preloder
দো’আ ও যিকর

রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি দরূদ পাঠের গুরুত্ব ও ফযীলত

দুনিয়ার মানুষের হেদায়াতের জন্য আল্লাহ যুগে যুগে যেসব নবী-রাসূলকে প্রেরণ করেছেন তাঁদের মধ্যে মুহাম্মাদ (ছাঃ) সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল।[1] আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে সমগ্র বিশে^র জন্য রহমত করে পাঠিয়েছেন (আম্বিয়া ২১/১০৭)। তাঁর চেষ্টা-প্রচেষ্টা ও দাওয়াতের ফলেই আমরা সত্যের দিশা পেয়েছি। ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহর অনুমতিক্রমে তিনিই শাফা‘আত করবেন। এই মহামানবের প্রতি আল্লাহ রহমত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতাগণ তাঁর জন্য দো‘আ করেন। আর তাঁর প্রতি দরূদ পাঠের জন্য সকল মুমিনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (আহযাব ৩৩/৫৬)। এজন্য আমাদের দায়িত্ব হ’ল তাঁর প্রতি দরূদ পাঠ করা ও তাঁর উচ্চ মর্যাদার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা। তাই রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি ছালাত ও সালাম পাঠ করা একটি গুরুত্ব্পূর্ণ ইবাদত। আর প্রত্যেকটি ইবাদত সম্পাদক করতে হবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে রাসূল (ছাঃ)-এর প্রদর্শিত পথে। আলোচ্য প্রবন্ধে দরূদ পাঠের ফযীলত ও পদ্ধতি বিষয়ে আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।

রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি ছালাত (দরূদ) পাঠের অর্থ :

‘ছালাত’ শব্দটি কুরআন ও হাদীছে ব্যবহৃত একটি পরিচিত শব্দ। পবিত্র কুরআন ও হাদীছে ছালাত শব্দটি দু’টি ইবাদতকে বুঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথমটি হ’ল, ‘ছালাত’ যা নামায হিসাবে উপমহাদেশে বহুল প্রচলিত। আর দ্বিতীয়টি হ’ল, নবী মুহাম্মদ (ছাঃ)-এর প্রতি ‘দরূদ’ পাঠ করা। আবুল আলিয়া (রহঃ) বলেন, ‘আল্লাহর ক্ষেত্রে ছালাতের অর্থ ফেরেশতাদের সামনে নবী করীম (ছাঃ)-এর প্রতি আল্লাহর প্রশংসা। ফেরেশতাদের ক্ষেত্রে ছালাতের অর্থ দো‘আ’।[2]

ইমাম কুরতুবী (রহঃ) বলেন, ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী করীম (ছাঃ)-এর প্রতি ছালাত হ’ল আল্লাহর রহমত, তাঁর সন্তুষ্টি এবং ফেরেশতাদের সামনে তাঁর প্রশংসা। আর ফেরেশতাদের পক্ষ থেকে ছালাত হ’ল- নবী করীম (ছাঃ)-এর জন্য আল্লাহর নিকট দো‘আ করা এবং তাঁর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। আর উম্মতদের পক্ষ থেকে ছালাতের অর্থ হ’ল- তাঁর জন্য আল্লাহর কাছে দো‘আ করা, ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং তাঁর ব্যাপারে সম্মান প্রদর্শন করা ইত্যাদি।[3]

আহমদ বিন ফারিস (৩৯৫ হিঃ) বলেন, ছালাত শব্দের অর্থ দো‘আ বা প্রার্থনা। …আর আল্লাহর পক্ষ থেকে ছালাত অর্থ- রহমত। হাদীছে এসেছে, اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى آلِ أَبِيْ أَوْفَى ‘হে আল্লাহ! আবূ আওফার বংশধরের প্রতি সালাম বর্ষণ করুন’।[4] অর্থাৎ রহমত বা করুণা করুন।[5]

রাসূল (ছাঃ)-এর উপর সালাম পাঠের অর্থ :

‘সালাম’ আরবী শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ- শান্তি, নিরাপত্তা, অভিবাদন ইত্যাদি।[6] রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি সালামের অর্থ হ’ল- রাসূল (ছাঃ)-এর জন্য আল্লাহর কাছে শান্তি কামনা করা। যেমন প্রত্যেক মুছল্লী ছালাতের ২য় ও শেষ বৈঠকে এই বলে নবী করীম (ছাঃ)-কে সালাম প্রদান করেন,اَلسَّلاَمُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ، ‘আপনার উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি, রহমত ও বরকত নাযিল হোক হে নবী’![7]

রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি ছালাত (দরূদ) ও সালাম এক সাথে পেশ করা উত্তম। যেমনটি আল্লাহ নির্দেশ দিয়ে বলেন,إِنَّ اللهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّوْنَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا صَلُّوْا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوْا تَسْلِيْماً، ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তার ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরূদ প্রেরণ করেন। (অতএব) হে মুমিনগণ! তোমরা তার প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণ কর’ (আহযাব ৩৩/৫৬)।

