preloder
বিবিধ বিষয়

আমি যদি বিড়ালটির মত হতাম!

আজ বাসায় ফেরার পথে আজমপুর থেকে রিক্সা নিয়ে বাসায় আসছি পথে হঠাৎ কাবাব ফ্যাক্টরি মোড় পার হতে না হতেই দেখলাম রাস্তার মাঝে পড়ে আছে থেঁতলে যাওয়া একটি বিড়ালের দেহাবশেষ। একটি মৃত্যুই ছিলো সেটি। কিন্তু এই মৃত্যুটা আমাকে বেশ ভাবাচ্ছে, তোলপাড় করছে আমার অন্তর্জগত। তাই সেই বিড়ালটি নিয়েই দু’টি কথা।

কখনো নিজের চোখে গাড়ির চাকার নিচে পড়ে পিশে থেঁতলে যাওয়া মানবদেহ দেখিনি। তবে প্রতিদিনই টিভির স্ক্রলে কিংবা পত্রিকার ডিজিটাল ভার্শনে চোখে পড়ে দেশের কোথাও না কোথায় পিশে কালো পিচের সাথে মিশে গেছে রক্ত আর নরম মাংস। কারো বা হয়তো মগজ বের হয়ে ছিটকে পড়ে আছে রাস্তার পাশে। কারো বা নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে রক্তের বাধের ব্যবস্থা করেছে।

হয়তো কয়েক সেকেন্ড আগেও বিড়ালটি জানতো না সে দুনিয়া থেকে চলে যাচ্ছে। তার থেঁতলে যাওয়া শরীরটাকে শক্ত পিচঢালা পথের সাথে মিশিয়ে দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দিতে সাঁইসাঁই গতিতে ছুটে চলা গাড়িগুলো কয়েক মিনিট সময় নেবে হয়তো। হারিয়ে যাবে বিড়ালটির ইতিহাস।

আচ্ছা, বিড়ালটি কেনো এভাবে মারা পড়লো? ও কি আত্মহত্যা করেছে? ওর মনে কি কোনো দুঃখ, কষ্ট ছিলো? ওর জীবনে কি হতাশা বাসা বেধেছিলো? মনে হয়, ও ওর বাসায় রাগারাগি করে মাথা গরম করে রাস্তা পার হচ্ছিলো!

আচ্ছা! ওর বাসায় কে কে আছে? ওর কি পরিবার আছে? মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী কিংবা স্বামী-সন্তান? সবাই এখনো কি ওর বাসায় ফেরার জন্য অপেক্ষা করছে? ও হয়তো ওর পরিবারের একমাত্র উপার্জনোক্ষম সদস্য। ওর পরিবার কি ওর মৃত্যুর খবর জেনেছে? না জানলে এখনো অপেক্ষায় আছে ঘরে ফিরবে বলে।

আচ্ছা! এমনো তো হতে পারে, ওর কেউ নেই এই দুনিয়ায়। রাস্তার পাশেই বড় হওয়া, রাস্তার পাশের ফার্স্টফুডের দোকান বা হোটেলের পেছনের ঝুটা খেয়েই ওর বেড়ে ওঠা। কখনো মুদির দোকানে ঢুকলে মালিকের লাঠির বারি ওকে হয়তো মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আতঙ্কিত করে রেখেছিলো। হয়তো সেই আতঙ্ক নিয়েই রাস্তা পার হচ্ছিলো। কী জানি!?

বিড়ালটার মনে কি কোনো অভিমান ছিলো? ছিলো কি কোনো রাগ, জিদ কিংবা ভালোবাসা? থাকতেও পারে। আবার নাও থাকতে পারে। থাকার সম্ভাবনা বেশি। কারণ ওরা মানুষের সাথেই বড় হয়। তাই মানুষের কিছু স্বভাব পেলে তো আর অবাক হওয়া যায় না!

বিড়ালটার গায়ের রং ছিলো কালো। ওর গায়ের রং নিয়ে কি ওর কোনো কষ্ট ছিলো? কেউ কি ওকে কিছু বলেছে? নাহ! ওকে কেউ এসব বললেও ও এসব মাথায় নেয় না। তবে ওর একটা বিষয়ে খুব রিজার্ভেশন ছিলো, সেটা হচ্ছে ও কাউকে সহজে কিছু বলতো না। মনের কষ্ট মনেই কবর। কখনো কাদতো ও। ওর কান্নায় আওয়াজ হতো না।

হয়তো ভাবছেন, বিড়ালটা সম্পর্কে এতকিছু জানলাম কিভাবে? বলছি, জেনেছি না, ধারণা করেছি। বিড়ালটাকে দেখে নিজেকে ওখানে শুইয়ে কল্পনা করছিলাম। আমাকেও না জানি কখন পেছন থেকে একটি বিশাল ট্রাক এসে পিশে দিয়ে নিমেশেই হারিয়ে যায়। কিছু লোক হায় হায় করে আমাকে তুলে নিয়ে হাসপাতালে রওয়ানা দেবে, কেউ কেউ হয়তো সেলফি তুলবে আমার লাশের সাথে, কেউবা হয়তো পকেট থেকে মোবাইল নিয়ে সর্বশেষ ডায়াল কল দেখে ফোন দেবে।

পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব জেনে আহাজারি করবে। গোসল দিয়ে জানাযা পড়িয়ে দাফন কাফনের ব্যবস্থা করবে কেউ কেউ। কেউ কেউ ফেসবুকে স্টাটাস দিবে……. ইত্যাদি লিখে লিখে। আমিও একদিন ঐ বিড়ালটির মত হারিয়ে যাবো। আমার জান্নাতে গিয়ে আল্লাহর কাছে দেখতে চাইতে ইচ্ছে হয় যে, আমি মারা যাওয়ার পরের ঘটনাগুলো কিভাবে কিভাবে ঘটেছে। কে কেমন করেছে।

বিড়ালটির দেহ হয়তো এতক্ষণে রাস্তার সাথে মিশে গেছে। ওর পরিবার হয়তো কখনই জানবে না ওর নির্মম এই পরিণতির কথা। হয়তো আশায় আশায় থাকবে ওর প্রিয়জন।

ইশ! বিড়ালের মত হতো জীবনটা। দেয়া লাগতো না কোনো হিসাব। একদিন বাসের চাপায় মরে যেতাম। রুহটা উড়ে যেতো যেখানে যাওয়ার। কাদতো না কেউ। জানতোও না হয়তো কেউ। হতো না শোকসভা কিংবা করতো না কেউ আহাজারি। আহা! যদি বিড়াল হতাম!


উৎস: শাহাদাৎ হুসাইন খান ফয়সাল রাহিমাহুল্লাহ ভাইয়ের ফেসবুক ওয়াল থেকে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close