preloder
সাম্প্রতিক-বিষয়াদি

মাদ্রাসার পাঠ্যবই সমূহের অন্তরালে (২য় কিস্তি)

মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব

১ম পর্ব 

আকাইদ ও ফিকহ

(১৯) ইবতেদায়ী পঞ্চম শ্রেণী, প্রথম অধ্যায়, পৃ. ১০ পাঠ-৬ সুন্নাত ও বিদআত

বিদআত দু-প্রকার। যথা : উত্তম বিদআত ও নিন্দনীয় বিদআত। যে বিদআত শরিয়ত অনুমোদিত এবং মানুষের কল্যাণে নিবেদিত তাকে উত্তম বিদআত বলে। যেমন মসজিদ পাকা করা, ধর্মীয় বই-পুস্তক প্রণয়ন, রেল, বিমান, টেলিফোন ইত্যাদি প্রযুক্তিগত আবিষ্কার সমূহ উত্তম বিদআতের অন্তর্ভুক্ত। ২. যে বিদআত শরিয়ত অনুমোদিত নয়, বরং এটি গুনাহের দিকে ধাবিত করে ও সামাজিক অশান্তি সৃষ্টি করে তাকে নিন্দনীয় বিদআত বলা হয়। যেমন, অশ্লীল গান-বাজনা ও চরিত্র ধ্বংসকারী পত্র-পত্রিকা ইত্যাদি।

মন্তব্য : এখানে বিদ‘আতের সংজ্ঞায় পুকুর চুরি করা হয়েছে। যেগুলি উদাহরণ দেওয়া হয়েছে সেগুলি আদৌ বিদ‘আত নয়। বরং বৈষয়িক ব্যাপার। অথচ বিদ‘আত হ’ল, যা ধর্মের নামে করা হয়। কেননা ইসলামের মধ্যে নবোদ্ভূত বিষয়কে বিদ‘আত বলা হয়। ‘এইরূপ সকল বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা। যার পরিণাম জাহান্নাম’ (বুঃ মুঃ মিশকাত হা/১৪০; নাসাঈ হা/১৫৭৮)। বোর্ডের সিলেবাসে বিদ‘আতের উক্ত ভুল সংজ্ঞার অন্তরালে ধর্মের নামে সৃষ্ট মীলাদ-ক্বিয়াম, শবেবরাত-শবে মি‘রাজ, কুলখানী-চেহলাম, চার মাযহাব মান্য করা ফরয ইত্যাদি বিদ‘আতী রেওয়াজগুলিকে আড়াল করা হয়েছে মাত্র।

(২০) পৃ. ১৯ পাঠ-৪ : ফেরেশতাদের মধ্যে চারজন প্রধান। তারা হলেন-… হজরত আজরাইল আলাইহিস সালাম ও হজরত ইসরাফিল আলাইহিস সালাম। 

মন্তব্য : ‘আযরাঈল’ নামটি প্রসিদ্ধ হ’লেও কুরআন-হাদীছে নেই। বরং রূহ কবযকারী ফেরেশতাকে ‘মালাকুল মউত’ বা মৃত্যুর ফেরেশতা বলা হয় (সাজদাহ ১১)। অতঃপর শিঙ্গায় ফুঁক দানকারী ফেরেশতার নাম ‘ইস্রাফীল’ হিসাবে প্রসিদ্ধ। এ বিষয়ে বর্ণিত হাদীছের সনদ কেউ ছহীহ, কেউ যঈফ বলেছেন।[1] সে হিসাবে উক্ত ফেরেশতার নাম ‘মালাকুছ ছূর’ বা শিঙ্গায় ফুঁক দানকারী ফেরেশতা বলা উচিৎ।[2]

(২১) পৃ. ২২ পাঠ-৫, আখেরাত : জান্নাত আটটি। … জাহান্নামের সাতটি স্তর রয়েছে।

মন্তব্য : এটি ভুল। বরং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘জান্নাতের আটটি ও জাহান্নামের সাতটি দরজা রয়েছে’।[3]

(২২) পৃ. ২৪ পাঠ-৭ অলি ও কারামাত; অলির মর্যাদা।

মন্তব্য : এখানে সূরা ইউনুস ৬২-৬৪ তিনটি আয়াতের অপব্যাখ্যা করে অলিদেরকে একটি পৃথক শ্রেণী সাব্যস্ত করা হয়েছে। অথচ অলি বলে কোন শ্রেণীর অস্তিত্ব ইসলামে নেই। প্রত্যেক দ্বীনদার ও সৎকর্মশীল মুমিন নর-নারীই আল্লাহর অলি বা বন্ধু। এর মাধ্যমে খৃষ্টানদের পোপ-পাদ্রী ও হিন্দুদের যোগী-সন্ন্যাসীদের ন্যায় মুসলমানদের মধ্যে মানুষ পূজার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। যা ছাত্রদেরকে শিরকে উদ্বুদ্ধ করবে এবং প্রচলিত পীরপূজা ও কবরপূজার দিকে ধাবিত করবে।

(২৩) পৃ. ২৫ পাঠ-৭ কারামাত : এখানে কারামতের উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, হজরত সুলায়মান আলাইহিস সালাম এর উজির আসাফ ইবনে বারখিয়া কর্তৃক ইয়ামেন হতে রাণী বিলকিসের সিংহাসন মুহুর্তের মধ্যে নিয়ে আসা ইত্যাদি।

মন্তব্য : অথচ এগুলি স্রেফ ভিত্তিহীন বক্তব্য। কোন কোন মুফাসসির প্রমাণহীনভাবে এগুলি লিখেছেন। এসব অখ্যাত বিষয়কে বিখ্যাত করার পিছনে কথিত পীর-আউলিয়াদের পূজা করার জন্য ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে মাত্র। এখানে সঠিক বিষয়টি হ’ল, ঐ ব্যক্তি ছিলেন স্বয়ং সোলায়মান (আঃ)। যার নিকটে ছিল আল্লাহর কিতাবের ইলম (দ্র. নবীদের কাহিনী-২/১৫৪ পৃ.)

