preloder
মৃত্যু | কবর | কিয়ামত | জাহান্নাম | জান্নাত

আমি যদি এখন মারা যাই…

আমার ইদানিং খুব মনে হয় আমি যদি আজ এখন এই অবস্থায় মারা যাই তাহলে কি জান্নাতে যেতে পারবো? চিন্তা করে দেখি, কিছু ভালোকাজ তো করেছি। সেগুলো আল্লাহ কবুল করলে তো জান্নাত পেতেই পারি। আবার গুনাহের দিকে যখন তাকাই তখন মনে হয়, আল্লাহ মাফ না করলে জাহান্নাম ছাড়া কোনো পথ নাই। আল্লাহ মাফ করবেন তো? (আল্লাহুম্মাগফিরলী)

আমি তো জানি, আমি কী ভালো করেছি আর কী খারাপ করেছি। নিজেরটা সবাই জানে। তারপরেও অন্যারটা নিয়ে ব্যস্ত থাকে সবাই। মাঝে মাঝে ভাবি, আমি যে গুনাহগুলো করেছি তা তো নিশ্চিত পাপ ছিলো। এই পাপগুলো তো লেখা হয়েছে। অবশ্য সেই পাপগুলো থেকে তো তাওবা-ইস্তিগফারও করেছি, করছি, করতে থাকবো। কিন্তু আমার করা তাওবা-ইস্তিগফার কি আল্লাহ কবুল করেছেন? এর কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? নাই। তাহলে কিসের আশায় নির্ভয়ে আছি? তবে নির্ভয়ে থাকার সুযোগ না থাকলেও আশায় থাকার সুযোগ শেষ হয়ে যায়নি। আল্লাহ মাফ করবেন। মাফ করার অসংখ্য উপায় তিনি তৈরি করে দিয়েছেন। দুনিয়ায় যতগুলো পাপ আছে তার চেয়ে মাফের উপায় বেশি। এমনকি একটি মাফের উপায় দিয়ে সারাজীবনের সব গুনাহ মাফ হয়ে যেতে পারে। আবার আল্লাহ চাইলে কোনো উপায় ছাড়াই আমাকে মাফ করে পারেন। তাই ভেবে আশাবাদী হই।

আরেকটা ভাবনা খুব ভাবি, আমি মারা যাওয়ার পর পৃথিবীর মানুষ আমাকে কি মনে রাখবে? রাখলে কিভাবে রাখবে? আমি তো সমাজে ভালো মানুষ হিসাবে পরিচিত। পাবলিকের চোখের সামনে তো খারাপ কিছু করছি না। যা খারাপ করি তা সবচেয়ে ভালো জানেন আল্লাহ আর জানি আমি আর জানে যার বা যাদের সাথে খারাপ কাজ করি সে বা তারা। তাহলে মানুষ তো আমাকে ভালো হিসাবেই মনে রাখবে বলে আশা করতে পারি। মানুষ কি আমার জন্য দোয়া করবে? মনে অনেককেই অনেকে রাখে। কিন্তু সবাই তো সবার দোয়া পায় না। আমি যদি মারা যাওয়ার পর মানুষের দোয়া না পাই তাহলে কী করলাম এই জীবনে? পাবো তো মানুষের দোয়া?

ইদানিং যা-ই করি তাতেই রিয়ার ভয় লাগে। রিয়ার ভয়ে অনেক ভালো কাজ করতে গিয়েও করা হয় না। জানি এটাও এক ধরনের ধোঁকা কিন্তু শেষমেশ মাঝে মাঝে ধোঁকাতেই পড়ে যাই। তবুও ভয়, আশা আর ভালোবাসা মিলিয়ে কিছু করে যাই। দান করতে গেলেই মনে হয় কেউ যেনো দেখছে। ভালো কথা বলতে গেলেই মনে হয়, আমি মনে হয় শ্রোতার মনোরঞ্জনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির চেয়ে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি। কোনো এক সালাফ বলেছিলেন, “তুমি যখন মানুষের সামনে কথা বলবে তখন যদি অনুভব করো যে তোমার মধ্যে আত্মতৃপ্তি চলে এসেছে তখন তুমি চুপ হয়ে যাবে। আবার যখন তোমার কাছে চুপ হয়ে যাওয়াটা আত্মতৃপ্তি নিয়ে আসবে, মনে হবে চুপ থেকে তুমি বুজর্গ হয়ে গেছো, তখন আবার কথা বলা শুরু করবে”। সালাফদের ইখলাসের কাহিনীগুলো যখন পড়ি তখন মনে হয় আমরা ইখলাসের ধারেকাছেও নাই। আমাদের ইবাদাতে তাদের তুলনায় ইখলাস ৫/১০ শতাংশের বেশি হবে না। এই ইখলাস নিয়ে কিভাবে নাজাতের স্বপ্ন দেখি?!

মাঝে মাঝে নিজেকে মুনাফিক মুনাফিক মনে হয়। মনে হয় আমার মধ্যে নিফাকী আছে। আছেও তো! আমি ওয়াদা দিয়ে ওয়াদা সবসময় রক্ষা করতে পারছি না, আমানতের খিয়ানত তো করছি, ফজর ও ইশার সলাতে গাফলতি তো বিরল না, মিথ্যা কথা সবসময় না বললেও একেবারে যে বলি না তা হলফ করে বলা কঠিন। আরেকজনকে যখন মুনাফিক আখ্যা দিয়ে গালি দিতে যাই তখন যে আমিও মুনাফিকের গুণ ধারণ করে ফেলছি তার হুশ তো আমার থাকে না। কী হবে আমার উপায়?