উক্ত আয়াতের তাফসীরে ইবনু কাছীর (রহঃ) (৭০০-৭৭৮ হিঃ) বলেন, এই আয়াতের উদ্দেশ্য এই যে, যেন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কদর, মান-সম্মান ও ইয্যত মানুষের নিকট প্রকাশ পেয়ে যায়। তারা যেন জানতে পারে যে, আল্লাহ তা‘আলা স্বয়ং রাসূলের প্রশংসা করেছেন এবং তাঁর ফেরেশতারা রাসূলের জন্য দো‘আ করে থাকেন। মালায়ে আ‘লার এই খবর দিয়ে জগতবাসীকে আল্লাহ তা‘আলা এই নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারাও যেন তাঁর উপর দরূদ ও সালাম পাঠাতে থাকে। যাতে আল্লাহর দরবারের ফেরেশতামন্ডলী ও দুনিয়াবাসীর মধ্যে সামঞ্জস্য হয়ে যায়।[8]

কোন কোন বিদ্বানের মতে, রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি শুধু ছালাত (দরূদ) পাঠ করা যায়। আবার শুধু সালামও পেশ করা যায়। কেননা রাসূল (ছাঃ) প্রথমে ছাহাবীদেরকে শুধু সালাম শিক্ষা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে আল্লাহ ছালাত (দরূদ) পাঠের নির্দেশ দেওয়ার পর রাসূল (ছাঃ) ছাহাবীদেরকে দরূদ শিক্ষা দেন।[9] রাসূল (ছাঃ) বলেন,

أَتَانِيْ جِِبْرِيْلُ، فَقَالَ : يَا مُحَمَّدُ! أَمَا يُرْضِيْكَ أَنَّ رَبَّكَ عَزَّ وَجَلَّ يَقُوْلُ : إِنَّهُ لَا يُصَلِّي عَلَيْكَ مِنْ أُمَّتِكَ أَحَدٌ صَلَاةً، إِلاَّ صَلَّيْتُ عَلَيْهِ بِهَا عَشْرًا، وَلَا يُسَلِّمُ عَلَيْكَ أَحَدٌ مِنْ أُمَّتِكَ تَسْلِيْمَةً، إِلاَّ سَلَّمْتُ عَلَيْهِ عَشْراً، فَقُلْتُ : بَلَى، أَيْ رَبِّ!

‘জিব্রীল আমার নিকট এসে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আপনি কি এ ব্যাপারে সন্তুষ্ট নন যে, আপনার প্রতিপালক বলেছেন, আপনার উম্মতের মধ্যে যে আপনার প্রতি দরূদ পাঠ করবে আমি তার উপর দশটি রহমত বর্ষণ করব। আর আপনার উম্মতের যে আপনার উপর সালাম পেশ করবে, আমি তার উপর দশ বার শান্তি বর্ষণ করব। আমি বললাম, হ্যাঁ অবশ্যই হে আমার রব’।[10]

সুতরাং এক সাথে ছালাত ও সালম প্রদান করাই উত্তম। ফলে আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ও শান্তি পাওয়া যায়। আর যার উপর আল্লাহ রহমত বর্ষণ করেন আল্লাহ তাকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে নিয়ে আসেন। আল্লাহ বলেন,هُوَ الَّذِيْ يُصَلِّيْ عَلَيْكُمْ وَمَلَائِكَتُهُ لِيُخْرِجَكُمْ مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّوْرِ وَكَانَ بِالْمُؤْمِنِيْنَ رَحِيْماً- ‘তিনি তোমাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করেন এবং তাঁর ফেরেশতারাও রহমতের দো‘আ করে তোমাদেরকে অন্ধকার হতে আলোর দিকে বের করে আনার জন্য। বস্ত্ততঃ আল্লাহ ঈমানদারগণের প্রতি অতীব দয়ালু’ (আহযাব ৩৩/৪৩)

শায়খ ছালেহ আল-উছায়মীন (রহঃ) বলেন, ‘যখন রাসূল (ছাঃ)-এর ছালাত ও সালাম একত্রিত হয় তখন চাহিদা পূরণ হয় এবং ভীতি দূর হয়। আর সালাম ভীতি দূর করে এবং অপূর্ণতাকে পূর্ণ করে। আর ছালাত চাহিদা পূরণ করে এবং পরিপূর্ণতাকে নিশ্চিত করে’।[11]

রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি দরূদ পাঠের হুকুম :

বিদ্বানগণের মতে রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি ছালাত (দরূদ) পাঠ কখনো ওয়াজিব আবার কখনো মুস্তাহাব। ইমাম শাফেঈ ও আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ)-এর মতে তাশাহহুদের পর দরূদ পাঠ করা ওয়াজিব। আর ইমাম আবূ হানীফা ও মালেক (রহঃ)-এর মতে সুন্নাত।[12]

হানাফী ও মালেকী মাযহাব মতে সূরা আহযাবের ৫৬নং আয়াতের আদেশ অনুযায়ী জীবনে একবার হ’লেও দরূদ পাঠ করা ওয়াজিব।[13] ইমাম তাহাবী (রহঃ) বলেন, যখনই রাসূল (ছাঃ)-এর নাম আসবে তখনই তার প্রতি দরূদ পাঠ করা ওয়াজিব।[14] আর মুস্তাহাব হ’ল, হাদীছে উল্লেখিত বিভিন্ন সময়ে। যেমন জুম‘আর দিনে, মসজিদে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময়, আযানের পরে, দো‘আর শুরুতে ইত্যাদি।

দরূদ পাঠের ফযীলত

নবী করীম (ছাঃ)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করা তাঁর উম্মতের প্রতি অবশ্য পালনীয় একটি ইবাদত। এই ইবাদত পালনের মাধ্যমে দরূদ পাঠকারী অনেক ছওয়াবের অধিকারী হয়ে থাকে, যা পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে উল্লেখ করা হয়েছে। নিমেণ কয়েকটি ফযীলত উল্লেখ করা হ’ল-

১. আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত লাভ :

দরূদ পাঠের মাধ্যমে আল্লাহর রহমত লাভ করা যায়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, مَنْ صَلّى عَلَيَّ وَاحِدَةً صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ عَشْرًا ‘যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরূদ পড়ে আল্লাহ এর বিনিময়ে তার উপর দশবার রহমত নাযিল করেন’।[15]

রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি দরূদ পাঠের সাথে যদি সালাম প্রদান করা হয় তাহ’লে আল্লাহর পক্ষ থেকে দশটি শান্তি অবতীর্ণ হয়।[16] এটা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে বান্দাদের জন্য রহমত। তিনি বান্দার সকল ভাল কাজকেই ১০গুণ করে বৃদ্ধি করেন (আন‘আম ৬/১৬০)

আব্দুর রহমান বিন আওফ (রাঃ) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বাইরে যান, আর আমি তাঁকে অনুসরণ করি। তিনি একটি খেজুরের বাগানে প্রবেশ করেন এবং সিজদা করেন। তিনি সিজদারত অবস্থায় অনেক সময় অতিবাহিত করেন, ফলে আমি ভয় পেয়ে যাই এই ভেবে যে, সিজদারত অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়ে গেল কি-না? এজন্য আমি কাছে এসে লক্ষ্য করি। তিনি মাথা তুলে বললেন, আব্দুর রহমান, তোমরা কী হয়েছে? তখন আমি আমার (মনের ভয়ের) কথা তাঁকে জানালাম। তিনি বললেন, জিব্রীল আমাকে বললেন, আপনি কি এ ব্যাপারে খুশি নন যে, আল্লাহ বলেছেন,مَنْ صَلَّى عَلَيْكَ صَلَّيْتُ عَلَيْهِ وَمَنْ سَلَّمَ عَلَيْكَ سَلَّمْتُ عَلَيْهِ، ‘আপনার উপর যে দরূদ পাঠ করবে আমিও তার উপর রহমত, বরকত নাযিল করব, আর যে আপনার উপর সালাম পাঠাবে আমি তার উপর শান্তি বর্ষণ করব’। (নবী করীম (ছাঃ) বলেন) ‘আর এজন্য আমি শুকরিয়ার সিজদা করি’।[17]

২. ফেরেশতা কর্তৃক আল্লাহর কাছে রহমতের জন্য দো‘আ :

রাসূল (ছাঃ)-এর উপরে দরূদ পাঠকারীর জন্য ফেরেশতারা আল্লাহর নিকটে দো‘আ করে থাকেন। রাসূল (ছাঃ) বলেন,

أَكْثِرُوا الصَّلاةَ عَلَيَّ يَوْمَ الجُمُعَةِ فَإِنَّهُ أَتَانِيْ جِبْرِيْلُ آنِفًا عَنْ رَبِّهِ عَزَّ وَجَلَّ فَقَالَ مَا عَلَى الأَرْضِ مِنْ مُسْلِمٍ يُصَلِّيْ عَلَيْكَ مَرَّةً وَاحِدَةً إِلَّا صَلَّيْتُ أَنَا وَمَلَائِكَتِيْ عَلَيْهِ عَشْراً،

‘তোমরা জুম‘আর দিন আমার প্রতি বেশী বেশী দরূদ পাঠ কর। কারণ কিছুক্ষণ পূর্বে জিব্রীল তাঁর প্রতিপালক আল্লাহর নিকট থেকে আগমন করে বললেন, (হে নবী!) পৃথিবীর বুকে যে কোন মুসলিম তোমার প্রতি একবার দরূদ পাঠ করবে, আমি তার উপর দশবার রহমত বর্ষণ করব এবং আমার ফেরেশতাবর্গ তার জন্য দশ বার ক্ষমা প্রার্থনা করবে’।[18] তিনি আরো বলেন,مَا مِنْ مُسْلِمٍ يُصَلِّيْ عَلَىَّ إِلاَّ صَلَّتْ عَلَيْهِ الْمَلاَئِكَةُ مَا صَلَّى عَلَىَّ فَلْيُقِلَّ الْعَبْدُ مِنْ ذَلِكَ أَوْ لِيُكْثِرْ، ‘যখন কোন মুসলিম ব্যক্তি আমার প্রতি দরূদ পাঠ করে এবং যতক্ষণ সে আমার প্রতি দরূদ পাঠরত থাকে, ততক্ষণ ফেরেশতাগণ তার জন্য দো‘আ করতে থাকেন। অতএব বান্দা চাইলে তার পরিমাণ (দরূদ পাঠ) কমাতেও পারে বা বাড়াতেও পারে’।[19]

৩. পাপ মোচন, ছওয়াব ও মর্যাদা লাভ :

রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি দরূদ পাঠ গুনাহ মাফ, ছওয়াব ও মর্যাদা লাভের অন্যতম মাধ্যম। রাসূল (ছাঃ) বলেন,مَنْ صَلَّى عَلَيَّ صَلاَةً وَاحِدَةً صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ عَشْرَ صَلَوَاتٍ وَحُطَّتْ عَنْهُ عَشْرُ خَطِيْئَاتٍ وَرُفِعَتْ لَهُ عَشْرُ دَرَجَاتٍ، ‘যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরূদ পাঠ করে, (তার বিনিময়ে) সেই ব্যক্তির উপর আল্লাহ দশটি রহমত বর্ষণ করেন, তার দশটি পাপ মোচন করেন এবং তার দশ ধাপ মর্যাদার স্তর উন্নীত করেন’।[20]

