preloder
ছিয়াম

মাহে রামাযানের পূর্ব প্রস্ত্ততি

ক্ষমা, রহমত ও মুক্তির অনন্য বার্তা নিয়ে শ্রেষ্ঠ মাস রামাযান আমাদের নিকটে প্রায় সমাগত। প্রত্যেক মুমিনের হৃদয় এই মহা সম্মানিত মাসের অপেক্ষায় সদা উদগ্রিব থাকে। রামাযানে আল্লাহর রহমত, ক্ষমা ও নাজাতের জন্য আমাদের উচিত এই মাসকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা ও কঠোর পরিশ্রম এবং সাধনার মাধ্যমে ইবাদতে আত্মনিয়োগ করা। এজন্য চাই বেশ কিছু কর্মভিত্তিক পূর্ব প্রস্ত্ততি। যা নিয়ে ইবাদতের সাধনায় আত্মনিয়োগ করলে সফলতা আসবে ইনশাআল্লাহ। নিম্নে তা সংক্ষেপে উল্লেখ করা হ’ল-

(১) খালেছ নিয়তে ইবাদতের দৃঢ় সংকল্প করা :

যেকোন কাজে সফলতার পূর্বশর্ত হ’ল সেই বিষয়ে দৃঢ় সংকল্প করা। আর ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য খালেছ নিয়তের বিকল্প নেই। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، ‘নিশ্চয়ই সকল কাজের ফলাফল নিয়তের উপর নির্ভরশীল’।[1]

(২) শা‘বান মাস থেকেই ইবাদতে আত্মনিয়োগ করা :

মহিমান্বিত রামাযান মাসে সফলতা লাভ করতে হ’লে শা‘বান মাস থেকেই নেক আমল আরম্ভ করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) শা‘বান মাসে অধিক হারে ছিয়াম পালন করতেন। আয়েশা (রাঃ) বলেন,كَانَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَصُومُ حَتَّى نَقُولَ لاَ يُفْطِرُ، وَيُفْطِرُ حَتَّى نَقُولَ لاَ يَصُومُ فَمَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم اسْتَكْمَلَ صِيَامَ شَهْرٍ إِلاَّ رَمَضَانَ، وَمَا رَأَيْتُهُ أَكْثَرَ صِيَامًا مِنْهُ فِى شَعْبَانَ، ‘আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) একাধারে (এত অধিক) ছিয়াম পালন করতেন যে, আমরা বলাবলি করতাম, তিনি আর ছিয়াম পরিত্যাগ করবেন না। (আবার কখনো এত বেশী) ছিয়াম পালন না করা অবস্থায় একাধারে কাটাতেন যে, আমরা বলাবলি করতাম, তিনি আর (নফল) ছিয়াম পালন করবেন না। আমি রাসূল (ছাঃ)-কে রামাযান ব্যতীত পূর্ণ মাস ছিয়াম পালন করতে দেখিনি এবং শা‘বান মাসের চেয়ে কোন মাসে এতো অধিক (নফল) ছিয়াম পালন করতে দেখিনি’।[2]

(৩) তওবা করে গুনাহ হ’তে সম্পূর্ণরূপে ফিরে আসা :

বিভিন্ন পাপের দ্বারা মানুষের আমলনামা কালিমালিপ্ত হয়ে যায়। রামাযান আসে সে পাপ মোচনের জন্য। বিধায় পাপ হ’তে ফিরে এসে তওবার মাধ্যমে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে ইবাদতে মনোযোগী হ’তে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,يَاأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا تُوبُوْا إِلَى اللهِ تَوْبَةً نَصُوْحًا عَسَى رَبُّكُمْ أَنْ يُكَفِّرَ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيُدْخِلَكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِيْ مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ، ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে খালেছ তওবা কর। আশা করা যায় তোমাদের রব তোমাদের পাপ সমূহ মোচন করবেন এবং তোমাদেরকে এমন জান্নাত সমূহে প্রবেশ করাবেন যার তলদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত’ (তাহরীম ৬৬/৮)।

রাসূল (ছাঃ) বলেন,يَا أَيُّهَا النَّاسُ تُوْبُوْا إِلَى اللهِ فَإِنِّىْ أَتُوْبُ فِى الْيَوْمِ إِلَيْهِ مِائَةَ مَرَّةٍ. ‘হে মানবজাতি! তোমরা আল্লাহর নিকটে তওবা কর; কারণ, আমি তাঁর কাছে দিনে একশতবার তওবা করি’।[3] তিনি আরো বলেন,وَاللهِ إِنِّى لأَسْتَغْفِرُ اللهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ فِى الْيَوْمِ أَكْثَرَ مِنْ سَبْعِيْنَ مَرَّةً. ‘আল্লাহর শপথ! আমি প্রতিদিন আল্লাহর কাছে সত্তরবারেরও অধিক ইস্তিগফার ও তওবাহ করে থাকি’।[4] রাসূল (ছাঃ)-এর পূর্বাপর সব গোনাহ আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। অথচ এরপরও তিনি প্রতিদিন ৭০ থেকে ১০০ তওবা করেন। সুতরাং আমাদেরকেও গোনাহ থেকে অধিকহারে তওবা করা আবশ্যক।

