preloder
নির্বাচিত ফেসবুক স্ট্যাটাস

আগামীকাল কী খাবো?

আমরা দুনিয়ার জীবনে সুন্দরভাবে বাঁচার জন্য যতগুলো বিষয় নিয়ে খুব বেশি ভাবি, চিন্তিত হই, দুশ্চিন্তা করি, সেগুলোর মধ্যে প্রথম দিকে আছে খাওয়ার চিন্তা। কাল কী খাবো, কালকের খাবার ফ্রিজে থাকলে পরশু কী খাবো সেই চিন্তা। দুচার দিনের খাবার মজুদ থাকলে আগামী মাসে কী খাবো, কীভাবে সংসার চলবে, কীভাবে পরিবারের সদস্যরা খাবে? মেহমান আসলে কী খাবে?

এসব স্বাভাবিক চিন্তা মুহুর্তের মধ্যে দুশ্চিন্তায় রূপান্তরিত হয়ে যায় শুধু একটি কারণে। সেই কারণটি হচ্ছে, আগামীকালের রিযিক বা খাওয়ার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব যে মহান আল্লাহর সেই আল্লাহর ওপর আমাদের ভরসা কমে গেছে। আমরা আল্লাহকে বিশ্বাস করি, তিনি আমাদের বানিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন, মৃত্যু দেবেন, তিনি রিযিকদাতা- আমাদের খাদ্যের ব্যবস্থাও তিনি করেন তা আমরা জানি কিন্তু আমরা বাস্তব জীবনে সংকটে পড়লে আমরা তা ভুলে যাই।

রিযিক নিয়ে চিন্তা সবারই কমবেশি আছে। থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের চিন্তাগুলো স্বাভাবিক না থেকে তা দুশ্চিন্তায় রূপান্তরিত হওয়ায় আমরা একটুতেই হতাশ হয়ে পড়ি। রিযিকের ব্যাপারে কুরআনের আয়াতগুলো আর হাদীসগুলো যদি একজায়গায় করে আমরা মনোযোগ দিয়ে পড়তাম তাহলে আমাদের অন্তত রিযিক নিয়ে এই দুশ্চিন্তা কমতো। কারো কারো থাকতোই না।

আমি দুয়েকটা আয়াত আপনাদের সাথে শেয়ার করি। আল্লাহ কুরআনে একাধিক জায়গায় বলেছেন, তিনি যাকে চান তাকে বিনা হিসাবে রিযিক দান করেন।[সূরা বাকারাহঃ ২১২, আলে ইমরানঃ ৩৭] আল্লাহ রিযিক দেন, তিনিই রিযিকের মালিক- এসব কথা আল্লাহ কুরআনের অসংখ্য জায়গায় বলেছেন।

জাহিলী যুগে কিছু মানুষ ছিলো যারা ভাবতো, সন্তান হলে কী খাওয়াবে? সন্তানরা তাদের সাথে খাওয়ায় ভাগ বসাবে এই ভয়ে তারা তাদের সন্তানদের হত্যা করতো। এখনো দেখা যায় অনেকেই বেশি সন্তান নিতে ভয় পায় এই জন্য শুধু যে, তাকে খাওয়াবে কীভাবে? তার কাছে তো যে সম্পদ আছে তাতে যারা পরিবারের সদস্য হিসাবে আছে তাদেরই খাওয়ানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে, নিজেরাই ঠিক মতো খেতে পারছি না, আবার আরেকজন সন্তান আসলে তাকে কী খাওয়াবো?

এই চিন্তায় আধুনিক যুগের সভ্য অনেক পরিবার সন্তান মায়ের পেটেই নষ্ট করে দেয় বিশেষ করে মেয়ে বাচ্চা। অথচ সন্তানকে খাওয়ানোর ভয়ে সন্তানকে নষ্ট করে ফেলা বা সন্তান নিতে না চাওয়া জাহিলী নীতি। এই নীতিকে চরমভাবে আঘাত করে আল্লাহ আয়াত অবতীর্ণ করেছেন। তিনি বলেছেন, “তোমরা তোমাদের সন্তানদের দারিদ্যের ভয়ে হত্যা করো না। আমি তাদেরকেও রিযিকের ব্যবস্থা করবো, তোমাদেরও”। [সূরা বানী ইসরাঈলঃ ৩১] অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, “আমরা তোমাদেরকেও রিযিক দেবো এবং তাদেরকেও দেবো”। [সূরা আন’আমঃ ১৫১]