(২৪) পৃ. ২৮ তৃতীয় অধ্যায়, পাঠ-১, ফিকহ শাস্ত্র ও ইমামগণ : এখানে বলা হয়েছে, ইসলামী শরিয়তের মূল উৎসসমূহ তথা কুরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াসের আলোকে শরিয়তের  বিধি-বিধান অবগত হওয়াকে ফিকহ বলে। নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-لِكُلِّ شَيْءٍ عِمَادٌ، وَعِمَادُ هَذَا الدِّينُ الْفِقْهُ অর্থ : প্রত্যেক বস্ত্তর খুঁটি রয়েছে। আর দীন ইসলামের খুঁটি হলো আল ফিকহ (তবারানি)।

মন্তব্য : ইসলামী শরী‘আতের মূল উৎস কুরআন ও সুন্নাহ (মুওয়াত্ত্বা)। বাকীগুলি মূল নয়। তাছাড়া ত্বাবারাণীর যে হাদীছ আনা হয়েছে, সেটি মওযূ‘ বা জাল (যঈফুল জামে‘ হা/৫১০৪)। এক্ষণে ফিক্বহ শাস্ত্রের জন্মের আগে ছাহাবী ও তাবেঈগণের স্বর্ণ যুগে যেসব মুসলমান মৃত্যুবরণ করেছেন এবং দ্বীনের কথিত এই খুঁটির জ্ঞান হাছিল করেননি, তাদের ইহকালীন ও পরকালীন অবস্থা কেমন হবে?

এর মাধ্যমে ছাত্রদেরকে কুরআন-হাদীছ ছেড়ে নিজেদের তৈরী ফিক্বহমুখী করার কৌশল করা হয়েছে মাত্র। যা হাযারো মতভেদে পূর্ণ। আলিয়া হৌক বা কওমী হৌক, সর্বত্র ফিক্বহ হ’ল মূল বিষয়। হাদীছ হ’ল গৌণ। শেষবর্ষে গিয়ে জাঁকজমক সহকারে খতমে বুখারীর অনুষ্ঠান করা হয়। বলা হয় এটি বরকতের জন্য। বরং এটি মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য। বাস্তব ফলাফল দাঁড়ায় এই যে, মাযহাবী ফিক্বহ পড়া হয় আমলের জন্য। আর কুরআন-হাদীছ পড়া হয় অন্য কারণে। এমনকি কোন কোন আলেম বলেন, কুরআন-হাদীছ পড়লে মানুষ গোমরাহ হয়ে যাবে। অথচ কুরআন-হাদীছ এসেছে গোমরাহ মানুষের হেদায়াতের জন্য।

(২৫) পৃ. ২৯ পাঠ-১ : নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আরো বলেছেন, فَقِيهٌ وَاحِدٌ أَشَدُّ عَلَى الشَّيْطَانِ مِنْ أَلْفِ عَابِدٍ অর্থ : শয়তানের মুকাবিলায় একজন ফকিহ হাজার আবিদ হতেও শক্তিশালী (ইবনে মাজাহ)।

মন্তব্য : হাদীছটি মওযূ‘ বা জাল (যঈফুল জামে‘ হা/৩৯৭৮)। এর পরে উক্ত পৃষ্ঠায় চার মাযহাবের চার ইমামের নাম দেওয়া হয়েছে। ভাবখানা এই, যেন ইসলামী জগতে আর কোন ফক্বীহ বা ইমাম নেই। এভাবে ছাত্রদেরকে ইসলামী জগতের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মুহাদ্দিছ ও মুজতাহিদ বিদ্বানগণ থেকে অন্ধকারে রাখার কৌশল করা হয়েছে। তাছাড়া এক ইসলামে চার মাযহাব ভাগ করে দেখালে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরী হবে এবং মুসলিম ঐক্যের ধারণা বিলুপ্ত হবে। বলা যেতে পারে যে, এই মাযহাবী তাক্বলীদের কারণেই মাযহাবী আলেমরা কুরআন ও সুন্নাহর নিরপেক্ষ অনুসারী হতে পারেন না। আর এ কারণেই মুসলিম উম্মাহ কখনোই ঐক্যবদ্ধ হতে পারছে না।

(২৬) পৃ. ৩৪ পাঠ-৪ অজু : অজুর ফরজ চারটি। যথা : …৩. মাথার চার ভাগের একভাগ মাসেহ করা : মাথার চার ভাগের একভাগ মাসেহ করা ফরজ। সমস্ত মাথা মাসেহ করা সুন্নাত।

মন্তব্য : মাথার কিছু অংশ বা এক চতুর্থাংশ মাসাহ করার কোন দলীল নেই। বরং পূর্ণ মাথা বা মাথার সামনের কিছু অংশ সহ পাগড়ীর উপর মাসাহ অথবা কেবল পাগড়ীর উপর মাসাহ করা প্রমাণিত (ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) ৫৯ পৃ.)

