preloder
নির্বাচিত ফেসবুক স্ট্যাটাস

আমরা আল্লাহর এতো অবাধ্য হই। কিন্তু আল্লাহ তো আমাদেরকে শাস্তি দেন না! আসলে ব্যাপারটি কী?

একদিন এক ছাত্র তার শিক্ষককে জিজ্ঞাসা করলো, আমরা প্রতিদিন অসংখ্য গুনাহ করে যাচ্ছি, আল্লাহর আদেশ-নিষেধ অমান্য করে যাচ্ছি কিন্তু আল্লাহ তো আমাদের শাস্তি দিচ্ছেন না। এর কারণ কী? বা আল্লাহ এমন করছেন কেনো?

এই প্রশ্ন শুনে শিক্ষক উত্তর দিলেন, আচ্ছা, শোনো, আসলে আল্লাহ তোমাকে প্রতিনিয়ত শাস্তি দিয়ে যাচ্ছেন অথচ তুমি বুঝতেই পারছো না যে এটা শাস্তি। বুঝিয়ে বলি শোনো,

তুমি আগে আল্লাহর কাছে মুনাজাত করে যে মজা পেতে, যে স্বাদ অনুভব করতে এখন কি তা পাও? পাওনা। আল্লাহর অবাধ্যতা করতে করতে তোমার অন্তর শক্ত হয়ে গেছে। তাই তুমি শক্ত অন্তরে আল্লাহকে ডেকে বা আল্লাহর সাথে গোপনে কথা বলে, আল্লাহর কাছে দোয়া করে মজা পাও না।

জেনে রাখো, কারো আল্লাহর অবাধ্যতার কারণে তিনি যতগুলো বিপদ দ্বারা অবাধ্য ব্যক্তিকে পরীক্ষা করেন তার মধ্যে প্রধান পরীক্ষা হচ্ছে অবাধ্য ব্যক্তির অন্তর শক্ত হয়ে যাওয়া। তোমার অন্তর শক্ত হয়ে গেছে অথচ তুমি বুঝতেই পারছো না যে, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে তার অবাধ্যতার জন্য আসা বিপদ।

দুনিয়ার জীবনে বান্দা গুনাহের কারণে যতগুলো শাস্তির মুখোমুখি হয় তার মধ্যে অন্যতম প্রধান হচ্ছে, ভালো কাজ, কল্যাণকর কাজ, সাওয়াবের কাজ, আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজ করার সুযোগ, সামর্থ্য, যোগ্যতা, ইচ্ছা, ক্ষমতা কমে যাওয়া। আর গুনাহের কাজ সহজ হয়ে যাওয়া, গুনাহের কাজ করে লজ্জিত না হওয়া, কোনো অপরাধবোধ না করা। গুনাহ করতে করতে অন্তর শক্ত হয়ে গেলে সেই অন্তর আর ভালো কাজ করতে চায় না, ইবাদাতে মনোযোগ দিতে পারে না। গুনাহের কাজে মজা পেয়ে যায়। গুনাহের কাজ আর তার কাছে খারাপ লাগে না। এটি বাস্তব ও সত্য কথা।

শিক্ষক ছাত্রকে উদ্দেশ্য করে আবারো বললেন, তোমার জীবনে কি এমন অনেক দিন চলে যায়নি যে দিনগুলোতে তুমি কুরআন তেলাওয়াত করতে পারো নি? সব কাজ করেছো তুমি কিন্তু কুরআন তেলাওয়াত করার সময় হয়নি তোমার- এমন হয়নি? হয়েছে। অথচ তুমি আগে যখন এতো গুনাহে লিপ্ত ছিলে না তখন নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত করতে। কখনো তুমি কুরআনের এই আয়াতটিও শুনেছো যেখানে আল্লাহ বলছেন, “আমরা যদি এই কুরআনকে পাহাড়ের উপরেও অবতীর্ণ করতাম তাহলে তুমি পাহাড়কে দেখতে আল্লাহর ভয়ে সে বিনীত হয়ে ফেটে পড়তো”। [সূরা আল-হাশরঃ ২১]

এই আয়াত শোনার পরও তোমার মধ্যে কোনো প্রভাব তৈরি হয় না! মনে হচ্ছে যেনো তুমি কিছু শোনোইনি! নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত করতে না পারা এবং কুরআনের কোনো আয়াত তোমার মনের ওপরে কোনো প্রভাব বিস্তার না করা, কোনো পরিবর্তন না আনা, তোমার ভাবান্তর না ঘটা, এটাও তোমার পাপের শাস্তি। অথচ তুমি হয়তো বুঝতেই পারছো না যে এটাও এক প্রকাশ শাস্তি!

