preloder
সাম্প্রতিক-বিষয়াদি

অনলাইন শাইখ : হায়! আমি যদি লজ্জায় মরে যেতাম।

আখতার বিন আমীর

▪এক,

মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে – মানুষ আত্ন-প্রশংসা শুনতে ভালবাসে! কেউ চুপিসারে কেউবা প্রকাশ্যে! ভুরি-ভুরি আর্টিকেল রচনা, জ্বালাময়ী বক্তব্য কিংবা টুকটাক অনুবাদের প্রতিদান স্বরূপ “আত্ন প্রশংসা” শুনতে কার না ভাল লাগে!? অথচ আমাদের জেনে রাখা আবশ্যক যে, অবাস্তব প্রশংসা মানুষকে গোনাহের দিকে নিয়ে যায়। এমনকি অতিরিক্ত প্রশংসা মানুষকে অহংকারী, নীচুতা ও লজ্জাহীনতার দিকে ধাবিত করে।

অতি সম্প্রতি আমরা লক্ষ্য করছি – কিছু ভাই ( যাঁরা মুলত লেহম্যান) অনলাইনে বিভিন্ন গ্রুপ খুলে প্রশ্নোত্তর দিচ্ছেন! ম্যাসেঞ্জারে কিংবা হটসএ্যাপে মাহরাম, নন – মাহরামদের ক্লাস নিচ্ছেন! উম্মাহর বড়ো বড়ো বিষয়গুলি নিয়ে এমনভাবে কথা বলছেন – যেন তিনি নিজেই একজন মস্তবড়ো আলিম! মুখরোচক বক্তব্য আর চমকপ্রদ লিখনি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাদের শুভাকাঙ্ক্ষীরা ঐ ব্যক্তিদেরকে “শাইখ” পর্যায়ে পর্যন্ত নিয়ে যাচ্ছেন! — [ আল ইয়াযু বিল্লাহ ]।
.

আমরা আরও আশ্চর্য হয়েছি যে, আলিমদের লেকচার শুনে, বই পড়ে, ফাতওয়াগুলি অনুবাদ করে দ্বীনের খেদমতের আঞ্জাম দেয়া এসকল ভাইয়েরা নিজেকে অন্যের সামনে বড়ো হিসেবে যাহির করার জন্য মিথ্যাচারের আশ্রয় পর্যন্ত নিচ্ছেন ! ছাত্র-ছাত্রী মহলে গ্রহনযোগ্যতা বাড়াতে কেউ কেউ আগ বাড়িয়ে এটাও দাবী করছেন যে, “আমি উমুক – উমুক ইমামদের ছাত্র!” অথচ উক্ত ইমামদের ছাত্র হওয়া তো দূরের কথা আজ পর্যন্ত সরাসরি তাঁদের সাক্ষাৎ পর্যন্ত পান নি। এতবড়ো মিথ্যার দোষে-দুষ্ট হয়েও এইলোকগুলি অনলাইনে “শাইখ” সেজে বসে আছেন!

▪দুই,

প্রিয় ভ্রাতৃবৃন্দ! নিশ্চয়ই আপনার সম্বন্ধে আপনিই সর্বাধিক জ্ঞাত। আপনার ইলমের দৌড় কতদূর সেটি আপনার চেয়ে অন্য কেউ বেশি জানে না। তাই আপনাকে সতর্ক হতে হবে যে, জনসমুদ্রের সামনে বাড়াবড়ি পর্যায়ের প্রশংসা যেন আপনার অন্তরকে গাফেল করে না দেয়! আবার আপনিও যেন নিজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে না পড়েন।