(২৭) পৃ. ৩৪ অজুর সুন্নাত : …২. ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম বলে অজু আরম্ভ করা’।

মন্তব্য : শুধু ‘বিসমিল্লাহ’ বলাটাই সুন্নাত। বাকীটা সম্পর্কে মতভেদ আছে।

(২৮) পৃ. ৩৫ অজু ভঙ্গের কারণ : …২. শরীরের কোনো স্থান দিয়ে রক্ত, পুঁজ ইত্যাদি বের হয়ে গড়িয়ে পড়া। ৩. মুখ ভরে বমি হওয়া। ৬. কোনো সালাতের মধ্যে অট্টহাসি দেওয়া’।

মন্তব্য : পেশাব-পায়খানার রাস্তা দিয়ে কোন কিছু বের হওয়াটাই মাত্র ওযূ ভঙ্গের কারণ। বাকীগুলি নয় (ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) ৬৩ পৃ.)। তাছাড়া ছালাতের মধ্যে অট্টহাসি দিলে ছালাত নষ্ট হ’তে পারে, ওযূ নষ্ট হবে কেন?

(২৯) পৃ. ৩৫ : অপবিত্র অবস্থায় যেসব কাজ করা নিষেধ : অপবিত্র অবস্থায় কুরআন শরিফ তেলাওয়াত করা ও স্পর্শ করা, …. কাবা ঘর তাওয়াফ করা, সালাত ছাড়া অন্য কোনো সাজদা, যেমন তেলাওয়াতে সাজদা করা নিষেধ’।

মন্তব্য : সর্বাবস্থায় কুরআন তেলাওয়াত করা জায়েয (মুসলিম হা/৩৭৩)। তবে মাসিক ও ফরয গোসলের নাপাকী অবস্থায় স্পর্শ করা জায়েয নয় (মিশকাত হা/৪৬৫; ইরওয়া হা/১২২)। ওযূ অবস্থায় কা‘বাগৃহ তাওয়াফ শুরু করবে। কিন্তু মাঝখানে টুটে গেলে ঐভাবেই শেষ করবে। তার ক্বাযা আদায় করতে হবে না (হজ্জ ও ওমরাহ ৬৩ পৃ.)। সিজদায়ে তেলাওয়াত বা সিজদায়ে শুকরের জন্য ওযূ বা ক্বিবলা শর্ত নয় (ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) ১৫৩, ১৫৫ পৃ.)

(৩০) পৃ. ৩৭ পাঠ-৬ তায়াম্মুম : তায়াম্মুমের ফরজ তিনটি। যথা… ৩. উভয় হাত পবিত্র মাটিতে মেরে তা দিয়ে উভয় হাত কনুইসহ মাসেহ করা।

মন্তব্য : বরং পবিত্রতা অর্জনের নিয়তে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে মাটির উপর দু’হাত মেরে তাতে ফুঁক দিয়ে মুখমন্ডল ও দু’হাতের কব্জি পর্যন্ত একবার বুলাবে। দুইবার হাত মারা ও কনুই পর্যন্ত মাসাহ করার হাদীছ যঈফ (ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) ৬৬ পৃ.)

(৩১) পৃ. ৩৭ : তায়াম্মুম ভঙ্গের কারণ :… ৫. সালাতরত অবস্থায় যদি পানি পাওয়ার সংবাদ আসে এবং নতুন করে অজু করে সালাত আদায় করার সময় বাকি থাকে, তবে তায়াম্মুম ভঙ্গ হবে। কিন্তু ঈদ ও জানাজার সালাত শুরু করলে পানি পাওয়া গেলেও তায়াম্মুম নষ্ট হবে না।

মন্তব্য : এগুলি সবই অনর্থক কথা। বরং ‘তায়াম্মুম’ করে ছালাত আদায়ের পরে ওয়াক্তের মধ্যে পানি পাওয়া গেলে পুনরায় ঐ ছালাত আদায় করতে হবে না (ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) ৬৭ পৃ.)

(৩২) পৃ. ৪১ পাঠ-৯ প্রস্রাব-পায়খানা করার নিয়ম : প্রস্রাব-পায়খানা শেষে ঢিলা ব্যবহার করা এবং পরে পানি দিয়ে উত্তমভাবে ধৌত করা।

মন্তব্য : এটিও ঠিক নয়। বরং কুলূখ নিলে পুনরায় পানির প্রয়োজন নেই (ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) ৬৯ পৃ.)। উক্ত পৃষ্ঠায় আরবীতে যে দো‘আ লেখা হয়েছে, তার প্রথমাংশ ‘গোফরা-নাকা’ বলাটাই ছহীহ হাদীছ সম্মত। বাকী অংশটির হাদীছ যঈফ (ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) ৬৮ পৃ.)

(৩৩) পৃ. ৪৭ : সাজদায়ে সাহু হলো- শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ পড়ার পর ডান দিকে সালাম ফিরিয়ে অতিরিক্ত দু’টি সাজদা আদায় করা। সাহু সাজদার পর পুনরায় তাশাহহুদ, দরূদ শরিফ ও দোআ মাছুরা পড়তে হয়।

মন্তব্য : এটি ভিত্তিহীন এবং সুন্নাতী তরীকার বিপরীত (ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) ১৫৩ পৃ.)।      

(৩৪) পৃ. ৫০ ৪র্থ অধ্যায় ইবাদত পাঠ-৬ জুমার সালাত : জুমার সালাতের জন্য দুইবার আজান দেয়া হয়। জোহরের ওয়াক্ত হওয়ার পর প্রথম আজান এবং ইমাম সাহেব খুতবার জন্য মিম্বরে উঠলে ইমাম সাহেবের সামনে দ্বিতীয় আজান দেওয়া হয়। জুমার সালাতের প্রথমে খুতবার পূর্বে চার রাকাত ‘কাবলাল জুমা’ সুন্নাতে মুআক্কাদা সালাত পড়তে হয়।… জুমার সালাতের নিয়ত (আরবীতে লেখা হয়েছে)। অর্থ : আমার উপর থেকে জোহরের ফরয সালাত রহিত করার জন্য আমি জুমার দু’রাকাত ফরজ সালাত আল্লাহর উদ্দেশ্যে কিবলামুখী হয়ে এ ইমামের পিছনে আদায় করার নিয়ত করছি, আল্লাহু আকবার। জুমার ফরজ সালাতের শেষে ‘বা’দাল জুমা’ নামে… এরপর আরো দু’রাকাত… সালাতকে সুন্নাতুল ওয়াক্ত সালাত বলে।