৪. ক্বিয়ামতের দিন মর্যাদা লাভ :

দুনিয়াতে রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি যারা যত বেশী দরূদ পাঠ করবে ক্বিয়ামতের দিন তারা রাসূল (ছাঃ)-এর তত বেশী নিকটবর্তী হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন,أَوْلَى النَّاسِ بِيْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَكْثَرُهُمْ عَلَىَّ صَلاَةً، ‘ক্বিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তি আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে যে আমার উপর সবচেয়ে বেশী দরূদ পড়ে’।[21]

৫. রাসূল (ছাঃ)-এর শাফা‘আত লাভ :

দরূদ পাঠের আরেকটি ফযীলত হ’ল ক্বিয়ামতের দিন রাসূল (ছাঃ)-এর শাফা‘আত লাভ করা। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার প্রতি দরূদ পাঠ করল অথবা আমার জন্য ‘অসীলার’ দো‘আ করল ক্বিয়ামতের দিন তার ব্যাপারে শাফা‘আত করা আমার জন্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়াবে’।[22] তিনি আরো বলেন,

إِذَا سَمِعْتُمِ الْمُؤَذِّنَ فَقُوْلُوْا مِثْلَ مَا يَقُوْلُ ثُمَّ صَلُّوا عَلَيَّ فَإِنَّهُ مَنْ صَلّى عَلَيَّ صَلَاةً صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ بِهَا عَشْرًا ثُمَّ سَلُوا اللهَ لِي الْوَسِيلَةَ فَإِنَّهَا مَنْزِلَةٌ فِي الْجَنَّةِ لَا تَنْبَغِي اِلَّا لِعَبْدٍ مِنْ عِبَادِ اللهِ وَأَرْجُوْ أَنْ أَكُوْنَ أَنَا هُوَ فَمَنْ سَأَلَ لِي الْوَسِيْلَةَ حَلَّتْ لَهُ الشَّفَاعَةُ-

‘তোমরা মুয়ায্যিনের আযান শুনলে তার উত্তরে সেই শব্দগুলোর পুনরাবৃত্তি করবে। আযান শেষে আমার উপর দরূদ পাঠ করবে। কারণ যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরূদ পাঠ করবে এবং এর পরিবর্তে আল্লাহ তার উপর দশবার রহমত বর্ষণ করবেন। এরপর আমার জন্য আল্লাহর কাছে ‘ওয়াসীলা’ প্রার্থনা করবে। ‘ওয়াসীলা’ হ’ল জান্নাতের একটি উচুঁ স্থান, যা আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে শুধু একজন পাবেন। আর আমার আশা আমিই হব সেইজন। তাই যে ব্যক্তি আমার জন্য ‘ওয়াসীলা’র দো‘আ করবে, ক্বিয়ামতের দিন তার জন্য সুফারিশ করা আমার উপর আবশ্যক হয়ে দাঁড়াবে’।[23]

৬. জান্নাতে বিশেষ মর্যাদা লাভ :

জান্নাতে উচ্চমর্যাদা লাভের জন্য রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি দরূদ পাঠের কোন বিকল্প নেই। রাসূল (ছাঃ) বলেন,فَمَنْ كاَنَ أَكْثَرُهُمْ عَلَيَّ صَلَاةً كَانَ أَقْرَبُهُمْ مِنِّي مَنْزِلَةً، ‘যে ব্যক্তি যত বেশী আমার প্রতি দরূদ পাঠ করবে, সে ব্যক্তি (জান্নাতে) মর্যাদায় তত বেশী আমার নিকটবর্তী হবে’।[24]

৭. ফেরেশতারা রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে দরূদ পৌঁছান :

দুনিয়াতে রাসূলের উপরে কেউ দরূদ পাঠ করলে বা সালাম পেশ করলে ফেরেশতারা তা রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে পৌঁছে দেন। রাসূল (ছাঃ) বলেন,إِنَّ لِلهِ عَزَّ وَجَلَّ مَلَائِكَةً سَيَّاحِيْنَ فِي الْأَرْضِ يُبَلِّغُوْنِيْ مِنْ أُمَّتِي السَّلَامَ، ‘পৃথিবীতে মহান আল্লাহর ভ্রমণরত বহু ফেরেশতা রয়েছেন, যারা আমার উম্মতের পক্ষ থেকে আমাকে সালাম পৌঁছে দেন’।[25]

অন্যত্র রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা আমার প্রতি বেশী বেশী দরূদ পাঠ কর। কেননা আল্লাহ আমার কবরের কাছে ফেরেশতা নিয়োজিত করে রেখেছেন। যখন আমার উম্মতের কোন লোক আমার প্রতি দরূদ পাঠ করে, তখন ফেরেশতা আমাকে জানায় যে, নিশ্চয়ই অমুকের ছেলে অমুক আপনার প্রতি এই সময়ে দরূদ পাঠ করেছে’।[26]

অন্য হাদীছে এসেছে, রাসূল (ছাঃ)-এর মৃত্যুর পর তাঁর কবরের উপর একজন ফেরেশতা দাঁড়িয়ে থাকেন এবং যখনই কেউ দরূদ পাঠ করে তখনই তাকে বলেন, হে মুহাম্মাদ (ছাঃ)! অমুকের ছেলে অমুক আপনার প্রতি দরূদ পাঠ করেছেন।[27]