আপনার বিশ্বাস থাকা আবশ্যক যে, প্রশংসা কিংবা নিন্দা কোনটাই কাল কেয়ামতের দিন কাজে আসবেনা। লোকেরা আপনাকে কেমন জ্ঞান করল সেটি বিবেচ্য নয় বরং আপনি কেমন, কেমন আপনার অন্তর সেটিই বিবেচ্য। তাই লোকেরা আপনাকে সম্মান করে শাইখ বলে ডাকল, সুতরাং এর উপর ভিত্তি করে আপনিও নিজেকে সম্মানিত জ্ঞান করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলবেন কিংবা নিজের ঢোল নিজেই পিটাবেন-এমনটা কাম্য নয়। মানুষ যতই আপনার প্রশংসা করুক না কেন, মানুষের প্রশংসার উপর আপনার বিচার হবে এমন আত্মপ্রবঞ্চনায় পতিত হবেন না! মহান আল্লাহ বলেন,
“তিনি তোমাদের সম্পর্কে ভাল জানেন, যখন তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন মৃত্তিকা থেকে এবং যখন তোমরা মাতৃগর্ভে কচি শিশু ছিলে। অতএব তোমরা আত্নপ্রশংসা করো না। তিনি ভাল জানেন কে সংযমী।’
—– [ সুরা নাজম, আয়াত : ৩২ ]

.
আবদুর রহমান ইবনু আবূ বাকরাহ (রাহিমাহুল্লাহ ) হতে তার পিতা থেকে বর্ণিত ___

حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ يُونُسَ، حَدَّثَنَا أَبُو شِهَابٍ، عَنْ خَالِدٍ الْحَذَّاءِ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي بَكْرَةَ، عَنْ أَبِيهِ، أَنَّ رَجُلاً، أَثْنَى عَلَى رَجُلٍ عِنْدَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ لَهُ ‏”‏ قَطَعْتَ عُنُقَ صَاحِبِكَ ‏”‏ ‏.‏ ثَلاَثَ مَرَّاتٍ ثُمَّ قَالَ ‏”‏ إِذَا مَدَحَ أَحَدُكُمْ صَاحِبَهُ لاَ مَحَالَةَ فَلْيَقُلْ إِنِّي أَحْسِبُهُ كَمَا يُرِيدُ أَنْ يَقُولَ وَلاَ أُزَكِّيهِ عَلَى اللَّهِ ‏”‏ ‏.

“এক ব্যক্তি নবী (সাল্লাল্লাহি ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে অন্য এক লোকের প্রশংসা করলে তিনি লোকটিকে তিনবার বলেন, তুমি তো তোমার সঙ্গীর গলা কেটে দিলে। অতঃপর তিনি বললেন, যদি তোমাদের কেউ একান্তই তার সঙ্গীর প্রশংসা করতে চায়, তাহলে সে যেন বলে, আমি তাকে এরূপ মনে করি, তবে আল্লাহর নিকট তাকে নির্দোষ মনে করি না।
—- [ সুনানে আবু দাউদ : ৪৮০৫ ]
.

▪তিন,

“লোকেরা আমাকে ম্যাসেঞ্জার শাইখ, হটসএ্যাপ শাইখ, গুগল শাইখ কিংবা ফেবু শাইখ বলে ডাকে” এতে আত্নতৃপ্তিতে না ভুগে, নিজেকে ধিক্কার দেয়া উচিত।
ইলমের বাহক তথা উলামায়ে কেরামগন কখনোই
মানুষের প্রশংসায় প্রতারিত হতেন না। চলুন আপনাকে গত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ আলিমদের গল্প শোনাই —
.

⦁ সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতী, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ ও মুহাদ্দিস, উস্তাযুল আলিম, আশ শাইখুল আল্লামাহ, ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] সম্পর্কে শাইখ ফালাহ [ হাফিয্বাহুল্লাহ ] বলেন —

“একদা ইমাম ইবনু বায [রাহিমাহুল্লাহ] দারস দিচ্ছিলেন, এমন সময় এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে কিছু বলতে চাইলেন!
শুরুতেই তিনি প্রশংসাসুলভ “হে আল্লামাহ” বলে সম্মোধন করলেন ! তাতেই ইমাম ইবনু বায [রাহিমাহুল্লাহ] রেগে গিয়ে বলেন -” আজকের পর থেকে আপনি যদি আমাকে “আল্লামাহ” বলে সম্মোধন করেন তাহলে আমার দারসে আসার দরকার নেই। আমি তো একজন ত্বলেবুল ইলম মাত্র ! ”
— [ শাইখের ভিডিয়ো থেকে গৃহীত ]
.

