preloder
বিবিধ বিষয়

আমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না

আমরা এই দুনিয়ায় একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য কত চেষ্টাই না করি। প্রত্যেকে প্রত্যেকের ইচ্ছা, যোগ্যতা, চাহিদা, দক্ষতা, সুযোগ, সামর্থ অনুযায়ী কিছু কাজ করি। কখনো কখনো আমরা কিছুদূর গিয়ে হতাশ হয়ে কিংবা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে থেমে যাই। মনে মনে বলি “আমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না!”

আচ্ছা, আপনাকে দিয়ে যদি কিছুই না হয় তাহলে আল্লাহ আপনাকে সৃষ্টি করেছেন কেনো? আল্লাহ কি এমনি এমনি আপনাকে এই দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন? উত্তরে বলবেন, “না, তা হবে কেনো? অবশ্যই আল্লাহর কোনো ইচ্ছা, পরিকল্পনা আছে আমাকে পাঠানোর পেছনে।” হ্যা, আছে। একটি হচ্ছে তার ইবাদাত করা আরেকটি হচ্ছে তার ইবাদাতের জন্য এই দুনিয়ায় সুন্দরভাবে বাঁচার জন্য কিছু করানো।

আপনি কী পড়বেন, কী করবেন, পেশা হিসাবে কোনটাকে গ্রহণ করবেন সে বিষয়ে আল্লাহ আপনাকে স্বাধীনতা দিয়েছেন। সেই স্বাধীনতা ভোগ করার জন্য কিছু নীতিমালাও দিয়ে দিয়েছেন। আপনি সেই নীতিমালা জেনে, মেনে কাজ করে যাবেন এটাই আল্লাহ চান। আপনি যে কাজের উপযুক্ত আল্লাহ আপনার জন্য সেই কাজ সহজ করে দেবেন। কখনো কোনো কাজ করতে গিয়ে আপনার মনে হতে পারে, “আরে, এত্ত কঠিন কাজ আমি করবো কিভাবে?” এমন মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক না। কিন্তু অস্বাভাবিক হচ্ছে এমন মনে হলে সেই মনে হওয়াটাকে চিরস্থায়ী ধরে নিয়ে হাত গুটিয়ে নেয়া বা হতাশ হয়ে যাওয়া।

আমরা ছোটবেলা থেকেই নীতিবাক্য হিসাবে কয়েকটা কথা শুনে এসেছি। যেমন, “Industry is the key of success অর্থাৎ পরিশ্রমই সৌভাগ্যের প্রসূতি”, “Failure is the pillar of success অর্থাৎ ব্যর্থতা সফলতার ভিত্তি”, “পারিব না- এ কথাটি বলিও না আর, একবার না পারিলে দেখো শতবার”। এরকম বাক্য আরো আছে। এগুলো কি আসলেই শুধু নীতিবাক্য? নাকি এগুলোর কোনো বাস্তবতা আছে? এগুলোর বাস্তবতা আছে। কিন্তু আমরা এগুলোকে শুধু নীতিবাক্য হিসাবে আওড়াই। বিশ্বাস করি না। বিশ্বাস করলেও কর্মে বাস্তবায়ন না করে বিশ্বাসের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করি।

এই দুনিয়ায় পরিশ্রম আর লেগে থাকা ছাড়া কেউ কিছু করেছে বলে জানি না। যদিও ইংলিশ কবি শেকসপিয়ার বলেছিলেন, “মানুষ তিন ধরনের: এক ধরনের মানুষ মহান হয়েই জন্মায় (যেমন রাজপরিবারের সদস্য), আরেক ধরনের মানুষ মহৎ হওয়ার যোগ্যতা জন্মের পরে অর্জন করে, আরেক ধরনের মানুষের ওপর মহত্ব চাপিয়ে দেয়া হয়।”

এই তিন প্রকার মানুষের মধ্যে মধ্যম প্রকারের মানুষই দুনিয়ায় বেশি। যারা মহত্ত্ব অর্জন করে। কুঁড়েঘরে কিংবা কৃষকের ঘরে জন্ম নিয়ে জীবনে সফল হয়েছে। এ রকম দৃষ্টান্ত দুনিয়াজোড়া ভরা। এদের জীবনী পড়ে দেখুন, এদের কেউই নাকে শরীষা তেল দিয়ে ঘুমিয়ে কিংবা বন্ধু, আড্ডা, গান আর মুভি নিয়ে ব্যস্ত থেকে কিছু করেনি। কিছু করেছে চেষ্টা আর পরিশ্রম দিয়ে।

