preloder
বিবিধ বিষয়

যে জীবন মরিচিকা !

.🔸এক,

দুপুরবেলা ভাত খাচ্ছিলাম, হঠাৎ নজর পড়ল একটা পিঁপড়ার উপর, দেখলাম পিঁপড়াটা একটা ভাত নিয়ে অনেক কষ্ট করছে! হয়ত প্রাথমিক লক্ষ্য এই ভাতটাকে কোনমতে টেনে টুনে তার গন্তব্য পৌঁছানো। কিন্তু অনেক্ষণ ধরে লক্ষ্য করলাম পিঁপড়াটি একা বেশিদূর এগুতে পারছে না!

একটু পর পর দেখছি কতদুর গেল!
আমিও খাচ্ছি, ‘পিঁপড়া’টাও টানছে…

খাওয়া শেষ আমি উঠে যাবো, ঠিক তখনি একটা মুরগী এসে ভাত’টিতো খেলোই ‘,সাথে পিঁপড়া’টাও খেয়ে ফেলল!!!

হায় আল্লাহ! এই পিঁপড়াটিও আমাদের মত পরিশ্রম করে তার পরিবার-পরিজনের আহার যোগাড় করতে চেয়েছে! কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার গন্তব্যে পৌঁছতে পারলো না! ঠিক, এই পিঁপড়ার মত আমরাও আমাদের রিযিক সংগ্রহের জন্য জানপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
অনেক লম্বা লম্বা আশা অন্তরে পুষে রেখেছি! শেষ বয়সে একটু আরামে থাকার আশায়, অভাব দুরিকরণে কিংবা অর্থনৈতিক সচ্ছলতার তাগিদে অথবা মা-বাবা,ভাই-বোন,স্ত্রী -সন্তানদের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য হাজারো মাইল দূরে পাড়ি জমাচ্ছি! এই রিযিক এর পিছনে ছুটতে ছুটতে কখন জানি “মালাকুল মউত” এসে খাপাস করে ধরে টপাস করে নিয়ে যায় সেদিকে আমাদের বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই!
.

আমি ঐ মানুষটাকে দেখে যারপরনাই আশ্চর্য হই, যে’কিনা এই দুনিয়াতে কত দুঃখে- কষ্টে দিনাতিপাত করছে, আবার পরকালের সুখ-শান্তির জন্যেও কোন সঞ্চয় করছে না! আফসোস!
তাইতো ইমাম মালিক ইবনে দিনার (রাহিমাহুল্লাহ) বলতেন –
“আপনি দুনিয়া নিয়ে যে পরিমাণ উদ্বেগ করবেন, আপনার অন্তর থেকে আখিরাতের সচেতনতা সেই পরিমাণে দূর হয়ে যাবে। আপনি আখিরাত নিয়ে যে পরিমাণে সচেতন থাকবেন, সে পরিমাণ দুনিয়ার উদ্বেগ আপনার অন্তর থেকে দূর হয়ে যাবে।”
📚 [আয যুহদ: ইবনে আবি আদ-দুনিয়া, ৬৭]
.

🔸দুই,

হাই স্কুল লাইফে আমাদের ‘ধর্মীয় শিক্ষক’ ছিলেন
স্যার আব্দুল কারিম ( রাহিমাহুল্লাহ)। স্যারের মত মোখলেস মানুষ লাইফে খুব কমই দেখেছি! টিফিনের সময়ে ছাত্রদের জোর জবরদস্তি করে নামাযে নিয়ে যেতেন এবং নিজের ইমামতিতে যোহরের নামায পড়াতেন! খুব দুষ্ট ছেলেটিও উনার ক্লাসে নিরব শ্রোতা হয়ে যেত! কথার জাদুকর এই শিক্ষক (রাহিমাহুল্লাহ)- জীবনের শেষ ক্লাসে “মৃত্যু” নিয়ে আমাদের সামনে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা পেশ করেন! বিদায় বেলায় ছাত্রদের নাসীহাত করে বলেন, “দেখো বাবারা! এই দুনিয়া জীবনকে নিজ অন্তরে অতটুকু ধারণ করিও, যতটুকু পানি ধারণ করলে একটি নৌকা সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় থাকে! যদি এর বিপরীত কর অর্থাৎ দুনিয়ার মৌহ তোমার অন্তরকে পুরোপুরি গিলে ফেলে, তাহলে জেনে রেখো : তুমি হবে সেই নৌকার মত, যেই নৌকা অধিক পানি ধারণ করার কারণে একটা সময়ে সমুদ্রের তলদেশে ডুবে যায়! দুনিয়াদারী কর, তবে আখিরাতকে বরবাদ করিও না”!
.
কে জানতো, এটাই হবে আমাদের সাথে স্যারের শেষ মোলাকাত! হঠাৎ অসুস্থ অত:পর চির-বিদায়!
যে চেয়ারে তিনি বসতেন সেটা আজ অন্যকারো দখলে!
যে সাবজেক্ট তিনি পড়াতেন সেটা আজ অন্যকেউ পড়ায়! ‘কারো জন্য কোনোকিছু থেমে থাকেনা’
এটাই নির্মম বাস্তবতা! যে মানুষটা সারাদিন এত ব্যস্ত সময় পার করতেন, মৃত্যুর একটা ঝাপটা তার সকল ব্যস্ততার অবসান ঘটিয়ে দিল! আহা! কত দ্রুত মানুষটা হারিয়ে গেলেন কিন্তু তার শুন্যতা কি আমরা আজ অনুভব করি!?

