preloder
ইলম (ইসলামী জ্ঞান)

অপমান নয়, সম্মান চান?

যে পাঠক এই লেখা পড়ার তাওফীক লাভ করেছেন, তাঁকে বলছি।
আমার ধারণা, মহান আল্লাহ আপনার মঙ্গল চান।
সুতরাং আপনি কয়েক মিনিট সময় ব্যয় করে লেখাটি পড়ুন এবং অনুধাবন করুন।
আমি আপনাকে কয়েকটি উপদেশ দিচ্ছি, যদি আপনি তা মেনে চলেন, তাহলে আল্লাহ আপনার জন্য আকাশ-পৃথিবীর বরকত উন্মুক্ত করবেন। দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ দান করবেন এবং সুমহান সম্মানিত প্রতিপালক আপনাকে সম্মান দান করবেন।
বলছি, আপনি কুরআনকে আপনার জীবন-সাথী বানিয়ে নিন, নিত্য সঙ্গী হিসাবে তার সাহচর্যে থাকুন। ব্যস্ততার মাঝে সময় বের করে এবং অবসর সময়ে কুরআন পাঠ করুন। দেখে অথবা মুখস্থ পড়ুন। লম্বা সফরে যানবাহনে পড়ুন। পড়ার অসুবিধা থাকলে শুনুন। আর আজ-কাল তা খুবই সহজ।
আল্লাহর কসম! আপনি দেখবেন, আপনার সময়ে বরকত পাচ্ছেন। আপনার জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করছেন। হৃদয়ে স্বস্তি ও সুখ উপলব্ধি করছেন। আপনার চলার পথ আলোকিত হচ্ছে। বিশেষ করে যদি আপনি কুরআনের অর্থ হৃদয়ঙ্গম করে পাঠ করেন।
এ হলো সুমহান আল্লাহর বাণীর বরকত।
কুরআনের নিত্য সঙ্গী হন, আপনি এর বরকত জীবনের প্রতি মুহুর্তে লাভ করতে থাকবেন। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ} (29) سورة ص
`এটি একটি অত্যন্ত বরকতপূর্ন কিতাব, যা (হে মুহাম্মদ!) আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি.’ (স্বাদ ২৯)
কুরআন যেখানেই স্থানলাভ করে, সেই স্থানকেই বরকতময় করে তোলে।
একজন মুফাস্সির বলেছেন, `আমরা কুরআন নিয়ে ব্যস্ত হয়েছি, যার ফলে দুনিয়ার কল্যাণ ও বরকত আমাদেরকে পরিপ্লুত করেছে।’
জিয়া মাকদেসী যখন হাদিসের জ্ঞান অনুসন্ধানে ব্রতী হতে চাইলেন, তখন ইব্রাহিম বিন আব্দুল ওয়াহেদ মাকদেসী তাঁকে ওসিয়ত করে বলেছিলেন, `তুমি বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত কর এবং তা পরিহার করো না, তাহলে তুমি যা অনুসন্ধান করবে তা তোমার জন্য সেই পরিমান সহজ হয়ে যাবে, যে পরিমান তুমি তিলাওয়াত করবে।’
জিয়া বলেন, `আমি এই ওসিয়ত মেনে তার বহু ফললাভ করেছি। যত কুরআনের প্রতি ধ্যান দিয়েছি, তত হাদিসের জ্ঞান লাভ করেছি।’
একজন সালাফ বলেছেন, `যত আমি আমার নিয়মিত কুরআন পাঠের সময় বৃদ্ধি করেছি, তত আমি আমার সময়ে বরকত দেখতে পেয়েছি। আর আমি তা বৃদ্ধি করতে করতে ১০ পারা করে ফেলেছি।’
আব্দুল মালেক বিন উমাইর বলেছেন, `সবার চাইতে বেশি স্বচ্ছ ও পরিপক্ক জ্ঞানী ব্যক্তি তিনি, যিনি বেশি বেশি কুরআন অধ্যয়ন করে থাকেন।’
কুরতুবী বলেছেন, `যিনি কুরআন পাঠ করেন, তিনি জ্ঞান দ্বারা উপকৃত হতে থাকেন; যদিও তাঁর বয়স ১০০ বছর পৌঁছে যায়।’