উল্লেখ্য যে, এই দরূদ পাঠের জন্য রাসূল (ছাঃ)-এর কবরের কাছে যাওয়া শর্ত নয়; বরং বিশে^র যে কোন প্রান্ত থেকে যে কোন সময় দরূদ পাঠ করলেই রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে তা পৌঁছানো হয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন,لاَ تَجْعَلُوْا قَبْرِيْ عِيْداً وَصَلُّوْا عَلَيَّ فَإِنَّ صَلاَتَكُمْ تَبْلُغُنِيْ حَيْثُ كُنْتُمْ، ‘তোমরা আমার কবরকে উৎসব কেন্দ্রে পরিণত করো না। তোমরা আমার প্রতি দরূদ পেশ কর। কারণ তোমরা যেখানেই থাক, তোমাদের পেশকৃত দরূদ আমার কাছে পৌঁছে যায়’।[28]

মুসলিম সমাজে বর্তমানে ধর্মের নামে আলেম-ওলামার কবরকে কেন্দ্র করে যে অনুষ্ঠানগুলো হচ্ছে সেগুলোর কোনটিই জায়েয নয়। এজন্য রাসূল (ছাঃ) সাবধান বাণী উচ্চারণ করে বলেছেন,

أَلَا وَإِنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ كَانُوْا يَتَّخِذُوْنَ قُبُوْرَ أَنْبِيَائِهِمْ وَصَالِحِيْهِمْ مَسَاجِدَ، أَلَا فَلَا تَتَّخِذُوا الْقُبُوْرَ مَسَاجِدَ، إِنِّي أَنْهَاكُمْ عَنْ ذَلِكَ-

‘সাবধান, তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো তাদের নবী ও সৎকর্মশীল বান্দাদের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছিল। সাবধান! তোমরা কবরকে মসজিদে পরিণত করো না। আমি তোমাদেরকে এ কাজ করতে নিষেধ করছি’।[29]

আয়েশা (রাঃ) বলেন, যখন রাসূল (ছাঃ)-এর মৃত্যু ঘনিয়ে আসল, তখন তিনি নিজের মুখমন্ডলকে চাদর দিয়ে ঢেকে ফেলতে লাগলেন। আবার অসস্তিবোধ করলে তা চেহারা থেকে সরিয়ে ফেলতেন। এ অবস্থায় তিনি বললেন, لَعْنَةُ اللهِ عَلَى الْيَهُوْدِ وَالنَّصَارَى اِتَّخَذُوْا قُبُوْرَ أَنْبِيَاءَهِمْ مَسَاجِدَ ‘ইহুদী ও নাছারাদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত। তারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদ বানিয়েছে’।[30]

৮. রাসূল (ছাঃ) কর্তৃক সালামের জবাব দান :

কেউ যদি সালাম পেশ করে তাহ’লে রাসূল (ছাঃ) সেই সালমের জবাব দেন। রাসূল (ছাঃ) বলেন, مَا مِنْ أَحَدٍ يُسَلِّمُ عَلَيَّ إِلاَّ رَدَّ اللهُ عَلَيَّ رُوْحِيْ حَتَّى أَرُدَّ عَلَيْهِ السَّلاَمَ ‘কোন ব্যক্তি যখন আমার উপর সালাম পেশ করে, তখন আল্লাহ আমার মধ্যে আমার আত্মা ফিরিয়ে দেন, ফলে আমি তার সালামের জবাব দেই’।[31]

৯. দরূদ পাঠের মাধ্যমে চিন্তা দূর হয় :

রাসূল (ছাঃ)-এর উপরে দরূদ পাঠের কারণে চিন্তা দূর হয় এবং পাপ মোচন হয়। উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে গিয়ে আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার উপর অনেক বেশী দরূদ পাঠ করি। আপনি আমাকে বলে দিন, আমি (দো‘আর জন্য যতটুকু সময় বরাদ্দ করে রেখেছি তার) কতটুকু সময় আপনার উপর দরূদ প্রেরণের জন্য নির্দিষ্ট করব? উত্তরে নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তোমার মন যা চায়। আমি আরয করলাম, যদি এক তৃতীয়াংশ করি? নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তোমার মন যা চায়, যদি আরো বেশী কর তাহ’লে তা তোমার জন্য কল্যাণকর হবে। আমি আরয করলাম, যদি অর্ধেক সময় নির্ধারণ করি? নবী করীম (ছাঃ) বলেন, তোমার মন যা চায়। যদি বেশী নির্ধারণ কর তাহ’লে তা তোমার জন্যই ভাল। আমি বললাম, যদি দুই-তৃতীয়াংশ করি। নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তোমার মন যা চায়। যদি আরো বেশী নির্ধারণ কর তা তোমার জন্যই কল্যাণকর হবে। আমি আরয করলাম, তাহ’লে আমি আমার (দো‘আর) সবটুকু সময়ই আপনার উপর দরূদ পাঠ করার জন্য নির্দিষ্ট করে দেব? নবী করীম (ছাঃ) বললেন,إِذًا تُكْفَى هَمَّكَ، وَيُغْفَرُ لَكَ ذَنْبُكَ، ‘তাহ’লে তোমার চিন্তা ও ক্লেশের জন্য তা যথেষ্ট হবে এবং তোমার গুনাহ মাফ করা হবে’।[32]

