِ مَا بَيَّنَّاهُ لِلنَّاسِ فِي الْكِتَابِ أُولَئِكَ يَلْعَنُهُمُ الله وَيَلْعَنُهُمُ اللَّاعِنُوْنَ-

‘আমরা এই কিতাবের মধ্যে মানব জাতির জন্য স্পষ্ট বিধান ও পথনির্দেশ সমূহ বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে নাযিল করার পরেও যারা সেগুলি গোপন করে, তাদেরকে লা‘নত করে থাকেন আল্লাহ ও সকল লা‘নতকারীগণ’ (বাক্বারাহ ২/১৫৯)

অন্যত্র আল্লাহ তাদেরকে সবচাইতে বড় যালেম বলেছেন। যেমন তিনি বলেন, وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ كَتَمَ شَهَادَةً عِنْدَهُ مِنَ اللهِ وَمَا الله بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ ‘বস্ত্ততঃ তার চাইতে বড় যালেম আর কে আছে যে আল্লাহর নিকট হ’তে প্রাপ্ত সাক্ষ্য গোপন করে? অথচ আল্লাহ তোমাদের কর্ম সম্পর্কে উদাসীন নন’ (বাক্বারাহ ২/১৪০)

যারা সঠিক ইসলাম জানার পরও নিজেদের মনমত ইসলাম প্রচার করে এবং হক গোপন করে। আল্লাহ তাদেরকে হেদায়াত দান করুন।

(৪৩) সতী-সাধ্বী নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করা : এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন,

إِنَّ الَّذِيْنَ يَرْمُوْنَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوْا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ- يَوْمَ تَشْهَدُ عَلَيْهِمْ أَلْسِنَتُهُمْ وَأَيْدِيْهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَ-

‘যারা সতী-সাধ্বী, সরলা ঈমানদার নারীদের প্রতি (যেনার) অপবাদ দেয়, তারা ইহকালে ও পরকালে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে গুরুতর শাস্তি’ (নূর ২৪/২৩)

(৪৪) আল্লাহর সাথে কৃত শপথ ভঙ্গ করা : যারা আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা ভঙ্গ করে তারা অভিশপ্ত। এরা আল্লাহর আদেশ অমান্য করে এবং তার নিষেধকে মেনে চলে না। এরা পৃথিবীর বুকে ফেতনা-ফাসাদ করে থাকে। মহান আল্লাহ এদের সম্পর্কে বলেন,

وَالَّذِيْنَ يَنْقُضُوْنَ عَهْدَ اللهِ مِنْ بَعْدِ مِيْثَاقِهِ وَيَقْطَعُوْنَ مَا أَمَرَ الله بِهِ أَنْ يُوْصَلَ وَيُفْسِدُوْنَ فِي الْأَرْضِ أُولَئِكَ لَهُمُ اللَّعْنَةُ وَلَهُمْ سُوْءُ الدَّارِ-

‘পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে এবং যে সম্পর্ক অটুট রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে ও পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে, তাদের জন্য রয়েছে অভিসম্পাৎ এবং তাদের জন্য রয়েছে মন্দ আবাস’ (রা‘দ ১৩/২৫)

(৪৫) ইবলীস অভিশপ্ত : ইবলীস হ’ল সকল শয়তানের সর্দার। যাকে আল্লাহ আদম (আঃ)-কে জান্নাতে সিজদা না করার জন্য জান্নাত হতে বিতাড়িত করেন। তার প্রতি আল্লাহ লা‘নত বর্ষণ করেন। মহান আল্লাহ তাকে সরাসরি সম্বোধন করে বলেন, وَإِنَّ عَلَيْكَ لَعْنَتِيْ إِلَى يَوْمِ الدِّيْنِ ‘আর তোমার প্রতি আমার অভিশাপ রইল বিচার দিবস পর্যন্ত’ (ছোয়াদ ৩৮/৭৮)

উপসংহার : উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, আমাদের সমাজে প্রচলিত অনেক কাজই মানুষ করে থাকে, যার ফলে সে অভিশপ্ত হয়ে যায়। সুতরাং এগুলি থেকে বিরত থাকা অতীব যরূরী। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর বিধান সমূহ সঠিকভাবে পালন করার মাধ্যমে লা‘নত থেকে বাঁচার তাওফীক দান করুন-আমীন! 

[1]. বুখারী হা/৩৪৬০।     

[2]. মুসলিম হা/১৯৭৮। 

[3]. তাবারানী, আদ-দো‘আ হা/৮৪৯৭।  

[4]. মুসলিম হা/১৯৭৮; মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাক হা/১৩৪৯৪। 

[5]. তাবারানী, আদ-দু‘আ হা/২১১৪। 

[6]. তিরমিযী হা/১৯৪১।

[7]. তাবারানী, আল-মু‘জামুল কাবীর হা/৩০৫০; ছহীহাহ হা/২২৯৪।  

[8]. বুখারী হা/৫৫১৫। 

[9]. মুসনাদে আহমাদ হা/১৮৭৫। 

[10]. আবূদাঊদ হা/৪৪৬৪, হাসান ছহীহ।  

[11]. জামেউ বায়ানিল ইলম হা/৩৯৩।

[12]. ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল, ফাযায়েলুছ ছাহাবা হা/৮; ছহীহা হা/২৩৪০। 


আহমাদুল্লাহ
সৈয়দপুর, নীলফামারী।

সুএঃ মাসিক আত-তাহরীক  নভেম্বর ২০১৮

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close