preloder
কুর’আন ও সুন্নাহ

তাওবাহ্ – ইস্তেগফার : [ নিজেকে পবিত্র করার বড় মাধ্যম ]

▪এক,

“তাওবাহ্’ এটি আরবি শব্দ, যার আভিধানিক অর্থ প্রত্যাবর্তন করা অর্থাৎ যাবতীয় পাপাচার থেকে পূণ্যপথে ফিরে আসা। শরীয়তের পরিভাষায় ‘তাওবাহ্’ বলা হয়, পাপকর্মকে পাপ বলে বিশ্বাস করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ’লার ভয়ে তা পরিহার করে চলা এবং অতীতের স্বয়ংকৃত পাপের ওপর অনুতপ্ত হয়ে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও ভবিষ্যতে সেদিকে প্রত্যাবর্তন না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা এবং পরিত্যক্ত পুণ্যবান কাজের যথাসাধ্য ক্ষতিপূরণ ও সংশোধনের চেষ্টা চালানো।
.

এটা স্বাভাবিক যে, মানবীয় দুর্বলতার কারণে আমরা শয়তানের কুমন্ত্রণার শিকার হয়ে গুনাহতে লিপ্ত হই। আমাদের রব মহান আল্লাহ নবীগণকে সব ধরনের পাপাচার থেকে মুক্ত রেখেছেন তাই তারা নিস্পাপ – মাসুম। নবী-রাসূলগণ ছাড়া আমাদের সবার জীবনেই কমবেশি গোনাহ হয়ে থাকে। আর কৃত গোনাহ থেকে মুক্তির পথই হচ্ছে তাওবাহ্ ও ইস্তেগফার- অর্থাৎ কৃত গোনাহের জন্যে আল্লাহর কাছে অনুতাপ ও অনুশোচনার সঙ্গে ক্ষমা প্রার্থনা করা; ভুল পথ ছেড়ে মহান প্রতিপালকের দিকে প্রত্যাবর্তিত হওয়া।

ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায়, মানুষ কোনো পাপে লিপ্ত হওয়ার পর যদি সে তার ভুল বুঝতে পারে এবং এজন্যে সে কায়মনোবাক্যে মহান রবের দরবারে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করে, তাহলে তাঁর গোনাহ যত বড়ই হোক না কেন, তা ক্ষমা করে দেওয়া হয়। তবে শর্ত হচ্ছে, তাওবাহ্ করতে হবে খাঁটি মনে। অতীতের গোনাহের জন্যে অনুতপ্ত হয়ে ভবিষ্যতে অন্যায় আর কখনও না করার জন্যে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে। এমন তাওবাহ্-ই আল্লাহর নিকট গৃহীত হয়। যারা এমনভাবে তাওবাহ্ করে, আল্লাহর ক্ষমার বর্ষণে তারাই সিক্ত হয়।
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন —

فَقُلۡتُ اسۡتَغۡفِرُوۡا رَبَّکُمۡ ؕ اِنَّہٗ کَانَ غَفَّارًا
یُّرۡسِلِ السَّمَآءَ عَلَیۡکُمۡ مِّدۡرَارًا
وَّ یُمۡدِدۡکُمۡ بِاَمۡوَالٍ وَّ بَنِیۡنَ وَ یَجۡعَلۡ لَّکُمۡ جَنّٰتٍ وَّ یَجۡعَلۡ لَّکُمۡ اَنۡہٰرًا

আর বলেছি, ‘তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও; নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল’। তিনি তোমাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, আর তোমাদেরকে ধন-সম্পদ ও সন্তান- সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগ-বাগিচা দেবেন আর দেবেন নদী-নালা’।
— [ সূরাহ নূহ, আয়াত : ১০ – ১২ ]

উপরিউক্ত আয়াত থেকে আমাদের সামনে প্রতিভাত হয় যে – বান্দা যদি আল্লাহর সামনে নিজের সব পাপ থেকে খাঁটি মনে তাওবাহ্ করে, তাহলে পাপমুক্তির পাশাপাশি দুনিয়ার যাবতীয় প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থাও আল্লাহ করে দেবেন।