মন্তব্য : নিয়ম হ’ল খত্বীব মিম্বরে বসার পর মুওয়ায্যিন জুম‘আর আযান দিবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ), আবুবকর ও ওমর (রাঃ)-এর যুগে এবং ওছমান (রাঃ)-এর খেলাফতের প্রথমার্ধ্বে এই নিয়ম চালু ছিল। অতঃপর মুসলমানদের সংখ্যা ও নগরীর ব্যস্ততা বেড়ে গেলে হযরত ওছমান (রাঃ) জুম‘আর পূর্বে মসজিদে নববী থেকে দূরে ‘যাওরা’ বাজারে একটি বাড়ীর ছাদে দাঁড়িয়ে লোকদের আগাম হুঁশিয়ার করার জন্য পৃথক একটি আযানের নির্দেশ দেন।[4] খলীফার এই হুকুম ছিল স্থানিক প্রয়োজনের কারণে একটি সাময়িক নির্দেশ মাত্র। যা তখন ইসলামী খেলাফতের সর্বত্র তিনি চালু করেননি। অতএব পরবর্তীকালে ঘড়ি-মোবাইলের যুগে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সুন্নাতের অনুসরণ করাই সকল মুমিনের কর্তব্য (ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) ১৯৪ পৃ.)

অতঃপর সকল ইবাদতের পূর্বে নিয়ত বা সংকল্প করা ফরয। কিন্তু মুখে নিয়ত পাঠ করা বিদ‘আত। এভাবে নিয়তের ভুল ব্যাখ্যা করে কোমলমতি বাচ্চাদেরকে বিভিন্ন ইবাদতের পূর্বে নিজেদের বানানো বিভিন্ন আরবী নিয়ত শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। যা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।

অতঃপর জুম‘আর দিন খুৎবার পূর্বে ৪ রাক‘আত ক্বাবলাল জুম‘আ এবং ছালাত শেষে ‘বা‘দাল জুম‘আ’ ও ‘সুন্নাতুল ওয়াক্ত’ নামে কোন ছালাত নেই। বরং খুৎবার পূর্বে তাহিইয়াতুল মাসজিদ দু’রাক‘আত সহ যত রাক‘আত খুশী নফল ছালাত পড়া যায়। (এসময় ‘বয়ানে’র নামে মিম্বরে বসে বক্তব্য দেওয়ার ও মুছল্লীদের নফল ছালাত থেকে বাধা দেওয়ার কোন অধিকার খতীবের নেই)। অতঃপর ছালাত শেষে এক সালামে চার রাক‘আত বা তার পরে আরও দু’রাক‘আত সুন্নাত পড়া যায়। কিন্তু এগুলির পৃথক কোন নাম নেই। তাছাড়া ‘সুন্নাতুল ওয়াক্ত’ বা ওয়াক্তের সুন্নাত বলতে কি বুঝায়? তাহ’লে কি জুম‘আর ছালাতের পরে জুম‘আর ওয়াক্ত হয়? অথচ এগুলি নফল ছালাত। যা ব্যস্ততা বা বাধ্যগত কারণে না পড়লেও চলে। কিন্তু পৃথক পৃথক নাম দেওয়ার কারণে মুছল্লীগণ এগুলিকে অধিক গুরুত্ব দিবে এবং যত দ্রুত গতিতেই হোক এগুলি তারা পড়তে চেষ্টা করবে। অথচ খুশূ-খুযূ ব্যতীত ছালাতের কোন মূল্য নেই।

(৩৫) পৃ. ৫১ পাঠ-৭ দুই ঈদের সালাত : ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার সালাত দুরাকাত করে পড়তে হয়। এটি অন্যান্য সালাতের মতো, তবে প্রতি রাকাতে তিনটি করে ছয়টি অতিরিক্ত তাকবির বলা ওয়াজিব। প্রথম রাকাতে ছানা পড়ার পর তিনটি তাকবির এবং দ্বিতীয় রাকাতে কিরাতের পর রুকুতে যাওয়ার পূর্বে আরো তিনটি তাকবির বলতে হয়’। (অতঃপর অর্থসহ ঈদুল ফিৎর ও ঈদুল আযহার আরবী নিয়ত লেখা হয়েছে)। 

মন্তব্য : বর্ণিত পদ্ধতিতে ছয় তাকবীরের কোন ছহীহ বা যঈফ হাদীছ নেই। আর মুখে নিয়ত পাঠের বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে বিদ‘আত।

(৩৬) পৃ. ৫২ পাঠ-৮ বিতরের সালাত : এ সালাতের শেষ রাকাতে অন্যান্য সালাতের মতো সুরা ফাতিহার সাথে অন্য সুরা পাঠ করতে হয়। এরপর তাকবিরে তাহরিমার মতো আল্লাহু আকবার বলে উভয় হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে আবার হাত বেঁধে দোআ কুনুত পড়তে হয়। …এ সালাতের মধ্যে দোআ কুনুত পড়া ওয়াজিব’। … (এরপর অর্থ ছাড়াই আরবীতে দো‘আ কুনূত লেখা হয়েছে)।

মন্তব্য : কুনূত পড়ার জন্য রুকূর পূর্বে তাকবীরে তাহরীমার ন্যায় দু’হাত উঠানো ও পুনরায় বাঁধার প্রচলিত প্রথার কোন বিশুদ্ধ দলীল নেই।[5] বিতরের জন্য দো‘আয়ে কুনূত ওয়াজিব নয়। তাছাড়া বর্ণিত দো‘আ কুনূত রাসূল (ছাঃ)-এর কোন হাদীছ নয়। বরং বিদ্বানগণের বিভিন্ন বর্ণনা থেকে নেওয়া। যা ‘মুরসাল’ সূত্রে প্রাপ্ত (ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) ১৬৪, ১৬৬, ১৬৯ পৃ.)