আপনার তিলাওয়াতের সময় না হয়ে উঠলে কোনো পছন্দের কারীর তিলাওয়াত শুনতে থাকুন। আপনার বাড়ি ও গাড়িতে কুরআন বাজুক।
যেহেতু কুরআন শুনলে আপনাকে রহমত দিয়ে পুরস্কৃত করা হবে,করুণাপ্রাপ্ত হবেন আপনি। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُواْ لَهُ وَأَنصِتُواْ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ} (204) سورة الأعراف
`যখন কুরআন, তোমাদের সামনে পড়া হয়, তখন তা মনোযোগ সহকারে শোনো এবং নীরব থাকো, হয়তো তোমাদের প্রতিও রহমত বর্ষিত হবে৷ ‘ (আ’রাফ ২০৪)
আর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো কখনো অপরের মুখে তিলাওয়াত শুনতে ভালোবাসতেন, যদিও কুরআন তাঁর ওপরেই অবতীর্ণ হতো।
জেনে রাখবেন,আপনি যত বেশি পরিমাণ কুরআন শিখবেন,তিলাওয়াত করবেন,শুনবেন,মুখস্থ করবেন, মানে বুঝবেন,আমল করবেন,তত বেশি আপনার জন্য রহমত অবতীর্ণ হবে,তত বেশি আপনি শারীরিক ও হার্দিক আরোগ্য লাভ করবেন। আপনার মানসিক অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা দূর হবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاء وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ وَلاَ يَزِيدُ الظَّالِمِينَ إَلاَّ خَسَارًا} (82) سورة الإسراء
`আমি এ কুরআনের অবতরণ প্রক্রিয়ায় এমন সব বিষয় অবতীর্ণ করছি যা মুমিনদের জন্য নিরাময় ও রহমত এবং জালেমদের জন্য ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করে না৷'(বানী ইস্রাঈল ৮২)
ইবনুল জাওজী বলেন, `কুরআন তিলাওয়াত হার্দিক রোগে আরোগ্যের কাজ করে,যেমন দৈহিক রোগে মধু কাজ করে।’
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেন,`আমি আল্লাহ তায়ালার কিতাব অব্যাহতভাবে পড়া ছাড়া এমন কোনো জিনিস দেখিনি,যা বুদ্ধি ও আত্মাকে খোরাক বেশি জোগাতে পারে,শরীরকে নীরোগ রাখতে পারে এবং সুখ-শান্তির নিশ্চয়তা দান করতে পারে।’
মহানবী ——বলেছেন,
{اقرأوا القرآن فإنه يأتي يوم القيامة شفيعًا لأصحابه}
“তোমরা কুরআন পাঠ কর। কারণ তা কিয়ামতের দিন পাঠকারীদের জন্য সুপারিশকারীরূপে আবির্ভুত হবে। ” (মুসলিম ১৯১০ নং)
তাঁর এই বাণীতেই যদি বিশ্বাসী হন,তাহলে তা আপনার দিবারাত্রি কুরআন তিলাওয়াতে মগ্ন হওয়ার কারণ হিসাবে যথেষ্ট। কারণ বর্কতময় কুরআন কিয়ামতে আপনার জন্য সুপারিশ করবে। যেদিন আপনার মা,বাবা,সন্তান,ভাই ইত্যাদি আপনাকে দেখে পালিয়ে যাবে।
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
((يَجِيءُ الْقُرْآنُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ، فَيَقُولُ : يَا رَبِّ ، حَلِّهِ ، فَيُلْبَسُ تَاجَ الْكَرَامَةِ ، ثُمَّ يَقُولُ : يَا رَبِّ ، زِدْهُ ، فَيُلْبَسُ حُلَّةَ الْكَرَامَةِ ، ثُمَّ يَقُولُ : يَا رَبِّ ، ارْضَ عَنْهُ ، فَيَرْضَى عَنْهُ ، فَيُقَالُ لَهُ : اقْرَأْ وَارْقَ ، وَتُزَادُ بِكُلِّ آيَةٍ حَسَنَةً)).