▪দুই,

তাওবাহ্কারীর মনে রাখা আবশ্যক যে, শুধু মুখে মুখে তাওবাহ্ করা কিংবা অন্যদের দেখাদেখি তাওবাহ্’র জন্যে কিছু বাক্য মুখে আওড়ানো তাওবাহ্’র জন্যে যথেষ্ট নয়। তাওবাহ্ করতে হবে অবশ্যই খালেস অন্তর থেকে এবং আর কখনোই ঐ গোনাহ-টি না করার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ মন নিয়ে। তবে একথাও সত্য যে, ইবলিশের প্ররোচনায় আমরা একাধিকবার গোনাহ করে ফেলি! কিন্তু তাতেও হতাশ হওয়া যাবেনা। কেননা আল্লাহর রহমত থেকে শুধুমাত্র কাফিররা-ই নিরাশ হয়, মুমিন – মুসলিম নয়। যখনই গোনাহতে জড়াবেন, যদি তখনই পূনরায় মহান আল্লাহর ভয়ে অনুতপ্ত হৃদয়ে তাওবাহ্ করেন এবং আবারও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন যে একাজ আর কখনো করবেন না, তাহলে প্রতিবারই মহান আল্লাহ ক্ষমা করবেন। বারবার গুনাহতে লিপ্ত হওয়া, হতাশাগ্রস্ত হৃদয়গুলিকে শান্তনা দিয়ে আমাদের রব আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ’লা বলেন,

قل يا عبادي الذين أسرفوا على أنفسهم لا تقنطوا من رحمة الله إن الله يغفر الذنوب جميعا إنه هو الغفور الرحيم

“আপনি বলুন! হে আমার বান্দারা, যারা পাপে লিপ্ত হয়ে নিজের নফসের উপর যুলুম করেছো, তোমরা আল্লাহর করুনা থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত পাপ মার্জনা করেন। নিশ্চয়ই তিনি অতিব ক্ষমাশীল ও পরম করুণাময়।
—- [ সুরাহ যুমার, আয়াত : ৫৩ ]

হে প্রিয় ভাই! মনে রাখবেন – আপনার পাপ যত বড়ই হোক, যত বেশিই হোক না কেন, তা মহান আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ, দয়া ও ক্ষমার তুলনায় মোটেও বড় নয়। বান্দা যখন তার কাছে ক্ষমা চেয়ে হাত বাড়ান , তিনি তাতে অত্যন্ত খুশি হন। খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন। এ প্রসঙ্গে প্রিয়নবী মুহাম্মদূর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন —

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الصَّبَّاحِ، وَزُهَيْرُ بْنُ حَرْبٍ، قَالاَ حَدَّثَنَا عُمَرُ بْنُ يُونُسَ، حَدَّثَنَا عِكْرِمَةُ بْنُ عَمَّارٍ، حَدَّثَنَا إِسْحَاقُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي طَلْحَةَ، حَدَّثَنَا أَنَسُ بْنُ مَالِكٍ، – وَهُوَ عَمُّهُ – قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ لَلَّهُ أَشَدُّ فَرَحًا بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ حِينَ يَتُوبُ إِلَيْهِ مِنْ أَحَدِكُمْ كَانَ عَلَى رَاحِلَتِهِ بِأَرْضِ فَلاَةٍ فَانْفَلَتَتْ مِنْهُ وَعَلَيْهَا طَعَامُهُ وَشَرَابُهُ فَأَيِسَ مِنْهَا فَأَتَى شَجَرَةً فَاضْطَجَعَ فِي ظِلِّهَا قَدْ أَيِسَ مِنْ رَاحِلَتِهِ فَبَيْنَا هُوَ كَذَلِكَ إِذَا هُوَ بِهَا قَائِمَةً عِنْدَهُ فَأَخَذَ بِخِطَامِهَا ثُمَّ قَالَ مِنْ شِدَّةِ الْفَرَحِ اللَّهُمَّ أَنْتَ عَبْدِي وَأَنَا رَبُّكَ ‏.‏ أَخْطَأَ مِنْ شِدَّةِ الْفَرَحِ ‏”‏ ‏.‏

বান্দা যখন আল্লাহর কাছে তাওবাহ্‌ করে তখন আল্লাহ ঐ লোকের চেয়েও বেশি আনন্দিত হন, যে মরুভূমিতে নিজ সওয়ারীর উপর আরোহিত ছিল। তারপর সাওয়ারীটি তার হতে হারিয়ে যায়। আর তার উপর ছিল তার খাদ্য ও পানীয়। এরপর নিরাশ হয়ে সে একটি গাছের ছায়ায় এসে আরাম করে এবং তার উটটি সম্বন্ধে সম্পূর্ণরূপে নিরাশ হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় হঠাৎ উটটি তার কাছে এসে দাঁড়ায়। অমনিই সে তার লাগাম ধরে ফেলে। এরপর সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলে উঠে, হে আল্লাহ! তুমি আমার বান্দা, আমি তোমার রব। আনন্দে আত্মহারা হয়ে সে ভুল করে ফেলেছে।
—— [ স্বহীহ মুসলিম : ৬৮৫৩ ]