কুনূতের জন্য বিশুদ্ধ দো‘আ যা রাসূল (ছাঃ) স্বীয় নাতি হাসান বিন আলীকে শিখিয়েছিলেন, সেটি হ’ল, আল্লা-হুম্মাহ্দিনী ফীমান হাদায়তা…।[6]

(৩৭) পৃ. ৫৩ পাঠ-৯ তারাবির সালাত : রমজান মাসে এশার সালাতের পর ও বিতর সালাতের পূর্বে বিশ রাকাত সুন্নাত সালাত পড়তে হয়। একে ‘তারাবির সালাত’ বলা হয়। তারাবির সালাত দু’রাকাত করে দশ সালামের সাথে বিশ রাকাত আদায় করতে হয়। প্রতি রমজানে উক্ত সালাতে একবার কুরআন মাজিদ খতম করা উত্তম’। … (এরপর প্রতি চার রাক‘আত শেষে একটি মুস্তাহাব দো‘আ এবং তারাবীহ শেষে আরেকটি দো‘আ লেখা হয়েছে)।

মন্তব্য : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কখনো ২০ রাক‘আত তারাবীহ পড়েননি (বুঃ মুঃ মিশকাত হা/১১৮৮)। ওমর (রাঃ) তিন রাক‘আত বিতর সহ ১১ রাক‘আত তারাবীহ চালু করেছিলেন, ২০ রাক‘আত নয়।[7] তাছাড়া প্রতি চার রাক‘আত পর পর একটি ‘মুস্তাহাব’ দো‘আ এবং তারাবীহ শেষে আরেকটি দো‘আ পাঠ করার কোন নির্দেশ হাদীছে নেই। লিখিত দু’টি দো‘আ সরাসরি হাদীছ ভিত্তিক নয়। বরং দু’টিই জোড়াতালি দিয়ে বানানো।

(৩৮) পৃ. ৫৪ : জানাজার সালাত : এ (ছালাতের অর্থ সহ আরবী নিয়ত দেওয়া হয়েছে। অতঃপর বলা হয়েছে,) ‘আরবি নিয়ত জানা না থাকলে বাংলায় নিয়ত করলেও হবে’।

মন্তব্য : আরবী বা বাংলায় মুখে নিয়ত পাঠ করা ভিত্তিহীন। বরং হৃদয়ের সংকল্পই যথেষ্ট।

(৩৯) পৃ. ৫৬ : সাওম ভঙ্গের কারণ : (১) …কেউ জোর পূর্বক কোনো কিছু খাওয়ালে। (২) ধোঁয়া, ধূপ ইত্যাদি কোনো কিছু নাক বা মুখ দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলে। (৯) কুলি করার সময় হঠাৎ করে পেটের ভিতর পানি প্রবেশ করলে। (১০) নিদ্রিত অবস্থায় কোনো বস্ত্ত খেয়ে ফেললে।

মন্তব্য : এগুলির কোনটিই ছিয়াম ভঙ্গের কারণ নয়।

(৪০) পৃ. ৫৮ : রমজান শেষে ঈদুল ফিতরের দিন ঈদের সালাতের পূর্বে শরিয়ত নির্ধারিত যে খাদ্য বস্ত্ত বা এর সমপরিমাণ মূল্য গরিব-মিসকিনদের প্রদান করা হয় তাকে সদকাতুল ফিতর বা ফিতরা বলা হয়। মৌলিক প্রয়োজনের  অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ মালের মালিক প্রত্যেক মুসলিম নারী-পুরুষের উপর সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব।… ঈদের দিন মিসকিনদের খাবারের ব্যবস্থা স্বরূপ সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব করেছেন’।

মন্তব্য : শরী‘আতে খাদ্য বস্ত্ত প্রদানের নির্দেশ রয়েছে, মূল্য প্রদানের কথা নেই। যার বাড়ীতে একদিনের অতিরিক্ত খাদ্য রয়েছে, তার উপরে ছাদাক্বাতুল ফিতর ওয়াজিব। নিছাব পরিমাণ মালের তথা ২০ দীনার বা সাড়ে ৭ ভরি স্বর্ণের মালিক হওয়া শর্ত নয়। এটি জানের ছাদাক্বা, মালের ছাদাক্বা নয়। ঈদের দিন সকালে সন্তান জন্ম নিলেও তার পক্ষে ফিতরা দিতে হয়। আর ফিতরা আদায়ের সর্বশেষ সময়সীমা হ’ল ঈদের ছালাতে বের হওয়ার আগ পর্যন্ত। সুতরাং তা বণ্টন হবে ঈদের ছালাতের পর। সেকারণ ঈদের দিন মিসকীনদের খাওয়ানোর উদ্দেশ্যে ফিতরা নয়। বরং এটি ছিয়ামের ত্রুটি-বিচ্যুতির কাফফারা হিসাবে দিতে হয়। আর বণ্টনের সময় ফকীর-মিসকীন অগ্রাধিকার পাবে।

(৪১) পৃ. ৫৮ ইতিকাফ : মহিলাদের জন্য ইতিকাফ হলো- নিয়তসহ ঘরের ভিতর নির্দিষ্ট কোনো স্থানে অবস্থান করা। … হজরত ইবনে আববাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেন, ‘ইতিকাফকারী মূলত গুনাহ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখে এবং তার জন্য সকল প্রকার নেক আমলকারীর নেকির সমপরিমাণ লেখা হতে থাকে। (ইবনে মাজাহ)