১০. দরূদ পাঠের দ্বারা অন্তর পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন হয় :

রাসূল (ছাঃ)-এর উপরে দরূদ পাঠ করলে অন্তর পাপ-পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, صَلُّوا عَلَيَّ، فَإِنَّ صَلاَتَكُمْ عَلَيَّ زَكَاةٌ لَكُمْ، وَسَلُوا اللهَ لِي الْوَسِيْلَةَ ‘তোমরা আমার প্রতি দরূদ পাঠ কর। নিশ্চয়ই আমার উপর তোমাদের দরূদ তোমাদের (অন্তরের) পবিত্রতা। আর তোমরা আমার জন্য আল্লাহর নিকট ‘ওয়াসীলা’ চাও’।[33]

১১. দো‘আ কবুল হয় :

হামদ ও ছানা তথা আল্লাহর প্রশংসা ও রাসূল (ছাঃ)-এর উপরে দরূদ পাঠ করার পরে দো‘আ করা হ’লে তা কবুল হয়। আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ছালাত আদায় করছিলাম এবং নবী করীম (ছাঃ)-এর সাথে আবু বকর ও ওমর (রাঃ)ও উপস্থিত ছিলেন। আমি (শেষ বৈঠকে) বসলাম, প্রথমে আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করলাম, তারপর নবী করীম (ছাঃ)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করলাম, তারপর নিজের জন্য দো‘আ করলাম। নবী করীম (ছাঃ) বললেন, سَلْ تُعْطَهْ سَلْ تُعْطَهْ ‘তুমি প্রার্থনা করতে থাক, তোমাকে দেয়া হবে; তুমি প্রার্থনা করতে থাকে তোমাকে দেয়া হবে’।[34] অপর দিকে দরূদ পাঠ না করে দো‘আ করলে তা আল্লাহর কাছে পৌঁছতে বাধাপ্রাপ্ত হয়। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,كُلُّ دُعَاءٍ مَحْجُوْبٌ حَتَّي يُصَلِّىَ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ‘প্রত্যেক দো‘আ দরূদ পাঠ না করা পর্যন্ত আড়াল করে রাখা হয়’।[35]

১২. বিপদগ্রস্ত ও আশাহত হওয়া থেকে রক্ষা :

রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করলে আল্লাহ বান্দাকে দুনিয়া ও আখেরাতে বিপদ ও আশাহত হওয়া থেকে রক্ষা করবেন। নবী করীম (ছাঃ) বলেন,مَا جَلَسَ قَوْمٌ مَجْلِسًا لَمْ يَذْكُرُوا اللهَ فِيْهِ وَلَمْ يُصَلُّّوا عَلَى نَبِيِّهِمْ إِلاَّ كَانَ عَلَيْهِمْ تِرَةً فَإِنْ شَاءَ عَذَّبَهُمْ وَإِنْ شَاءَ غَفَرَ لَهُمْ ‘কোন সম্প্রদায় কোন মজলিসে বসে যদি আল্লাহ তা‘আলার যিকর না করে এবং তাদের নবীর প্রতি দরূদ পাঠ না করে, তারা বিপদগ্রস্ত ও আশাহত হবে। আল্লাহ তা‘আলা চাইলে তাদেরকে শাস্তিও দিতে পারেন কিংবা মাফও করতে পারেন’।[36]

দরূদ পাঠ ছেড়ে দেয়ার ক্ষতি

নবী করীম (ছাঃ)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করা যেমন ফযীলতপূর্ণ কাজ, তেমনি তা ছেড়ে দেওয়াও অনেক ক্ষতির কারণ। নিমেণ কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে কয়েকটি ক্ষতিকর দিক উল্লেখ করা হ’ল।

১. আল্লাহ অপমানিত করবেন :

রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি দরূদ পাঠে অলস ব্যক্তিকে ইসলাম তিরস্কার করেছে এবং তিনি অপমানিত হবেন। রাসূল (ছাঃ) বলেন, رَغِمَ أَنْفُ رَجُلٍ ذُكِرْتُ عِنْدَهُ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيَّ ‘সেই ব্যক্তির নাসিকা ধূলায় ধূসরিত হোক (অপমানিত হোক), যার সামনে আমার নাম উচ্চারিত হয়েছে অথচ সে আমার উপর দরূদ পড়েনি’।[37]

অন্য হাদীছে এসেছে, একদা আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) মিম্বরে আরোহণ করলেন। প্রথম ধাপে উঠে বললেন, আমীন। অতঃপর দ্বিতীয় ধাপে উঠে বললেন, আমীন। অনুরূপ তৃতীয় ধাপেও উঠে বললেন, আমীন। অতঃপর তিনি (এর রহস্য ব্যক্ত করে) বললেন, আমার নিকট জিবরীল উপস্থিত হয়ে বললেন, হে মুহাম্মাদ! যে ব্যক্তি রামাযান পেল অথচ পাপমুক্ত হ’তে পারল না আল্লাহ তাকে তাঁর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেন। তখন আমি (প্রথম) আমীন বললাম। তিনি আবার বললেন, যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে অথবা তাদের একজনকে জীবিতাবস্থায় পেল অথচ তাকে জাহান্নামে যেতে হবে, আল্লাহ তাকেও তাঁর রহমত থেকে দূর করুন। এতে আমি আমীন বললাম। অতঃপর তিনি বললেন, যার নিকট আপনার (নাম) উল্লেখ করা হয় অথচ সে আপনার উপর দরূদ পাঠ করে না, আল্লাহ তাকেও দূর করুন। এতে আমি আমীন বললাম’।[38]