অন্যের সাফল্য দেখে আপনার হিংসা লাগে, ঈর্ষা লাগে। কিন্তু তার মত কষ্ট করতে আপনার ইচ্ছে হয় না। সবাই শুধু কষ্ট না করে শর্টকাট পথে সফলতা চায়। আবার অনেকে একটু কষ্ট করেই মনে করে দুনিয়ার সবচে বেশি কষ্ট তিনিই করেছেন। তারপরও সফলতা কেনো তার পায়ে চুমু খাচ্ছে না। তাকেই যখন জিজ্ঞাসা করবেন, ভাই বা আপু! আপনার দিন শুরু হয় কখন? উনি বুক ফুলিয়ে বলে উঠবেন হয়তো, “এইতো আটটায়”। কেউ নয়টা বা দশটার কথা বললেও অবাক হবেন না।

দিন শুরু হওয়ার শুরুতেই কয়েক ঘণ্টা অপচয় করে আমরা সফলতা খুঁজি। কয়েকদিন আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্তের একটা বক্তব্যে শুনছিলাম, তিনি বলছিলেন যে, ফজরের আযানের শব্দের মাধ্যমে তার ঘুম ভাঙে এবং তখন উঠেই তিনি তার দিনের কাজ শুরু করেন। তার বক্তব্য এখানে উল্লেখ করলাম এই জন্য যে, একজন হিন্দু মানুষ ফজরের আযান শুনে ঘুম থেকে উঠে দিনের কাজ শুরু করেন। আর আপনি-আমি মুসলিম হওয়ার পরও ফজরে হয়তো উঠি না, উঠলেও ফজরের পরে আবার কয়েক ঘণ্টার ঘুম! আশ্চর্য!!! এভাবে দিনের শুরুতে কয়েকঘণ্টা সময় অপচয় করে সফল হওয়া যায় না।

অনেকেই একটুতেই আপসেট হয়ে পড়েন। মনে হয় আল্লাহ আপনার জন্য চেষ্টার যে সামর্থ দিয়েছেন তার সবটুকু দিয়ে আপনি চেষ্টা করে এবার হাত গুটিয়ে নিয়েছেন। আসলে কি তাই? না। আপনি আপনার মেধার খুব ক্ষুদ্রাংশ ব্যবহার করছেন। অধিকাংশ মেধা অবসরে আছে। আপনার শারীরিক ক্ষমতার অনেকটাই হয়তো অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।

একটিবার ভেবে দেখুন, ইসলাম প্রচারের শুরুতে কী কষ্ট, কী বাধা, কী অনুৎসাহই না মোকাবেলা করতে হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবীদের। কিন্তু তারা কি দমে গেছেন? রেখে দিয়েছেন তাদের দায়িত্ব? বলেছেন কি যে, “আর পারবো না, আমাকে দিয়ে হবে না”? না, তারা বলেন নি। ইসলাম কাজকে ভালোবাসে। নবীগণের কমন পেশা ছিলো ছাগল চড়ানো। আপনাকে এখন ছাগল চড়ানোর দায়িত্ব দিলে তো নাক ছিটকে ওপাশে পড়বেন আর বলবেন, আমি গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেছি কি এই কাজ করার জন্য? আমার অফিসার লেভেলের কাজ চাই। আপনি চাইতেই পারেন। তবে চাওয়াটা কতটা বাস্তবসম্মত সেটাও আপনার ভেবে দেখা উচিত।

যারা সদ্য গ্রাজুয়েশন শেষ করেই হাই প্রফাইলের চাকরি খোঁজেন আর লো প্রোফাইলের কোনো কাজ করবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে কয়েক বছর যাবত বেকার আছেন তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের পাশাপাশি একটা পরামর্শ দিতে পারি, “হালাল যে কোনো চাকরি পেলে ঢুকে যান। সময় সুযোগ অনুযায়ী অন্যত্র মুভ করিয়েন। আল্লাহ আপনাকে যে যোগ্যতা অর্জনের তাওফীক দিয়েছেন সেই যোগ্যতামত না হলেও এর কাছাকাছি কোনো কাজের ব্যবস্থা তিনি আপনার জন্য করবেন। শুধু একটু সময়ের ফের।” পরামর্শটি খুব ভালো লাগেনি জানি। তবুও দিলাম। নিজের জীবন থেকে দিলাম।

আজ আর না বলি। শেষে শুধু এতটুকু বলি, আল্লাহর মত শক্তিশালী রবের ওপরে যাদের পূর্ণ বিশ্বাস আছে তারা কখনো হতাশ হতে পারে না। হতাশা মুমিন জীবনের বৈশিষ্ট নয়। হতাশা শয়তানের প্রধান অস্ত্র। সে সব সময় চায় মুমিনকে হতাশ করতে। একবার হতাশ করতে পারলেই হলো। তাহলেই মুমিন গুনাহ থেকেও তাওবা করবে না আর চেষ্টা পরিশ্রমও কমিয়ে দেবে। এর মাধ্যমে শয়তান সফল হয় আর মুমিন হয় ব্যর্থ।


উৎস: শাহাদাৎ হুসাইন খান ফয়সাল রাহিমাহুল্লাহ ভাইয়ের ফেসবুক ওয়াল থেকে

Tags

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close