preloder
ছিয়াম

আশূরা ও মুহার্রাম (বিস্তারিত)

আব্দুল হামীদ আল-ফাইযী আল-মাদানী

চান্দ্র বছরের বারো মাস আল্লাহর নির্ধারিত সে কথা সবাই জানে। তার মধ্যে চারটি মাস ‘আশহুরুল হুরুম’ (অর্থাৎ নিষিদ্ধ মাস) নামে পরিচিত। যেহেতু বিশেষ করে সেই মাসগুলিতে যুদ্ধ-বিগ্রহ ও খুন-দাঙ্গা করা হারাম বা নিষিদ্ধ তাই। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন,
{إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِندَ اللّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَات وَالأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ فَلاَ تَظْلِمُواْ فِيهِنَّ أَنفُسَكُمْ} (36) سورة التوبة
অর্থাৎ, নিশ্চয় আল্লাহর নিকট পৃথিবী ও আকাশমন্ডলী সৃষ্টি করার দিন হতেই আল্লাহর কিতাবে মাসসমূহের সংখ্যা হল বারো। এর মধ্যে চারটি মাস হল নিষিদ্ধ। এটাই হল সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্ম। সুতরাং তোমরা এ মাসগুলিতে নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না। (সূরা তাওবাহ ৩৬ আয়াত)
আর ঐ চারটি মাস হলঃ যুল-ক•া’দাহ, যুল-হাজ্জাহ, মুহারর্‎াম ও রজব। এই হল মহান আল্লাহ কর্তৃক ঘোষিত চারটি মাসের মর্যাদা।
শরীয়তে মুহার্রাম মাসের যে মর্যাদা রয়েছে, তা রক্ষা করার সাথে সাথে আমাদের অতিরিক্ত কর্তব্য হিসাবে রোযা পালন করার বিধান রয়েছে।
বলা বাহুল্য সুন্নত রোযাসমূহের মধ্যে মুহার্রাম মাসের রোযা অন্যতম। রমযানের পর পর রয়েছে এই রোযার মান। আল্লাহর রসূল  বলেছেন, “রমযানের পর সর্বশ্রেষ্ঠ রোযা হল আল্লাহর মাস মুহার্রামের রোযা। আর ফরয নামাযের পর সর্বশ্রেষ্ঠ নামায হল রাতের (তাহাজ্জুদের) নামায।” (মুসলিম ১১৬৩নং, সুনান আরবাআহ, ইবনে খুযাইমাহ)
মুহার্রাম মাসের রোযার মধ্যে সবচেয়ে বেশী তাকীদপ্রাপ্ত হল ঐ মাসের ১০ তারীখ আশূরার দিনের রোযা। রমযানের রোযা ফরয হওয়ার আগে এই রোযা ওয়াজেব ছিল। রুবাইয়ে’ বিন্তে মুআউবিয বলেন, আল্লাহর রসূল ﷺ আশূরার সকালে মদীনার আশেপাশে আনসারদের বস্তিতে বস্তিতে খবর পাঠিয়ে দিলেন যে, “যে রোযা অবস্থায় সকাল করেছে, সে যেন তার রোযা পূর্ণ করে নেয়। আর যে ব্যক্তি রোযা না রাখা অবস্থায় সকাল করেছে সেও যেন তার বাকী দিন পূর্ণ করে নেয়।”
রুবাইয়ে’ বলেন, ‘আমরা তার পর হতে ঐ রোযা রাখতাম এবং আমাদের ছোট ছোট বাচ্চাদেরকেও রাখাতাম। তাদের জন্য তুলোর খেলনা তৈরী করতাম এবং তাদেরকে মসজিদে নিয়ে যেতাম। অতঃপর তাদের মধ্যে কেউ খাবারের জন্য কাঁদতে শুরু করলে তাকে ঐ খেলনা দিতাম। আর এইভাবে ইফতারের সময় এসে পৌঁছত।’ (আহমাদ ৬/৩৫৯, বুখারী ১৯৬০, মুসলিম ১১৩৬, ইবনে খুযাইমা ২০৮৮নং, বাইহাক্বী ৪/২৮৮)
মা আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, ‘কুরাইশরা জাহেলিয়াতের যুগে আশূরার রোযা পালন করত। আর আল্লাহর রসূল ﷺ-ও জাহেলিয়াতে ঐ রোযা রাখতেন। (ঐ দিন ছিল কাবায় গিলাফ চড়াবার দিন।) অতঃপর তিনি যখন মদীনায় এলেন, তখনও তিনি ঐ রোযা রাখলেন এবং সকলকে রাখতে আদেশ দিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে যখন রমযানের রোযা ফরয হল, তখন আশূরার রোযা ছেড়ে দিলেন। তখন অবস্থা এই হল যে, যার ইচ্ছা হবে সে রাখবে এবং যার ইচ্ছা হবে সে রাখবে না।’ (বুখারী ১৯৫২, ২০০২, মুসলিম ১১২৫নং প্রমুখ)
ইবনে আব্বাস (রায্বিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, মহানবী ﷺ যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় এলেন, তখন দেখলেন, ইহুদীরা আশূরার দিনে রোযা পালন করছে। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এটা কি এমন দিন যে, তোমরা এ দিনে রোযা রাখছ?” ইহুদীরা বলল, ‘এ এক উত্তম দিন। এ দিনে আল্লাহ বানী ইসরাঈলকে তাদের শত্রু থেকে পরিত্রাণ দিয়েছিলেন। তাই মূসা এরই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে এই দিনে রোযা পালন করেছিলেন। (আর সেই জন্যই আমরাও এ দিনে রোযা রেখে থাকি।)’