(৪) কাযা ছিয়াম থাকলে তা আদায় করে নেওয়া :

বিভিন্ন কারণে অনেকের ছিয়াম কাযা হ’তে পারে। হয়ত নানা ব্যস্ততার কারণে যা আদায় করা হয়নি। রামাযানের পূর্বেই শা‘বান মাসের মধ্যেই তা আদায় করে নিতে হবে। আয়েশা (রাঃ) বলেন,كَانَ يَكُوْنُ عَلَىَّ الصَّوْمُ مِنْ رَمَضَانَ، فَمَا أَسْتَطِيْعُ أَنْ أَقْضِىَ إِلاَّ فِىْ شَعْبَانَ، ‘আমার উপর রামাযানের যে কাযা হয়ে যেত তা পরবর্তী শা‘বান ব্যতীত আমি আদায় করতে পারতাম না’।[5]

(৫) রামাযানের ফযীলত অবগত হওয়া :

আল্লাহর অশেষ রহমতের পসরা নিয়ে রামাযান আগমন করে। রাসূল (ছাঃ) বলেন,إِذَا كَانَ رَمَضَانُ فُتِحَتْ أَبْوَابُ الرَّحْمَةِ وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ جَهَنَّمَ وَسُلْسِلَتِ الشَّيَاطِيْنُ، ‘যখন রামাযান মাস আসে, তখন রহমতের দরজা খুলে দেওয়া হয়। জাহান্নামের দরজা বন্ধ করা হয় এবং শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়’।[6] এছাড়া রামাযান অশেষ ফযীলতপূর্ণ মাস। এ মাসে কুরআন নাযিল হয়েছে। এ মাসেই লায়লাতুল ক্বদর রয়েছে, যা হাযার মাস ইবাদত অপেক্ষা উত্তম। এ মাসে বহু মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। এ মাসের ছিয়াম ও ক্বিয়ামের মাধ্যমে পূর্ববর্তী গোনাহ থেকে মুক্তি লাভ হয়। সুতরাং এ মাসের এ ফযীলতের দিকগুলো অবগত হয়ে সে অনুযায়ী পূর্বপ্রস্ত্ততি গ্রহণ করলে রামাযানে অধিক নেক আমল করা সম্ভব হবে এবং ইবাদতের ব্যাপারে প্রবল আগ্রহ সৃষ্টি হবে ইনশাআল্লাহ।

(৬) রামাযান বিষয়ক মাসআলা জেনে নেওয়া :

রামাযান সম্পর্কিত নানা মাসআলা জেনে নেওয়া উচিত। যাতে রামাযানের ছিয়াম ত্রুটিপূর্ণ হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। সেই সাথে অনেক বিষয় অজ্ঞাত থাকার ফলে নানা অসুবিধা ও কষ্ট থেকে বাঁচা যায়। যেমন সফরকালে ছিয়াম ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ, ভুল বশত খেলে ছিয়াম ভঙ্গ না হওয়া, প্রবল ঘুমের কারণে সাহারী খেতে না পারলেও ছিয়াম সিদ্ধ হওয়া এবং স্বপ্নদোষের কারণে ছিয়াম ভঙ্গ না হওয়া ইত্যাদি মাসআলা জানা থাকলে তাৎক্ষণিক বিভিন্ন সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

(৭) নফস ও শয়তানের কু-মন্ত্রণা হ’তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ রাখা :

মানুষের অন্তর মন্দপ্রবণ। আল্লাহ বলেন,إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوْءِ، ‘নিশ্চয়ই মানুষের মন মন্দপ্রবণ’ (ইউসুফ ১২/৫৩)। অপরদিকে শয়তান সর্বদা মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য ব্যস্ত রয়েছে। আল্লাহ শয়তানের ভাষ্য উল্লেখ করে বলেন,فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِيْنَ ‘আপনার ইয্যতের কসম! আমি অবশ্যই তাদের সবাইকে বিপথগামী করব’ (ছোয়াদ ৩৮/৮২)। সুতরাং ইবাদতের ক্ষেত্রে অন্তরায় হ’ল মানুষের নফসে আম্মারা ও শয়তানের কু-মন্ত্রণা। এই মাসে যদিও শয়তান শৃংখলিত থাকে তবুও ষড়রিপুর তাড়নায় মানুষ অন্যায় ও পাপ করে বসে। অনেক সময় নিজেকে ইবাদতে মশগূল রাখতে পারে না। তাই এই বিষয়ে সতর্ক ও সচেতন হয়ে তা মোকাবেলা করতে হবে।