এই আয়াতদুটি স্পস্টভাবে বলে দিচ্ছে, আল্লাহ এমন রিযিকদাতা, তিনি অনাগত সন্তানদের রিযিকের ব্যবস্থাও করবেন। আর সে ব্যবস্থা তোমাদের রিযিক থেকে নিয়ে না বরং তোমাদের জন্য রিযিকের আলাদা বরাদ্দ থাকবে। তোমাদের কারো রিযিকের জন্য দুশ্চিন্তা করতে হবে না।

রিযিকের ব্যাপারে একটা হাদীস যেদিন থেকে পড়েছি এবং বুঝেছি সেদিন থেকে মাথা থেকে রিযিকের দুশ্চিন্তা যতটুকু ছিলো তাও দূর হয়ে গেছে। আশা করি আপনাদেরও যাদের রিযিক নিয়ে দুশ্চিন্তা আছে তাদের জন্য এই হাদীসটি একটি বড় আশার খুশির উপায় হতে পারে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যদি তোমরা সত্যিকারভাবে আল্লাহর উপরে ভরসা করতে তাহলে তোমাদেরকে সেভাবে রিযিক দেয়া হতো যেভাবে পাখিদেরকে রিযিক দেয়া হয়। পাখিরা সকালবেলা খালি পেটে বের হয়ে যায় আর সন্ধাবেলায় ভরা পেটে নীড়ে ফিরে আসে”। [জামি তিরমিযীঃ ২৩৪৪]

এই হাদীসটি আবার পড়ুন। দেখুন আল্লাহ তার ওপরে ভরসাকারীদেরকে কিভাবে রিযিক দেয়ার ওয়াদা করেছেন। আমরা দেখি, পাখিরা বনজঙ্গলে থাকে, লোকালয়েও থাকে, সেখানেই থাকুক তারা সকাল বেলা খালি পেতে খাবারের সন্ধানে বের হয়ে যায়।

তাদের জন্য কেউ বনে জঙ্গলে রান্না করে খাবার রেখে আসেনি, কেউ তাদের জন্য খাবার রান্না করে বাড়ির ছাদেও রেখে আসে নি, বাড়ির সামনেও ছিটিয়ে দেয়নি, এই পাখপাখালি, জীব-জানোয়ারদের খাবারের জন্য দেশের খাদ্য মন্ত্রণালয় কিংবা বিশ্ব খাদ্য সংস্থাও কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তাহলে প্রতিদিন স্থলভাগের অসংখ্য পশু-পাখি আর পানির মধ্যের অগণিত জলজ প্রাণী কীভাবে বেঁচে আছে? কে তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করছে প্রতিদিন?

অবশ্যই কোনো মানুষ নয়। মানুষের নিয়ন্ত্রণের কোনো সংস্থা নয়। এইসব প্রাণীর রিযিকের ব্যবস্থা প্রতিদিন করে দিচ্ছেন বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহ সুবহানু ওয়া তাআলা। তিনি যেভাবে এই হাজার কোটি পশুপাখির রিযিকের ব্যবস্থা করেন সেভাবেই দুনিয়ার এই সাতশ কোটি মানুষের রিযিকের ব্যবস্থা করেন। এটি আল্লাহর কাছে কোনো ব্যাপারই না।

আল্লাহ শুধু তার ওপরে সত্যিকারের জন্য ভরসা করতে বলেছেন। ভরসা মানে কোনো উপায় অবলম্বন না করে ঘরে বসে থেকে ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করা নয়। সত্যিকারের ভরসা মানে সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করার পর এর ফলাফলের জন্য আল্লাহর দিকে চেয়ে থাকা। পাখিরা কিন্তু সকাল বেলা নীড় থেকে খালি পেটে বের হয়। ঘরে বসে থাকে না। বের হয়ে এগাছ থেকে ওগাছে। এই জায়গা থেকে ঐ জায়গায়। ছুড়ে বেড়ায় আর উড়ে বেড়ায়। এরই মাঝে আল্লাহ তাদের রিযিকের ব্যবস্থা করে দেন। শুধু তাদেরই না বরং তাদের বাসায় যদি তাদের বাচ্চারা থাকে তাহলে তাদের জন্যও রিযিকের ব্যবস্থা আল্লাহ করে দেন, যা তারা মুখে নিয়ে বাসায় ফেরে।