২. কৃপণ গণ্য হবে :

দরূদ পাঠে অলস ব্যক্তি আল্লাহর রহমত প্রাপ্তির পরিবর্তে আল্লাহর কাছে বখীল হিসাবে গণ্য হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, الْبَخِيْلُ الَّذِيْ مَنْ ذُكِرْتُ عِنْدَه فَلَمْ يُصَلِّ عَلَـيَّ، ‘সেই হচ্ছে কৃপণ, যার সামনে আমার নাম উচ্চারিত হয়েছে অথচ সে আমার উপর দরূদ পড়েনি’।[39] অন্যত্র রাসূল (ছাঃ) বলেন, আমি কি তোমাদেরকে বলে দেব না, সবচেয়ে বখীল কে? সকলে বলল, অবশ্যই হে আল্লাহ রাসূল! তিনি বললেন, যার নিকট আমার নাম উল্লেখ করা হ’ল, অথচ সে আমার প্রতি দরূদ পাঠ করল না। সেই হ’ল সবচেয়ে বড় কৃপণ’।[40] সুতরাং দরূদ পাঠের মাধ্যমে সে কৃপণতা থেকে মুক্ত হ’তে পারে।

৩. জান্নাতের পথ ভুলিয়ে দেয়া হবে :

রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি দরূদ পাঠ না করলে জান্নাতের পথ ভুলে যাবে। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ نَسِيَ الصَّلاةَ عَلَيَّ خَطِئَ طَرِيقَ الْجَنَّةِ، ‘যে ব্যক্তি আমার উপর দরূদ পাঠ করতে ভুল করল, সে আসলে জান্নাতের পথ ভুল করল’।[41] অন্যত্র তিনি বলেন,مَنْ ذُكِرْتَ عِنْدَهُ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيْكَ فَمَاتَ، فَدَخَلَ النَّارَ، فَأَبْعَدَهُ اللهُ، قُلْ : آمِيْنَ، قُلْتُ : آمِيْنَ ‘(জিব্রীল (আঃ) এসে বললেন) আপনি আমীন বলুন (এই কথার উপর) যার সামনে আপনার নাম উচ্চারিত হ’ল অথচ সে আপনার প্রতি দরূদ পাঠ করল না, অতঃপর মারা গেল। সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আর আল্লাহ তাকে তার রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দিবেন। জিব্রীল বললেন, আপনি আমীন বলুন! অতঃপর আমি আমীন (হে আল্লাহ! কবুল কর) বললাম’।[42]

৪. কিয়ামতের দিন দুঃখ-কষ্টে থাকার কারণ :

নবী করীম (ছাঃ)-এর উপরে দরূদ পাঠ করা না হ’লে পরকালে দুঃখ-কষ্টের মাঝে পতিত হ’তে হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, مَا قَعَدَ قَوْمٌ مَقْعَداً لاَ يَذْكُرُوْنَ اللهَ فِيْهِ، ويُصَلُّوْنَ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَّا كَانَ عَلَيْهِمْ حَسْرَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَإِنْ دَخَلُوا الْجَنَّةَ لِلثَّوَابِ ‘যখন কোন জাতি কোন বৈঠকে বসে আর সেখানে যদি তারা আল্লাহকে স্মরণ না করে ও নবী করীম (ছাঃ)-এর প্রতি দরূদ পাঠ না করে তাহ’লে তাদের জন্য ক্বিয়াতের দিন সেটি আফসোসের কারণ হবে, যদিও তারা পুরস্কার হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করে’।[43]

(চলবে)

 

[1]. বুখারী হা/৩৫৩৫; মুসলিম হা/২২৭৮।

[2]. বুখারী হা/৪৭৯৭-এর অংশ।

[3]. তাফসীরে কুরতুবী ১৪/২৩২; আল-মাউসূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ, (কুয়েত: ওয়াযারাতুল আওকাফ ওয়াশ শুঊনিল ইসলামিয়া, ২য় প্রকাশ ১৯৮৩), ২৭/২৩৪ পৃঃ।

[4]. বুখারী হা/১৪৯৭; মুসলিম হা/১০৭৮; আহমাদ হা/১৯১৩৩।

[5]. ইবনে ফারিস, মু‘জামু মাক্বায়িসিল লূগাহ, ৩/৩০০-৩০১ পৃঃ; গৃহীত: ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, রাহে বেলায়াত (৫ম প্রকাশ, ২০০৯) পৃঃ ১৪৯।

[6]. ড. মুহাম্মদ ফজলুর রহমান, আল-মু‘জামুল ওয়াফী (ঢাকা: রিয়াদ প্রকাশনী), পৃঃ ৪৭০।

[7]. বুখারী হা/৮৩৫, ১২০২; মুসলিম হা/৪০২; তিরমিযী হা/২৮৯; আবূদাঊদ হা/৯৬৮; ইবনু মাজাহ হা/৮৯৯।

[8]. তাফসীরে ইবনে কাছীর, সূরা আহযাব ৫৬ নং আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রঃ।