`কুরআন ক্বিয়ামাত দিবসে হাযির হয়ে বলবে, হে আমার প্রভু! একে (কুরআনের বাহককে) অলংকার পরিয়ে দিন। তারপর তাকে সম্মান ও মর্যাদার মুকুট পরানো হবে। সে আবার বলবে,হে আমার প্রভু! তাকে আরো পোশাক দিন। সুতরাং তাকে মর্যাদার পোশাক পরানো হবে। সে আবার বলবে,হে আমার প্রভু! তার প্রতি সন্তুষ্ট হোন। কাজেই তিনি তার উপর সন্তুষ্ট হবেন। তারপর তাকে বলা হবে,তুমি এক এক আয়াত পাঠ করতে থাক এবং উপরের দিকে উঠতে থাক। এমনিভাবে প্রতি আয়াতের বিনিময়ে তার একটি করে সাওয়াব (মর্যাদা) বাড়ানো হবে।’ (তিরমিজি ২৯১৫নং)
কুরআন তিলাওয়াতকারীর জন্য এতটুকু খুশীর খবরই যথেষ্ট।
আর সতর্ক থাকুন,যাতে কোনোভাবে কুরআন থেকে দূরে সরে না যান। নচেৎ পরিণাম হবে ধ্বংস ও সর্বনাশ।
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَهُمْ يَنْهَوْنَ عَنْهُ وَيَنْأَوْنَ عَنْهُ }
`তারা এ মহাসত্যবাণী গ্রহণ করা থেকে লোকদেরকে বিরত রাখে এবং নিজেরাও এর কাছে থেকে দূরে পালায়৷’ আর তারপরই বলেছেন,
{ وَإِن يُهْلِكُونَ إِلاَّ أَنفُسَهُمْ وَمَا يَشْعُرُونَ} (26) سورة الأنعام
`অথচ আসলে তারা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংসের পথ প্রশস্ত করেছে৷ কিন্তু এটা তারা উপলব্ধি করে না৷’ (আনআম ২৬)
আল্লাহর কসম করে বলতে পারি, যারা কুরআন থেকে উদাসীন, যাদের কুরআনের সাথে কোনো সম্পর্ক রাখে না, তারা বিশাল ক্ষতিগ্রস্ত।
কুরআন-ওয়ালারা আল্লাহর বিশেষ লোক। আপনি তাঁদের দলভুক্ত হওয়ার চেষ্টা করুন। তাঁদের মজলিসে বসার চেষ্টা করুন। কারণ তাঁরা এমন সম্প্রদায়, যাঁদের সাথে উপবিষ্ট ব্যক্তি বঞ্চিত হয় না।
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ وَمَن يَبْخَلْ فَإِنَّمَا يَبْخَلُ عَن نَّفْسِهِ } (38) سورة محمد
`যারা কৃপণতা করে তারা প্রকৃতপক্ষে নিজের সাথেই কৃপণতা করছে৷’ (মুহাম্মদ ৩৮)
তিনি আরো বলেছেন,
{إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ لِّلْعَالَمِينَ (87) وَلَتَعْلَمُنَّ نَبَأَهُ بَعْدَ حِينٍ} (88) سورة ص
`এ তো একটি উপদেশ সমস্ত পৃথিবীবাসীর জন্য উপদেশ এবং সামান্য সময় অতিবাহিত হবার পরই এ সম্পর্কে তোমরা নিজেরাই জানতে পারবে৷ ‘ (স্বাদ ৮৭-৮৮)
হে আল্লাহ! তুমি কুরআনকে আমাদের হৃদয়ের বসন্ত কর। আমাদের বক্ষের জ্যোতি কর। আমাদের দুশ্চিন্তা দূর করার এবং উদ্বেগ চলে যাওয়ার কারণ বানিয়ে দাও। আর কিয়ামতে তাকে আমাদের জন্য সুপারিশকারী বানাও। আমীন।


সংগ্রহ ও ভাবানুবাদ : আব্দুল হামীদ আল-ফাইজি আল-মাদানী

Tags

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close