মনে হয় কি, আল্লাহ তো বলেছেন যে, মাফ করবেন। কিন্তু যদি কোনো কারণে মাফ না করেন তাহলে কী হবে? ঐ হাদীসটাও আমাকে বেশ চিন্তাগ্রস্ত করে, যে হাদীসের ভাবার্থ এরকম, একজন সারাজীবন ভালো কাজ করে কিন্তু মৃত্যুবরণ করে জাহান্নামের কাজ করে আবার কেউ একজন সারাজীবন খারাপ কাজ করে জান্নাতের কাজ করে মারা যায়। দ্বিতীয়জন তো সৌভাগ্যবান কিন্তু প্রথমজন যদি আমি হই? (নাঊযুবিল্লাহ)

আমরা আমল করার প্রতি যতটা আগ্রহী আমল কবুলের ব্যাপারে ততটা আগ্রহী না। অথচ সালাফরা আমলের ব্যাপারে যতটা আগ্রহী ছিলেন তাদের সেই আমল কবুল হওয়ার ব্যাপারেও অনেক আগ্রহী ও চিন্তিত ছিলেন। যেমন অনেক সালাফ রমাযান মাস শেষ হওয়ার পরের ছয়মাস রমাযানের ইবাদাত কবুল হওয়ার জন্য দোয়া করতেন। আর আমরা তো রমাযান শেষ তো মনে করছি, আল্লাহর ঠেকা পড়েছে আমার আমল কবুল করবেনই। সলাতের সালামটা ফিরিয়েই দৌড়। মনে হয় বিমান ছেড়ে দিচ্ছে। আল্লাহ সলাত আদায় করতে বলেছেন, করেছি। আল্লাহ তো কবুল করবেনই- এমন ভাব আমাদের। আল্লাহর কোনো ঠেকা পড়েনি। ঠেকা আমাদের। তাই আমাদের উচিত আমল করা আর আমল কবুলের জন্য দোয়া করা। অন্য আমল কবুলের জন্য তো দোয়া করতেই হবে এমনকি দোয়া কবুলের জন্যও দোয়া করতে হয়, যার শিক্ষা আমরা সূরা ফাতিহা শেষে আমীন বলার মাধ্যমে পাই।

আল্লাহর রহমতের কথা ভাবলে, চিন্তা দূর হয়। আবার হিসাবের কথা ভাবলে কপালে ঘাম জমে যায়। কবরের একাকীত্বের কথা ভাবলে শুধু কান্নাই আসে। শুধু ভাবনায় আসে, এক মুহুর্তের জন্যও কবরের আযাব, জাহান্নামের আযাব সইতে পারবো না। তবুও কিসের ভরসায় পাপ করেই যাচ্ছি। কোনো ভরসা না থাকলেও আশা আছে আল্লাহ মাফ করবেন। তবে সেই আশায় সবসময় পাপ করে যাওয়া বোকামী ছাড়া কিছুই না।

দুই দিনের এই দুনিয়া আজ কিংবা কাজ ছেড়ে যেতেই হবে। আমি মারা যাওয়ার পর দুচারদিন মানুষ মনে রাখবে। স্মৃতিচারণ করবে। কোনো ভালো কাজ রেখে যেতে না পারলে কবরে শুয়ে কিছুই পাবো না আর। দুনিয়ায় থাকতে যা করে গিয়েছি তাই সাথী। কিন্তু মারা যাওয়ার পরেও যদি কিছু কবরে শুয়ে পাওয়া যেতো তাহলে কতই না ভালো হতো! তাই চাই জীবনে এমন কিছু করতে যাতে মৃত্যুর পরেও আমল বন্ধ না হয়।

রঙের এই দুনিয়া আপনাকে ব্যবহার করছে মাত্র। আপনি যে কয়দিন দুনিয়াকে দিতে পারবেন সে কয় দিন আপনার মূল্য দুনিয়াবাসীর কাছে। আপনি অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়লেই কিংবা মারা গেলেই আর কেউ মনেও করবে না। কত বড় বড় দাপুটে মানুষগুলোকে দেখছি একাকী নিঃসঙ্গ অবস্থায় হাসপাতালের বিছানায় কিংবা নিজের বাড়ির বেডরুমে ধুঁকে ধুঁকে মরতে। তারপরও আমাদের দুনিয়ার মায়া কমে না। দুনিয়ার মেকি রূপ-সৌন্দর্যের মোহ আমাদেরকে নিকট ভবিষ্যতে আল্লাহর সামনে দাঁড়াবার কথা ভুলিয়ে দিয়েছে। আফসোস!

এই লেখার আমি শুধু আমি নই, তুমিও
এই লেখার তুমি শুধু তুমি নও, আমিও।।


উৎস: শাহাদাৎ হুসাইন খান ফয়সাল ভাইয়ের ফেসবুক ওয়াল থেকে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close