⦁ মুহাদ্দিসুল ‘আসর, আল-ফাক্বীহ, আল-মুজাদ্দিদ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] – সম্পর্কে উস্তায আকমাল হোসাইন [ হাফিয্বাহুল্লাহ ] বলেন —

“একটি পোস্টারে ইমাম আল আলবানী [রাহিমাহুল্লাহ] তাঁর নামের আগে “ফাদ্বীলাতুস শাইখ” লিখা দেখে খুবই রাগ করেন এবং কর্তৃপক্ষকে বলেন ভবিষ্যতে যেন তারা এমনটা না করে! অথচ মানুষের অন্তর জগতে তিনি ছিলেন শাইখুল মাশায়েখ, মুহাদ্দীসুল মুহাদ্দীসিন, মুআল্লিমুল মুহাদ্দীসিন!
— [ উস্তাযের ভিডিয়ো থেকে গৃহীত ]
.

একদা ইমাম আল আলবানী [ রাহিমাহুল্লাহ ]-র দারসের শুরুতে তাঁর এক ছাত্র শিক্ষক হিসেবে ইমাম আল আলবানীকে একটু সম্মানসূচক কিছু কথাবার্তা বলেন! ছাত্রের প্রশংসা শুনে ভয় ও বিনয়ে শাইখ কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তিনি [ ইমাম আলবানী রাহিমাহুল্লাহ ] প্রায়ই বলতেন, أنا طُوَيْلِبُ العلم ‘আমি নগণ্য জ্ঞানান্বেষী মাত্র’।

তাঁর ঘনিষ্ট ছাত্র ইছাম হাদী একদিন তাঁকে বললেন, “আপনি যদি নিজেকে নগণ্য জ্ঞান না করে কেবল طالب علم বা ‘জ্ঞানান্বেষী’ বলতেন, তাহ’লে আমাদের মত ছাত্ররা নিজেদেরকে طويلب العلم বলতে পারতাম! ইমাম আলবানী [ রাহিমাহুল্লাহ ] হেসে ফেললেন এবং পুনরায় বললেন, না আমি طويلب العلم বা ‘নগণ্য জ্ঞানান্বেষী। ”
— [ ইমাম আলবানীর জীবনী থেকে গৃহীত ]
.

⦁ কিছুদিন আগে মিশরের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ মুহাম্মাদ বিন সা‘ঈদ রাসলান (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৯৫৫ খ্রি.] এর একটি ভিডিয়ো দেখলাম! তিনি তাঁর ছাত্রদেরকে আল্লাহর কসম করে বলছেন — “তোমরা আমার হাতে চুমু খাবেনা! ছাত্ররা দু:খিত হয়ে বললো, হে শাইখ, কেনো? আলিমদের হাতে চুমু খাওয়া-তো শরীয়াহ বিরোধী কোনো কাজ না।
জবাবে তিনি [ হাফিয্বাহুল্লাহ ] বলেন, “আমি নিজেকে আলিম মনে করিনা !”
— [ শাইখের ভিডিয়ো থেকে গৃহীত ]
.

প্রিয় পাঠক! আশা করব উপরিউক্ত ঘটনাপ্রবাহ দ্বারা
আপনার টনক নড়বে [ ইনশা আল্লাহ ]। এ-কথাটি সুনিশ্চিতভাবে জেনে রাখুন যে, এগুলো হল আমাদের দৈন্যতা, জাহালত, বদ আখলাকের বিপরীতে যুগশ্রেষ্ঠ উলামায়ে কেরামের দ্বীনদারিত্ব, তাক্বওয়া, বিনয় ও পরহেজগারীতা।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ’লা ধোঁকাগ্রস্থ ভাইদের সুমতি দান করুন, আমাদেরকে আহলুস সুল্লাহ-র উলামায়ে ক্বেরামের ইত্তেবাহ এবং পাতি শাইখদের ছেড়ে দিয়ে সত্যিকার শাইখদের কদর করার তাওফীক্ব দান করুন। [আ – মীন ]


আখতার বিন আমীর ভাইয়ের ফেসবুক ওয়াল থেকে

#SotterDikeAhobban

Tags

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close