রিযিকের সাথে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় জড়িত। সেটি হচ্ছে রিযিক অন্বেষণ ও উপার্জনের সময় অবশ্যই দেখতে হবে রিযিকটি হালাল কিনা এবং হালাল উপায়ে অর্জিত হচ্ছে কিনা। কিয়ামতের আগে একটা সময় আসবে যখন উপার্জন হালাল না হারাম তা বাছবিচার করবে না বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভবিষ্যতবাণী করেছেন। আজকে দেখতেও পাচ্ছি তাই। মানুষ হালাল-হারামের তোয়াক্কাই করছে না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাযী হাজীসাহেবও আয়-উপার্জনের সময় সুদ-ঘুষসহ হালাল-হারামের বাছবিচার করছেনই না। করলেই অনেকটা শিথিল। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে হালাল ছাড়া কিছু খাওয়া কোনো মুসলিমের জন্য জায়েয নয়। তাই আমাদের অবশ্য কর্তব্য, সবসময় হালাল রিযিক তালাশ করা এবং তাই খাওয়া ও পরিবারকে খাওয়ানো।

অনেকেই মনে করে রিযিকের সাথে মনে হয় দৈহিক শক্তির অনেক সম্পর্ক। শক্তিশালী হলেই রিযিক পাবো, নয়তো পাবো না। এ কথা সঠিক নয়। শারীরিক শক্তির কারণে যদি কেউ রিযিক পেতো তাহলে ছোট্ট চড়ুই পাখি কখনো রিযিক পেতো না আর বিশালদেহী শক্তিশালী তিমি, হাতি কিংবা সিংহ কখনো না খেয়ে থাকতো না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, চড়ুই রিযিক পায় যদিও তার দেহ ছোট, শক্তিও কম, অপরদিকে শক্তিশালী সিংহও মাঝে মাঝে না খেয়ে থাকে দিনের পর দিন। তাই শারীরিক শক্তির মাধ্যমে রিযিক বন্টিত হয় না। রিযিক বন্টিত হয় সাত আসমানের উপর থেকে।

সারা দুনিয়ার মানুষ মিলেও যদি আপনার রিযিক বন্ধ করতে চায় আল্লাহ না চাইলে কেউ পারবে না আর আল্লাহ রিযিক দিতে না চাইলে সারা দুনিয়ার মানুষ মিলেও আপনাকে এক লোকমা খাবার খাওয়াতে পারবে না। রিযিকের মালিক তো আল্লাহ। তিনিই রিযিক বণ্টন করেন। এই বণ্টনে কোনো মানুষের হাত নেই। তাই মানুষ চাইলেই আপনার রিযিক বন্ধ করতে পারবে না আবার মানুষ চাইলেই আপনার রিযিকের ব্যবস্থাও করে দিতে পারবে না। তাই রিযিক বন্ধে মানুষের কোনো হুমকিতে কান দেয়ারও দরকার নেই আবার কেউ যদি বলে “আমি আপনাদের খাদ্যের ব্যবস্থা করেছি” সে কথায়ও উচ্ছ্বসিত হওয়ার কিছু নেই।

আমরা রিযিকের জন্য মানুষের পেছনে দৌড়াই। আমাদের দৌড়াদৌড়ি দেখলে মনে হবে, মানুষই মনে হয় রিযিকের মালিক। অথচ আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, “তোমরা আল্লাহর কাছে রিযিক তালাশ করো এবং তারই ইবাদাত করো”। [সূরা আনকাবূতঃ ১৭] আল্লাহর কাছে যেমন রিযিক চাইতে হবে তেমনি মাঠেঘাটে যেখানে রিযিক পাওয়ার সম্ভাবনা আছে সেখানে গিয়ে চেষ্টা করতে হবে।

আল্লাহ কারো রিযিকের ব্যবস্থা করে রেখেছেন সমুদ্রের মাঝে, আবার কারো রিযিকের ব্যবস্থা করে রেখেছেন লোকালয়ে অফিস-আদালতে। কারোটা করে রেখেছেন দেশের মাটিতে, কারোরটা বিদেশে। যেখানে যার রিযিক আছে আল্লাহ সেখানে তাকে নিয়ে যাবেন। যার জন্য যতটুকু রিযিক বরাদ্দ আছে তা ভোগ না করে সে মৃত্যুবরণ করবে না। তাই রিযিক হারাবার ভয় কিসের?

চলুন, রিযিকের পেছনে দৌড়ানোর সাথে সাথে রিযিকের মালিকের পেছনেও দৌড়াই। আর রাযযাক আল্লাহর ওপরে সত্যিকারের ভরসা রাখি। তিনিই রিযিকের মালিক। তিনিই আমাকে-আপনাকে সবাইকে রিযিক দিবেন।


উৎসঃ Shahadat Faysal ফেসবুক ওয়াল থেকে

Tags

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close