preloder
বিবিধ বিষয়

ইন শাআল্লাহ

আরবী পরিভাষায় একটি কথা আছে, যাকে বলা হয়, ‘তাকাল্লুফ’। ইংরেজিতে সম্ভবতঃ overact, affectation বা mannerism বলা হতে পারে। বাংলায় কষ্টকল্পনা, স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সাধ্যাতীত কর্ম করা, কোন শব্দ উচ্চারণে অতিরঞ্জন করা বা অস্বাভাবিক ধ্বনি করা ইত্যাদি।
আমরা ছাত্র জীবনে যখন প্রথম প্রথম আরবী অক্ষর উচ্চারণ করতে শিখি, বিশেষ ক’রে ক্বিরাআত বা তাজবীদ অধ্যয়ন ও অভ্যাস করি, তখন ওস্তাদদের মুখে ঐ ‘তাকাল্লুফ’ শব্দটা খুব শুনতাম। বড় ক্বাফ, বড় হা, আইন, য্বাদ প্রভৃতি উচ্চারণ করার সময় আমাদের বড় তাকাল্লুফ হতো। যেহেতু আরবী অনুরূপ বহু বর্ণের প্রতিবর্ণ নেই।
শিক্ষার শুরুতে নবীনদের এমন হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু অনেকের বাড়াবাড়ি ক’রে সেটাকে অন্যের ঘাড়েও চাপানো এবং অন্যদের ঠিকটাকেও ভুল প্রতীয়মান করাটা স্বাভাবিক আচরণ নয়।
বহুদিন থেকে ফেসবুকে একটা পোস্ট দেখে আসছি, ‘ইন শাআল্লাহ’ বলা বা লেখা যাবে না, ‘ইং শাআল্লাহ’ বলতে বা লিখতে হবে। এ কথা সদ্য ও নব্য তাজবীদ শিক্ষার্থীদের তাকাল্লুফ। যাঁরা নিজেদের সাধারণ কথাবার্তাতেও তাজবীদের নিয়ম-নীতি চালাতে উদ্বুদ্ধ হয় এবং কথায় কথায় অন্যদের আরবী উচ্চারণে খুঁত ধরে বেড়ায়।
এ মর্মে ছাত্র-জীবনে ওস্তাদদের নিকট একটা গল্প শুনেছিলাম। তখন সবচেয়ে কঠিন উচ্চারিতব্য অক্ষর ‘য্বাদ’-এর অনুশীলন চলছিল। একদা উস্তাদজী একজন ছোট ছাত্রকে বাড়িতে পাঠালেন তাঁর স্ত্রীর খবর নিতে। ছাত্রটি এসে উস্তাদজীকে খবর দিয়ে জানাল, ‘হদরত! আপকী বিবি কে উপার মরদ সওয়ার হ্যায়।’
মাথা গরম ক’রে উস্তাদজী বাড়িতে গিয়ে দেখলেন, স্ত্রী অসুস্থ। ফিরে এসে ছাত্রকে বললেন, ‘বেওকুফ মুতাকাল্লিফ কাহিঁকার! তুমনে মরয না বোলকে মরদ বোলা?’
ছাত্রটি বলল, ‘উস্তাদজী! য্বাদ কা তালাফফুয তো এ্যায়সা হি হ্যায় না? রামাদান, রাদিয়াল্লাহ, অলাদ দাল্লীন?’
আশা করি, তাকাল্লুফ কাকে বলে তা সঠিক অনুমান করতে পেরেছেন।
‘ইং শাআল্লাহ’ শব্দকে ইংরেজিতে লিখলে ing shaallah লিখতে হয়। আর তাতে উচ্চারণে যে ‘গ’ ধ্বনিটা বাংলা বা ইংরেজিতে আসে, সেটা কোন তাজবীদে আছে?
বলা বাহুল্য, ‘ইং শাআল্লাহ; নয়, ইন শাআল্লাহ’ই লিখতে হবে। কথাবার্তায় তাজবীদের নিয়ম মেনে চলা ‘তাকাল্লুফ’ যেমন ইখফা করতে গিয়ে ‘গ’ শব্দের অতিরিক্তি ধ্বনি উচ্চারণ করাও ‘তাকাল্লুফ’।
অনুরূপ এ মর্মে আরো একটি পোস্ট নজরে পড়ে এবং সে নিয়ে বারবার জিজ্ঞাসিত হই। ‘ইনশাআল্লাহ’ বা inshaallah এক সাথে লিখবেন না। কারণ তাতে অর্থ হয়ে যায়, ‘আল্লাহকে সৃষ্টি কর!’
এমন অনুবাদও নবীন শিক্ষার্থীদের তাকাল্লুফ মাত্র।
কারণ, আলাদাভাবে লিখলেও উচ্চারণ যদি একই করা হয়, তাহলে মানে তাই থাকে।
আরবীতে نشأ ينشأ (নাশাআ-য়্যানশাউ)এর মানে হয় সৃষ্টি হওয়া, জন্ম নেওয়া, প্রতিপালিত হওয়া ইত্যাদি। এই ধাতুর আমরের সীগা (আদেশসূচক) শব্দ হয়, إنشأ (ইনশা’) মানে সৃষ্টি হও। আর তার পর আল্লাহ শব্দ যোগ হলে সঠিক উচ্চারণে হয়ে যায় إِنشَأِ الله (ইনশাইল্লাহ)। মেনে নিলাম বাতহার আরবীতে উচ্চারণ হয়, ‘ইনশা’আল্লাহ’। কিন্তু তার মানে হয়, ‘আল্লাহ সৃষ্টি হও। আল্লাহকে সৃষ্টি কর’ নয়।
ঐ ধাতু থেকে ‘আল্লাহকে সৃষ্টি কর’-এর আরবী হবে أنشأ ينشئ (আনশাআ-য়্যুনশিউ) থেকে أَنشِأِ الله (আনশিইল্লাহ)। সুতরাং ‘তাকাল্লুফ’ যে স্পষ্ট তা বলাই বাহুল্য।
তবুও এ কথা ঠিক যে, তিনটি শব্দকে পৃথক ক’রে লেখাই উত্তম। অবশ্য ‘শাআল্লাহ’ এক সাথে লিখলে দোষ হবে না বা খুঁতেদের খুঁত ধরার অবকাশ থাকবে না ইন শাআল্লাহ।
সঠিক উচ্চারণ শেখা ভালো, তবে তাতে বাড়াবাড়ি করা অবশ্যই ভালো নয়। যেমন সঠিক উচ্চারণ না শিখে যারা ‘ইনশাল্লা, সালামালায়কুম’ ইত্যাদি উচ্চারণ করেন বা লেখেন এবং অনুরূপ উচ্চারণ নিয়ে নামায বা স্বালাত আদায় করেন, তাঁরা সতর্ক হন। তাহলে পরকালে ফাঁসার হাত থেকে মুক্তি পাবেন ইন শাআল্লাহ।


বিনীত—আব্দুল হামীদ আল-ফাইযী আল-মাদানী

#ShotterDikeAhobban

Tags

একটি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close