মন্তব্য : মহিলাদের ই‘তিকাফ মসজিদেই করতে হবে, ঘরে নয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর স্ত্রীগণ মসজিদেই ই‘তিকাফ করেছেন।[8] অতঃপর বইয়ে বর্ণিত হাদীছটি যঈফ (যঈফুল জামে‘ হা/৫৯৪০)

(৪২) পৃ. ৬০ নিসাব : নগদ অর্থের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কারো কাছে যদি সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্যের মূল্যের সমপরিমাণ নগদ অর্থ পূর্ণ এক বছর জমা থাকে তাহলে তিনি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হিসেবে বিবেচিত হবেন’।

মন্তব্য : এটি ঠিক নয়। কেননা হাদীছে এসেছে ২০ দীনারে অর্ধ দীনার অথবা ২০০ দিরহামে পাঁচ দিরহাম (আবুদাঊদ হা/১৫৭৩)। অর্থাৎ সঞ্চিত নগদ অর্থের ৪০ ভাগের ১ ভাগ বা শতকরা আড়াই টাকা। ‘দীনার’ অর্থ স্বর্ণ মুদ্রা এবং ‘দিরহাম’ অর্থ রৌপ্য মুদ্রা। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর যামানায় ২০ দীনার অর্থাৎ সাড়ে ৭ ভরি (৮৫ গ্রাম) স্বর্ণ ও ২০০ দিরহাম বা সাড়ে ৫২ তোলা রৌপ্যের মূল্য সমপরিমাণ ছিল। কিন্তু বর্তমানে দু’টির মূল্যমানে আকাশ-পাতাল প্রভেদ। সেকারণ মূল্যমানের স্থিতিশীলতার বিবেচনায় স্বর্ণকেই নিছাব হিসাবে গণ্য করা হয়। আল্লামা ইউসুফ কারযাভী বিস্তারিত আলোচনার পর বলেন, একালে স্বর্ণভিত্তিক নিছাব নির্ধারণ করাই আমাদের জন্য বাঞ্ছনীয় (ইসলামের যাকাত বিধান ১/২৫২ পৃ.)

(৪৩) পৃ. ৬২ যাদের উপর হজ্জ ফরজ : …(৮) দৃষ্টিবান হওয়া।

মন্তব্য : এটি একেবারেই ভিত্তিহীন কথা। বরং অন্ধ ব্যক্তি আরাফা ময়দানে পৌঁছতে সক্ষম হ’লে অবশ্যই তার উপরে হজ্জ ফরয। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর বিখ্যাত ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু উম্মে মাকতূম (রাঃ) ছিলেন অন্ধ। এযুগে সঊদী আরবের দৃষ্টিহীন গ্র্যান্ড মুফতী শায়েখ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (১৩৩০-১৪২০ হি./১৯১০-১৯৯৯ খৃ.)-এর মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরসূরী গ্র্যান্ড মুফতী পদে আসীন অন্যতম দৃষ্টিহীন শায়েখ আব্দুল আযীয আলে শায়েখ ১৪০২ হি./১৯৮১ খৃ. থেকে ২০১৫ খৃ. পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৫ বছর পর্যন্ত হজ্জের সময় আরাফা ময়দানে খুৎবা দিয়েছেন।

(৪৪) পৃ. ৬৭ আত্মশুদ্ধি : যে বিদ্যা বা জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে মানুষের অন্তর পূত-পবিত্র হয় এবং আল্লাহ ও তার রাসুল (সাঃ) এর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ করা যায় তাকে ইলমুত তাজকিয়া বলা হয়। এ ধারণাটি ইলমে তাসাওউফ এর সহায়ক ও পরিপূরক। প্রত্যেক মুসলমানের জন্য তাজকিয়া বা আত্মশুদ্ধি অপরিহার্য বিষয়’।… মানুষের শারীরিক রোগের চিকিৎসার জন্য যেমন ডাক্তারের প্রয়োজন, তেমনি আত্মিক রোগের চিকিৎসার মাধ্যমে তাজকিয়া তথা আত্মিক পরিশুদ্ধতা লাভের জন্য কামিল মুরশিদের প্রয়োজন। একজন কামিল মুরশিদ আল্লাহ ও তার রাসুল (সাঃ) এর নির্দেশনা এবং আউলিয়ায়ে কিরামের তরিকা অনুযায়ী ইলমে তাসাওউফ শিক্ষা দানের মাধ্যমে মানুষের অন্তর পরিশুদ্ধ করার জন্য তালিম তারবিয়াত প্রদান করে থাকেন।

মন্তব্য : ইলমুত তাযকিয়া বলে কোন শাস্ত্র ইসলামে নেই। ছালাত-ছিয়াম, যাকাত-হজ্জ সকল ইবাদতই তাযকিয়ায়ে নফ্স বা আত্মশুদ্ধির মাধ্যম। প্রত্যেক মুসলমানের জন্য আত্মশুদ্ধি অপরিহার্য বিষয় নয়। বরং তা অর্জন করা কর্তব্য। কথিত আউলিয়ায়ে কেরামের তরীকা অনুযায়ী নয়। বরং রাসূল (ছাঃ)-এর তরীকা অনুযায়ী ফরয ও নফল ইবাদত সমূহের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জন করতে হবে।

বইয়ের আলোচনার মাধ্যমে আউলিয়ায়ে কেরামের নামে  কথিত পীরপূজা ও কবরপূজার দিকে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করা হয়েছে। অথচ প্রচলিত ছূফীবাদ ভ্রান্ত যুগে সৃষ্ট একটি বিদ‘আতী প্রথা মাত্র। যা মুসলমানকে আল্লাহর বদলে মানুষ পূজায় প্ররোচিত করে।