আচ্ছা, আরেকটা শাস্তির কথা বলি, তোমার জীবনে দীর্ঘ দীর্ঘ রাত অতিবাহিত হয়ে গেছে (যেমন শীতকালে এখন যাচ্ছে) অথচ তুমি শেষ রাতে বা রাতের একটি অংশে কিয়ামুল্লাইল (তাহাজ্জুদ বা রাতের নফল সলাত) আদায় করা থেকে বঞ্চিত হয়েছো। এতো দীর্ঘ রাত পাওয়ার পরেও তুমি সপ্তাহে অন্তত একদিনও আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কাটাতে পারো নি। শেষরাতে আল্লাহর কাছে দুহাত তুলে কিংবা সাজদায় জায়নামাজে কপাল ঠেকিয়ে কেঁদে বুক ভাসাতে পারো নি। প্রথম আসমানে এসে যখন তোমার রব তোমাকে ডেকে বলে, ক্ষমা চাও। ক্ষমা করে দেবো। তখন তুমি গভীর ঘুমে বিভোর। এই বঞ্চনাই তোমার পাপের শাস্তি। অথচ তুমি বুঝতেই পারছো না!

তোমার জীবন থেকে ভালো কাজ করার অনেকগুলো মৌসুম চলে গেলো, যেমন, রমাযান গেলো, শাওয়ালের ছয়টি সিয়াম গেলো, যিলহাজ্জ মাসের প্রথম দশদিনের ইবাদাতের ভরা মৌসুম গেলো, অথচ তুমি এইসব মৌসুমগুলো থেকে যেভাবে উপকৃত হওয়ার কথা ছিলো তা হতে পারোনি। এটাও তোমার আল্লাহর অবাধ্যতার শাস্তি। অথচ তুমি হয়তো বুঝতেই পারছো না যে এটি শাস্তি!

এই যে ভালো ভালো অসংখ্য ফযীলতের কাজ করা থেকে বঞ্চিত হয়েছো, এর থেকে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে?
তুমি কি অনুভব করো না যে, ইদানিং তোমার ওপরে আল্লাহর আনুগত্যমূলক কাজগুলো, ইবাদাতগুলো কঠিন ও কষ্টকর মনে হচ্ছে? আগে পাঁচ ওয়াক্ত সলাত মসজিদে গিয়ে আদায় করলেও এখন পারো না। ফজরের সলাতে উঠতে পারো না। আগে দান সদাকা নিয়মিত করলেও এখন করো না। এগুলো কি খেয়াল করেছো?

তুমি গুনাহে লিপ্ত হওয়ার পর থেকে তোমার মুখ থেকে আগের মত আল্লাহর যিকর বের হয় না, এটি কি তুমি খেয়াল করেছো?
আগে তোমার মন ও কুপ্রবৃত্তি তোমাকে কিছু বললেই তুমি তার কথা শুনতে না। তুমি নিজেকে শক্ত করে মনের ও কুপ্রবৃত্তির কামনা থেকে দূরে রাখতে। কিন্তু এখন তুমি সহজেই তোমার মনের খারাপ ইচ্ছা ও কুপ্রবৃত্তির কাছে আত্মসমর্পণ করছো। তোমার ভেতরের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে, তোমার ঈমান দুর্বল হয়ে গেছে, তা কি তুমি অনুভব করছো না?

অর্থসম্পদ, সম্মান ও খ্যাতির প্রতি তোমার আগে তেমন ভালোবাসা না থাকলেও ইদানিং এগুলোর প্রতি তোমার ভালোবাসা অনেক বেড়ে গেছে। এখন তুমিও টাকাপয়সা, সম্মান ও খ্যাতির পেছনে দৌড়াও। তুমিও সেলিব্রেটি হতে চাও। এগুলো তোমাকে পরীক্ষায় ফেলেছে, তা কি তুমি খেয়াল করছো না?