[9]. বুখারী হা/৪৭৯৭; মুসলিম, মিশকাত হা/৯১৯, রিয়াযুছ ছালেহীন হা/১৪০৫।

[10]. নাসাঈ হা/১২৯৫; ছহীহুল জামে‘ হা/৭১; মিশকাত হা/৯২৮।

[11]. মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন, শারহুল মুমতে‘ ৪/৩৪৭-৩৮৪ পৃঃ।

[12]. আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহমান আল-বাসসাম, তায়সীরুল আল্লাম শরহে উমদাতুল আহকাম, ১ম খন্ড (কুয়েত : জমঈয়াতু ইহয়াইত তুরাছ আল-ইসলামী, ১৯৯৪ খৃঃ/১৪১৪ হিঃ), পৃঃ ২৬৮।

[13]. আল-মাউসূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ, ২৭/২৩৪ পৃঃ।

[14]. ঐ, ২৭/২৩৫ পৃঃ।

[15]. মুসলিম হা/৪০৮; আবূদাঊদ হা/১৫৩০; নাসাঈ হা/১২৯৬; তিরমিযী হা/৪৮৫; মিশকাত হা/৯২১; রিয়াযুছ ছালেহীন হা/১৩৯৭।

[16]. নাসাঈ হা/১২৯৫; ছহীহুল জামে‘ হা/৭১; মিশকাত হা/৯২৮।

[17]. আহমাদ হা/১৬৬৪; হাকিম হা/২০১৯; মিশকাত হা/৯৩৭, হাদীছ হাসান।

[18]. ত্বাবারানী; ছহীহ আত-তারগীব হা/১৬৬২; মিশকাত হা/৯২৭।

[19]. ইবনু মাজাহ হা/৯০৭; ছহীহুল জামে‘ হা/৫৭৪৪, হাদীছ হাসান।

[20]. নাসাঈ হা/১২৯৭; মিশকাত হা/৯২২।

[21]. তিরমিযী হা/৪৮৪, রিয়াযুছ ছালেহীন হা/১৩৯৮; ছহীহ আত-তারগীব হা/১৬৬৮।

[22]. ইমাম ইসমাঈল বিন ইসহাক্ব আল-কাযী (১৯৯-২৮২ হিঃ) : ফাযলুছ ছালাত ‘আলান নাবী (ছাঃ), তাহক্বীক : আলবানী (বৈরূত : মাকতাবা ইসলামিয়া, ২য় প্রকাশ, ১৩৮৯ হিঃ ১৯৯৬ খৃঃ), পৃঃ ৫১, নং ৫০।

[23]. মুসলিম হা/৩৮৪; আবূদাঊদ হা/৫২৩; নাসাঈ হা/৬৭৮; তিরমিযী হা/৩৬১৪; মিশকাত হা/৬৫৭।

[24]. বায়হাক্বী; আস-সুনানুল কুবরা ৩/২৪৯; ছহীহ  তারগীব হা/১৬৭৩।

[25]. নাসাঈ হা/১২৮২; আহমাদ হা/৩৬৬৬, ৪২১০; ইবনে হিববান হা/৯১৪; ছহীহ  তারগীব হা/১৬৬৪।

[26]. ছহীহুল  জামে‘ হা/১২০৭ ।

[27]. ছহীহ  আত-তারগীব ও তাহযীব ২/২৯৬; হা/১৬৬৭।

[28]. আবূদাঊদ হা/২০৪২; মিশকাত হা/৯২৬; ছহীহুল জামে‘ হা/৭২২৬।

[29]. মুসলিম হা/৫৩২; ছহীহুল জামে‘ হা/২৪৪৫।

[30]. বুখারী হা/৪৩৫; মুসলিম হা/৫৩১; আহমাদ হা/১৮৮৪।

[31]. আবূদাউদ হা/২০৪১, হাদীছ হাসান।

[32]. তিরমিযী হা/২৪৫৭; ছহীহ আত-তারগীব হা/১৬৭০; মিশকাত হা/৯২৯।

[33]. সিলসিলা ছহীহা হা/৩২৬৮।

[34].  তিরমিযী হা/৫৯৩; মিশকাত হা/৯৩১।

[35]. আল-মু‘জামুল আওসাত্ব হা/৭২১; ছহীহুল জামে‘ হা/৪৫২৩; ছহীহাহ হা/২০৩৫।

[36]. তিরমিযী হা/৩৩৮০, হাদীছ ছহীহ।

[37]. তিরমিযী হা/৩৫৪৫; মিশকাত হা/৯২৭, রিয়াযুছ ছালেহীন হা/১৪০০।

[38]. ইবনে হিববান হা/৪০৯, ৯০৭; ছহীহ তারগীব হা/৯৮২।

[39]. তিরমিযী হা/৩৫৪৬; আহমাদ হা/১৭৩৫; মিশকাত হা/৯৩৩, রিয়াযুছ ছালেহীন হা/১৪০৩।

[40]. ছহীহ আত-তারগীব হা/১৬৮৪।

[41]. ইবনে মাজাহ হা/৯০৮; ছহীহ আত-তারগীব হা/১৬৮২।

[42]. ছহীহ ইবনে হিববান হা/২৩৮৭; ছহীহ আত-তারগীব হা/১৬৭৯।

[43]. হাকেম ১/৫৫০; মুসনাদে আহমাদ হা/৯৯৬৬; ছহীহাহ হা/৭৬ ।


মুহাম্মাদ আব্দুল ওয়াদূদ*
* তুলাগাঁও, দেবীদ্বার, কুমিল্লা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close