(৪৫) পৃ. ৬৮   মাতা-পিতার প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য : এখানে আরবী সহ লেখা হয়েছে, নিশ্চয় মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত (আল-জামিউস সগির)।

মন্তব্য : হাদীছটি যঈফ (যঈফুল জামে‘ হা/২৬৬৬)। বরং উক্ত মর্মে ছহীহ হাদীছ হ’ল, فَالْزَمْهَا فَإِنَّ الْجَنَّةَ تَحْتَ رِجْلَيْهَا- ‘অতএব মায়ের সেবায় রত হও। কেননা জান্নাত রয়েছে তার দু’পায়ের নীচে’ (নাসাঈ হা/৩১০৪)। তাই মায়ের সেবা না করে কেবল পায়ের ধূলা নিলেই জান্নাত পাওয়া যাবে না।

(৪৬) পৃ. ৬৯ বড়দের প্রতি সম্মান ও ছোটদের প্রতি স্নেহ : 

এখানে ৭০ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে,مَنْ لَّمْ يَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَلَمْ يُوَقِّرْ كَبِيرَنَا فَلَيْسَ مِنَّا- অর্থ : যে ব্যক্তি ছোটদের স্নেহ করে না আর বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয় (তিরমিজি)

মন্তব্য : উক্ত শব্দে হুবহু তিরমিযীতে কোন হাদীছ নেই। বরং সেখানে রয়েছে, لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَّمْ يَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَيُوَقِّرْ كَبِيرَنَا- অর্থ : ‘সে আমাদের দলভুক্ত নয়, যে আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না ও আমাদের বড়দের সম্মান করে না’ (তিরমিযী হা/১৯১৯)

বইটি ২০১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে ইবতেদায়ী ৫ম শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তকরূপে নির্ধারিত। রচনায় : আবু সালেহ মোঃ কুতবুল আলম, আবু জাফর মুহাম্মদ নুমান ও মোহাম্মদ নজমুল হুদা খান। সম্পাদনায় : অধ্যক্ষ হাফেজ কাজী মোঃ আব্দুল আলীম।

আমার বাংলা বই

ইবতেদায়ি  প্রথম শ্রেণি

পূণর্মুদ্রণ : আগস্ট ২০১৮

(৪৭) বইয়ের শুরু হয়েছে পাখির ছবি দিয়ে অর্থাৎ মলাটের উপর মা-পাখি ও তার ছানাদ্বয়ের চিত্র।

মন্তব্য : এটি একটি অপ্রয়োজনীয় বিষয়। তাছাড়া ইসলামে প্রাণীর ছবি নিষিদ্ধ, যদি সেটি সম্মানের উদ্দেশ্যে হয়।

(৪৮) পাঠ শুরুর আগে জাতীয় সঙ্গীত সংযোজিত হয়েছে যা শিরক মিশ্রিত। কেননা মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি। বাংলা মায়ের সৃষ্টি নয়। আমাদের সন্তানরা আল্লাহর প্রশংসা করবে। মাটিকে মা বলে তার বন্দনা নয়। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ গান লিখেছিলেন ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাবের বিপক্ষে এবং যুক্ত বাংলার পক্ষে। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ চাননি। অথচ বঙ্গভঙ্গ হয়েছে এবং তার ফলেই ১৯৪৭ সালে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ অতঃপর সেই মানচিত্রের উপরেই ১৯৭১ সালে আমরা স্বাধীন ‘বাংলাদেশ’ লাভ করেছি। তাহ’লে কি এই গানের মাধ্যমে বাংলাদেশকে তার স্বাধীনতা হারিয়ে এপার বাংলা ওপার বাংলা যুক্ত করে পুনরায় ভারত ভুক্ত হওয়ার দিকে শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে?

তাছাড়া দেশপ্রেম মানুষের সত্তাগত বিষয়। এটি গান গেয়ে প্রকাশ করার বিষয় নয়। যারা এ গান জানেনা বা এ গান গায় না, তাদের মধ্যে কি দেশপ্রেম নেই? অতএব শিক্ষার্থীরা ‘বিসমিল্লাহ’ বলে পাঠ শুরু করবে, এটাই হবে কাম্য।

(৪৯) সংকলন, রচনা ও সম্পাদনা পৃষ্ঠাতে পহেলা বৈশাখের ইঙ্গিতপূর্ণ ছবি সংযোজন।

মন্তব্য : পহেলা বৈশাখ ইসলামী কোন পর্ব নয়। এমনকি বাঙ্গালীরও কোন পর্ব নয়। এটি পরবর্তীকালে শাসকদের সৃষ্ট।

(৫০) বইয়ের সূচিপত্রের পৃষ্ঠাতে একটি ছোট্ট মেয়ে দু’টি ছেলের হাত ধরে খেলছে।

মন্তব্য : এভাবে ছোট থেকেই ছেলে ও মেয়ের পার্থক্য দূর করার চেষ্টা হচ্ছে। যা মানুষের স্বভাববিরুদ্ধ ও ইসলাম বিরোধী। বড়কথা এভাবে নারী-পুরুষের ছবি দিয়ে লেখাপড়া শিখানোর নীতি ইসলাম সম্মত নয়। আজকের কিশোর অপরাধ ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার পিছনে এইসব ছবির প্রতিক্রিয়া আছে কি না ভেবে দেখা আবশ্যক।