এ কথা শুনে মহানবী ﷺ বললেন, “মূসার স্মৃতি পালন করার ব্যাপারে তোমাদের চাইতে আমি অধিক হকদার।” সুতরাং তিনি ঐ দিনে রোযা রাখলেন এবং সকলকে রোযা রাখতে আদেশ দিলেন। (বুখারী ২০০৪, মুসলিম ১১৩০নং)
বলাই বাহুল্য যে, উক্ত আদেশ ছিল মুস্তাহাব। যেমন মা আয়েশার উক্তিতে তা স্পষ্ট। তা ছাড়া মহানবী ﷺ বলেন, “আজকে আশূরার দিন; এর রোযা আল্লাহ তোমাদের উপর ফরয করেন নি। তবে আমি রোযা রেখেছি। সুতরাং যার ইচ্ছা সে রোযা রাখবে, যার ইচ্ছা সে রাখবে না।” (বুখারী ২০০৩, মুসলিম ১১২৯নং)
আবু কাতাদাহ (রায্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আল্লার রসূল  আশূরার দিন রোযা রাখা প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বললেন, “আমি আশা করি যে, (উক্ত রোযা) বিগত এক বছরের পাপরাশি মোচন করে দেবে।” (আহমাদ ৫/২৯৭, মুসলিম ১১৬২, আবূ দাঊদ ২৪২৫, বাইহাক্বী ৪/২৮৬)
ইবনে আব্বাস (রায্বিয়াল্লাহু আনহু) প্রমুখাৎ বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আল্লাহর রসূল  রমযানের রোযার পর আশূরার দিন ছাড়া কোন দিনকে অন্য দিন অপেক্ষা মাহাত্ম্যপূর্ণ মনে করতেন না।’ (ত্বাবারানীর আওসাত্ব, সহীহ তারগীব ১০০৬ নং) অনুরূপ বর্ণিত আছে বুখারী ও মুসলিম শরীফে। (বুখারী ২০০৬, মুসলিম ১১৩২নং)
এক বর্ণনায় আছে, এই রোযা এক বছরের রোযার সমান। (ইবনে হিব্বান ৩৬৩১নং)
অবশ্য যে ব্যক্তি আশূরার রোযা রাখবে তার জন্য তার একদিন আগে (৯ তারীখে)ও একটি রোযা রাখা সুন্নত। যেহেতু ইবনে আব্বাস (রায্বিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আল্লাহর রসূল ﷺ যখন আশূরার রোযা রাখলেন এবং সকলকে রাখার আদেশ দিলেন, তখন লোকেরা বলল, ‘হে আল্লাহর রসূল! এ দিনটিকে তো ইয়াহুদ ও নাসারারা তা’যীম করে থাকে।’ তিনি বললেন, “তাহলে আমরা আগামী বছরে ৯ তারীখেও রোযা রাখব ইনশাআল্লাহ।” কিন্তু আগামী বছর আসার আগেই আল্লাহর রসূল ﷺ-এর ইন্তিকাল হয়ে গেল। (মুসলিম ১১৩৪, আবূ দাঊদ ২৪৪৫নং)
ইবনে আব্বাস (রায্বিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, ‘তোমরা ৯ ও ১০ তারীখে রোযা রাখ।’ (বাইহাক্বী ৪/২৮৭, আব্দুর রাযযাক ৭৮৩৯নং)
পক্ষান্তরে “তোমরা এর একদিন আগে বা একদিন পরে একটি রোযা রাখ” -এই হাদীস সহীহ নয়। (ইবনে খুযাইমা ২০৯৫নং, আলবানীর টীকা দ্রঃ) তদনুরূপ সহীহ নয় “তোমরা এর একদিন আগে একটি এবং একদিন পরেও একটি রোযা রাখ” -এই হাদীস। (যাদুল মাআদ ২/৭৬ টীকা দ্রঃ)
বলা বাহুল্য, ৯ ও ১০ তারীখেই রোযা রাখা সুন্নত। পক্ষান্তরে কেবল ১০ তারীখে রোযা রাখা মকরূহ। (ইবনে বায, ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ ২/১৭০) যেহেতু তাতে ইহুদীদের সাদৃশ্য সাধন হয় এবং তা মহানবী ﷺ-এর আশার প্রতিকূল। অবশ্য কেউ কেউ বলেন, ‘মকরূহ নয়। তবে কেউ একদিন (কেবল আশূরার দিন) রোযা রাখলে পূর্ণ সওয়াবের অধিকারী হবে না।’
জ্ঞাতব্য যে, হুসাইন (রায্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর এই দিনে শহীদ হওয়ার সাথে এ রোযার নিকট অথবা দূরতম কোন সম্পর্ক নেই। কারণ, তার পূর্বে মহানবী ﷺ; বরং তাঁর পূর্বে মূসা নবী (আলাইহিস সালাম) এই দিনে রোযা রেখে গেছেন। আর এই দিনে শিয়া সম্প্রদায় যে মাতম ও শোক পালন, মুখ ও বুক চিরে, গালে থাপ্পড় মেরে, চুল-জামা ছিঁড়ে, পিঠে চাবুক মেরে আত্মপ্রহার ইত্যাদি করে থাকে, তা জঘন্যতম বিদআত। সুন্নাহতে এ সবের কোন ভিত্তি নেই।


গ্রন্থঃ ১২ মাসে ১৩ পরব
আব্দুল হামীদ আল-ফাইযী আল-মাদানী

#SotterDikeAhobban

Tags

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আরও দেখুন

Close
Close