তুমি কি এখন দুনিয়ার বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিখ্যাত অভিনেতা, খেলোয়ার, সেলিব্রেটি আর পর্নস্টার আর মডেলদের খবরের পেছনে লেগে থাকো না সারাক্ষণ? তারা কে কী করলো? কোথায় গেলো? কী খেলো? তাদের বিয়ের আগের বাচ্চা কয়টা, বিয়ের পরে কয়টা? সব তোমার নখদর্পণে। অথচ তুমি আলিম, ইসলামিক পারসোনালিটি, উত্তম আদর্শ হওয়ার মত মানুষদের কোনো খোঁজই রাখো না। অথচ এদের খোঁজখবর রাখলে তা তোমার সাওয়াব অর্জনের উপায় হতে পারতো।

এর থেকে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে? এর থেকে ব্যাপক শাস্তি আর কী হতে পারে?

আরেকটা বিষয় তোমাকে বলি, তুমি ছোটবেলায় তো গীবত, চোগলখুরি করতে না, মিথ্যা কথা বলতে না। কিন্তু এখন এগুলো তোমার কাছে পান্তাভাত! হরহামেশা করে যাচ্ছো। এগুলো তোমার জন্য সহজ হয়ে গেছে। এগুলো শাস্তি ছাড়া আর কি?

যে সব কাজে তোমার অনুপ্রবেশ কোনো দরকার ছিলো না, যে সব কাজে তোমার ব্যস্ত হওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিলো না, যেসব কাজ তোমার কোনো উপকারে আসবে না সেসব কাজে কি তুমি ব্যস্ত হয়ে পড়েছো না?

তুমি কি আখিরাতকে ভুলে যাও নি? তোমার কাছে কি এখন দুনিয়ার বিভিন্ন বিষয় যেগুলোর সাথে আখিরাতের সম্পর্ক নেই সেগুলো সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় নি?

এই যে অপমান, বঞ্চনা, অপদস্ততা- এগুলোই আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা বহুরূপী শাস্তির কয়েকটি রূপ মাত্র।

শিক্ষক শেষে তার ছাত্রকে বললেন, প্রিয় ছাত্র আমার! অর্থসম্পদের ক্ষতি অথবা সন্তান-সন্তদি বা পরিবারের ক্ষতি কিংবা স্বাস্থ্যের ক্ষতির মাধ্যমে অর্থাৎ যেসব শাস্তি তুমি শারীরিকভাবে, আর্থিকভাবে বা দৃশ্যমানভাবে অনুভব করতে পারো সেসবের মাধ্যমে তোমাকে যে শাস্তি দেয়া হয় সেটি আল্লাহর শাস্তিগুলোর মধ্যে সহজতম শাস্তি। আল্লাহর শাস্তিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ও কঠিন শাস্তি হচ্ছে সেসব শাস্তি যা অন্তরের ওপর দিয়ে যায়। বাহির থেকে দেখা যায় না, অনুভবও করা যায় না। কত ভয়াবহ সেই শাস্তি!

আমরা বসে আছি আমরা এতো গুনাহ করার পরেও আল্লাহ কেনো আমাদেরকে শাস্তি দিচ্ছেন না। অথচ আমরাদের ওপর দিয়ে শাস্তির বন্যা বয়ে যাচ্ছে কিন্তু আমরা টেরই পাচ্ছি না। এর টের না পাওয়াটা আরো বড় শাস্তি। টের পেলে তো ফিরে আসা যায়। টের না পেলে শাস্তির মধ্যে হাবুডুবু খেতে থাকবো কিন্তু ভাববো আল্লাহ তো শাস্তি দিচ্ছেন না?

এই লেখাটি যদি আমাদেরকে একটু টের পাওয়ায়, সেই আশায়…

আমি আমার নিজেকে সহ সবাইকে নসীহত করছি, আসুন! সেই শাস্তি থেকে বাঁচি যে শাস্তি অনুভব করা যায় না। কারণ এই শাস্তি সেই শাস্তি থেকে ভয়াবহ যে শাস্তি অনুভব করা যায়।


এই লেখাটির মূলভাব শাইখ ড. আলী মুহাম্মাদ আস-সাল্লাবী (হাফিযাহুল্লাহ)

-এর ফেসবুক পেইজ থেকে নিয়ে নিজের মত করে লিখেছেন। Shahadat Faysal

উৎস:সত্যের অন্বেষন  ফেসবুক ওয়াল থেকে

Tags

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close