(৫১) পৃ. ১,২,৩,৪-য়ে ছেলে ও মেয়েদের ছবিতে ভরে দেওয়া হয়েছে।

মন্তব্য : বুঝানো হচ্ছে যে, মাদরাসায় সহশিক্ষা চালু আছে, যা ইসলাম বিরোধী। ২য় পৃষ্ঠায় একটি মেয়ের নেতৃত্বে ছেলে-মেয়ে সবাই দু’হাত তুলে শপথবাক্য পাঠ করছে। পিছনে একজন শিক্ষক ও তিনজন শিক্ষিকা দাঁড়িয়ে আছেন।

এর মাধ্যমে ইসলামের পর্দার বিধানকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। নারী নেতৃত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং ইসলামের শপথের বিধানকে অস্বীকার করা হয়েছে। কেননা ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে শপথ নিল, সে কুফরী করল অথবা শিরক করল’ (তিরমিযী হা/১৫৩৫)। তাছাড়া শিক্ষক-শিক্ষিকারা শপথ করছেন বলে মনে হচ্ছেনা। তাহ’লে সেটা করতে বাচ্চাদের বাধ্য করা হচ্ছে কেন?

৩য় পৃষ্ঠায় ক্লাসের শিক্ষিকা বাদে যে ১১জন বালক-বালিকার ছবি দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে এনাম ও ওমর বাদে বাকী সব নামই অনৈসলামিক এবং লিঙ্গহীন। যেমন অমি, ইমন, ঈশিতা, আলো, ঋতু, উমং, ঊর্মি, ঐশী, ঔছন ইত্যাদি। এসব নামে বুঝার উপায় নেই যে, শিশুরা মুসলিম না অমুসলিম? বুঝার উপায় নেই কোন নামটি বালকের বা কোন নামটি বালিকার। এভাবে সুকৌশলে লিঙ্গ বৈপরিত্যের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। যা অবাস্তব এবং যা সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিবে।

একই পৃষ্ঠার নীচে ছবিতে একটি ছেলে ও একটি মেয়ের মধ্যে পরস্পরে কুশলবার্তা দেখানো হয়েছে। এতে উভয়ের মধ্যে ভবিষ্যতে অবৈধ সম্পর্কের গোড়াপত্তন হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। ইসলাম শুরু থেকেই সহশিক্ষা বাতিলের মাধ্যমে এই অনৈতিক আশংকা থেকে জাতিকে মুক্ত করেছে।

৪র্থ পৃষ্ঠায় ছেলে-মেয়েরা এক সাথে খেলা করা সহ সব কাজ করছে। যা আদৌ শোভনীয় নয়।

(৫২) পৃ. ৫                                                       ছড়া

আতা গাছে তোতা পাখি

ডালিম গাছে মউ।

এত ডাকি তবু কথা

কও না কেন বউ।

মন্তব্য : এখানে উপবিষ্ট একজন নতুন বউয়ের পিছনে দাঁড়িয়ে তাকে লক্ষ্য করে একটি ছেলে শিশু ছড়াটি বলছে। যোগীন্দ্রনাথ সরকার (১৮৬৬-১৯৩৭ খৃ.) লিখিত এই কবিতাটি যুগ যুগ ধরে চলছে। আর এটাকেই মাদ্রাসার ১ম শ্রেণীর বাংলা বইয়ের ১ম কবিতা হিসাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে তাকে কি শিখানো হচ্ছে? ছোট বাচ্চাকে তার সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সন্ধান না দিয়ে ধারণা দেওয়া হচ্ছে নতুন বউয়ের! এখন থেকে সে তার সহপাঠী মেয়েদেরকে তার বউ ভাবতে শুরু করবে। পরিণামে যা হবার তাই হচ্ছে। আজ কিশোর অপরাধীরা যে ভয়ংকর ব্যভিচারী হয়ে উঠেছে, তার অন্যতম কারণ হ’ল, এইসব যৌন সুড়সুড়ি দেওয়া ফালতু শিক্ষা। পিতা-মাতারা তাদের সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠান দ্বীন শিক্ষার জন্য। এগুলি শিক্ষার জন্য নয়।

(ক্রমশঃ)

[1]হায়ছামী, মাজমা‘উয যাওয়ায়েদ হা/১৮৩১০; সুয়ূত্বী, জামে‘উল কাবীর হা/১১১; আলবানী, যঈফুত তারগীব হা/২০৮২; যঈফাহ হা/৬৮৯৫।

[2]. ইবনু কাছীর, তাফসীর সূরা সাজদাহ ১১ আয়াত; আলবানী, যঈফুত তারগীব হা/২০৮২।  

[3]. ছহীহ ইবনু হিববান হা/৪৬৬৩, সনদ ‘হাসান’।

[4]. বুখারী হা/৯১২; মিশকাত হা/১৪০৪ ‘খুৎবা ও ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৪৫; ফাৎহ ২/৪৫৮। ‘যাওরা বাজার’ বর্তমানে মসজিদে নববীর আঙিনার অন্তর্ভুক্ত।

[5]. ইরওয়াউল গালীল হা/৪২৭; মির‘আত ৪/২৯৯, ‘কুনূত’ অনুচ্ছেদ-৩৬।

[6]আবুদাঊদ হা/১৪২৫ প্রভৃতি; মিশকাত হা/১২৭৩; ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) ১৬৭-৬৮ পৃ.।  

[7]. মিশকাত হা/১৩০২; ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) ১৭৩-৭৫ পৃ.

[8]. বাক্বারাহ ১৮৭; বুখারী হা/২০৩৩; বুঃ মুঃ মিশকাত হা/২০৯৭; আবুদাঊদ হা/২৪৭৩; মিশকাত হা/২১০৬ ‘ই‘তিকাফ’ অনুচ্ছেদ


-মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব

#SotterDikeAhobban    

Tags

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close