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ ) বলতেন –

“দুনিয়া হলো, পতিতা নারীর মতো, যে একজন স্বামীর সাথে স্থির থাকে না; বরং একাধিক স্বামী তালাশ করে, তাদের সাথে আরো বেশি ভালো থাকার আশায়। ফলে সে বহুচারিনী হওয়া ব্যতীত সন্তুষ্ট থাকে না!

দুনিয়ার পিছনে ছুটে চলা হলো হিংস্র জানোয়ারের চরণভূমিতে বিচরণ করা, এতে সাঁতার কাটা মানে কুমিরের পুকুরে সাঁতার কাটা, দুনিয়ার দ্বারা আনন্দিত হওয়া মানে নিশ্চিত দুশ্চিন্তায় পতিত হওয়া, এর ব্যাথা-বেদনাগুলো এর স্বাদ থেকেই সৃষ্টি হয়, এর দুঃখ – কষ্টগুলো এর আনন্দ থেকে সৃষ্টি হয়।”
[মুখতাসারুল ফাওয়ায়িদ, ইসলাম হাউস ডট কম, ৩১,৩২ পৃ]।

🔸তিন,

এই দুনিয়া জীবন হল পরকালের পাথেয় যোগাড় করার একটা মাধ্যম মাত্র! তাকিয়ে দেখুন ঐ কবরবাসীর দিকে, যারা প্রতিনিয়ত আহাজারি করে বলছে, হে আমাদের রব! আমাদেরকে আরেকবার সুযোগ দিন! তারপরেও কেন আপনার হুঁশ ফিরেনা!? দেহ থেকে প্রাণটা বেরিয়ে গেলেই তো দুনিয়াবাসীর নিকটে আপনার প্রয়োজন শেষ! আপনার লাশটা তখন আপনারই ক্রয়কৃত খাটে রাখতে দিবেনা আপনার প্রিয়মুখগুলি! তারপরেও কিসের মৌহে এই তুচ্ছ দুনিয়াকে কামড়ে ধরে রেখেছেন!?

প্রিয়নবী মুহাম্মদূর রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
আদম সন্তানের বয়স বাড়ে আর তার সঙ্গে দু’টি জিনিসও বাড়ে :
এক, ধন-মালের প্রতি ভালবাসা!
দুই, দীর্ঘ বয়সের আশা!
📚[ মুসলিম ১২/৩৮, হাঃ ১০৪৭ ]
.

রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও বলেছেন,
“আদম সন্তানের মালিকানায় যদি সোনার একটি উপত্যকাও হয়, তবুও সে অনুরূপ আরো একটির মালিক হওয়ার অভিলাষী থাকবে। পরন্তু একমাত্র মাটিই আদম সন্তানের চোখ (পেট) পূর্ণ করতে পারে। অবশ্য যে ব্যক্তি তওবা করবে, আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করবেন।’[ বুখারী ৬৪৩৭, মুসলিম ২৪৬২ ]
.

আল্লাহর রাসূল ﷺ আরও বলেছেন,
“তুমি দুনিয়াতে এমনভাবে বসবাস করো , যেন তুমি একজন অপরিচিত বা মুসাফির!’ যে কিনা পথিমধ্যে কোন একটি বৃক্ষের নিচে একটু বিশ্রাম নিয়েই
আবার নিজ গন্তব্যের দিকে ছুটলো!
📚 [সহীহ বুখারীঃ ৬৪১৬, তিরমিযীঃ ২৩৩৩]
.

আফসোস! কিসের অপরিচিত আর কিসের মুসাফির!
আমরা তো একেবারে জমে ক্ষীর!
খুঁজে ফিরি ধন-সম্পদ, গাড়ী, নারী আর শান্তির নীড় ! এগুলোর দিকেই আমাদের নজর তাক করা সুক্ষ্ণ তীর!


আপনাদের শুভাকাঙ্ক্ষী,
আখতার বিন আমীর ভাই এর ফেইসবুক পেজ থেকে

#ShotterDikeAhobban

Tags

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close