▪তিন,

তাওবাহ্-ইস্তেগফার মুমিনের বড় একটি গুণ। গোনাহের অভিশাপ থেকে নিজেকে পবিত্র করার বড় মাধ্যম হল তাওবাহ্। তাই আসুন – নিজের আখিরাতের কথা চিন্তা করে, জাহান্নামের ঐ ভয়াবহ শাস্তি থেকে মুক্তির লক্ষ্যে তাওবাহ্ করে দ্রুত আল্লাহর রাস্তায় ফিরে যাই। প্রিয়নবী মুহাম্মদূর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন —

حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ يَحْيَى، وَقُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ، وَأَبُو الرَّبِيعِ الْعَتَكِيُّ، جَمِيعًا عَنْ حَمَّادٍ، قَالَ يَحْيَى أَخْبَرَنَا حَمَّادُ بْنُ زَيْدٍ، عَنْ ثَابِتٍ، عَنْ أَبِي بُرْدَةَ، عَنِ الأَغَرِّ الْمُزَنِيِّ، – وَكَانَتْ لَهُ صُحْبَةٌ – أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ إِنَّهُ لَيُغَانُ عَلَى قَلْبِي وَإِنِّي لأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ فِي الْيَوْمِ مِائَةَ مَرَّةٍ ‏”‏ ‏.‏

আমার অন্তরে কখনো কখনো অলসতা দেখা দেয়, তাই আমি দৈনিক একশ’ বার আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকি। — [ স্বহীহ মুসলিম : ৬৭৫১ ]
.

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরো বলেছেন —

حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا غُنْدَرٌ، عَنْ شُعْبَةَ، عَنْ عَمْرِو بْنِ مُرَّةَ، عَنْ أَبِي، بُرْدَةَ قَالَ سَمِعْتُ الأَغَرَّ، وَكَانَ، مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم يُحَدِّثُ ابْنَ عُمَرَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ يَا أَيُّهَا النَّاسُ تُوبُوا إِلَى اللَّهِ فَإِنِّي أَتُوبُ فِي الْيَوْمِ إِلَيْهِ مِائَةَ مَرَّةٍ ‏”‏ ‏.‏

হে লোক সকল! তোমরা আল্লাহর নিকট তাওবাহ্ করো। কেননা আমি আল্লাহর নিকট প্রতিদিন একশ’ বার তাওবাহ্ করে থাকি। — [ স্বহীহ মুসলিম : ৬৭৫২ ]
.

বন্ধুগণ! চিন্তা করুনতো – আল্লাহর রাসূল (ﷺ) নিস্পাপ মানুষ হয়েও যদি দৈনিক একশ’বার তাওবাহ্ করতে পারেন , তাহলে আমার – আপনার মত পাপী – গুনাহগারদের কয়বার করা উচিত!? তবুও কি আমাদের হুঁশ ফিরবেনা? জানিনা, আমাদের কার কাফনের কাপড় রেডি হয়ে আছে, কখন – কাকে, কি অবস্থায় চলে যেতে হবে তাও অজানা! এমন যেন না হয় – মালাকুল মউত এসে গেল আর আমি তাওবাহ্ করার সুযোগটুকুনও পেলাম না! সুতরাং কালক্ষেপণ না করে নিজেকে শুধরে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। নিশ্চয়ই জ্ঞানীরাই উপদেশ গ্রহণ করে।
.

হে আল্লাহ! আপনি আমাদের গুনাহসমূহকে ক্ষমা করুন, আমাদের অন্তরগুলোকে পবিত্র করুন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের ইন্দন হওয়া থেকে রক্ষা করুন। আমীন ইয়া রা’ব্বাল আ’লামীন।

.
বিঃদ্রঃ [ পুরোনো একটি নিবন্ধ থেকে সার – নির্যাস নেয়া হয়েছে ]


আখতার বিন আমীর।

#SotterDikeAhobban

Tags

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close