(৮) রামাযানের আগমনে আনন্দিত হওয়া :

রামাযান মাস নেকী অর্জন ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের মাস। সুতরাং আল্লাহ প্রদত্ত এ নে‘মত লাভের সুযোগ পেয়ে মুমিন হৃদয় আনন্দে উদ্বেলিত হবে এটাই স্বাভাবিক। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,قُلْ بِفَضْلِ اللهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُوْا هُوَ خَيْرٌ مِمَّا يَجْمَعُوْنَ، ‘বল, আল্লাহর এই দান (কুরআন) ও তাঁর রহমতের (ইসলামের) কারণে তাদের আনন্দিত হওয়া উচিত। এটি তারা যা কিছু সঞ্চয় করেছে সেসব থেকে অনেক উত্তম’ (ইউনুস ১০/৫৮)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, لِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ يَفْرَحُهُمَا إِذَا أَفْطَرَ فَرِحَ بِفِطْرِهِ وَإِذَا لَقِيَ رَبَّهُ فَرِحَ بِصَوْمِهِ، ছিয়াম পালনকারীর জন্য দু’টি আনন্দের মুহূর্ত রয়েছে, যখন সে আনন্দিত হয়। যখন ইফতার করে তখন সে আনন্দিত হয়। আর যখন সে তার প্রভুর সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন তার ছওমের কারণে আনন্দিত হবে’।[7] নেকী অর্জনের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এই আনন্দকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য প্রস্ত্ততি গ্রহণ করা যরূরী।

(৯) পূর্ববর্তী রামাযানের ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা :

রামাযানের ফযীলত লাভ করার জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করতে হবে। ইবাদতের মাধ্যমে রামাযানে নিজেকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করতে না পারলে তা হবে চরম ব্যর্থতা। হযরত মালেক ইবনুল হুওয়াইরিছ (রাঃ) বলেন,

صَعِدَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمِنْبَرَ فَلَمَّا رَقِيَ عَتَبَةً قَالَ آمِينَ ثُمَّ رَقِيَ عَتَبَةً أُخْرَى فقَالَ آمِينَ ثُمَّ رَقِيَ عَتَبَةً ثَالِثَةً فقَالَ آمِينَ ثُمَّ قَالَ أَتَانِي جِبْرِيلُ فقَالَ يَا مُحَمَّدُ مَنْ أَدْرَكَ رَمَضَانَ فَلَمْ يُغْفَرْ لَهُ فَأَبْعَدَهُ اللهُ قُلْتُ آمِينَ قَالَ وَمَنْ أَدْرَكَ وَالِدَيْهِ أَوْ أَحَدَهُمَا فَدَخَلَ النَّارَ فَأَبْعَدَهُ اللهُ قُلْتُ آمِينَ فقَالَ وَمَنْ ذُكِرْتَ عِنْدَهُ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيْكَ فَأَبْعَدَهُ اللهُ قُلْ آمِينَ فَقُلْتُ آمِينَ-

‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মিম্বরে আরোহণ করলেন। অতঃপর ১ম সিঁড়িতে পা দিয়ে বললেন, আমীন! ২য় সিঁড়িতে পা দিয়ে বললেন, আমীন! এরপর ৩য় সিঁড়িতে পা দিয়ে বললেন, আমীন! লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনাকে তিন সিঁড়িতে তিন বার ‘আমীন’ বলতে শুনলাম। তিনি বললেন, আমি যখন ১ম সিঁড়িতে উঠলাম, তখন জিব্রীল আমাকে এসে বললেন, হে মুহাম্মাদ! যে ব্যক্তি রামাযান মাস পেল। অতঃপর মাস শেষ হয়ে গেল। কিন্তু তাকে ক্ষমা করা হ’ল না, সে জাহান্নামে প্রবেশ করল। আল্লাহ তাকে স্বীয় রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দিলেন। আমি বললাম, আমীন’! ২য় সিঁড়িতে উঠলে জিব্রীল বললেন, যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে বা তাদের একজনকে পেল। অথচ সে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করল না, সে জাহান্নামে প্রবেশ করল। আল্লাহ তাকে স্বীয় রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দিলেন। আমি বললাম, আমীন! অতঃপর ৩য় সিঁড়িতে পা দিলে তিনি বললেন, যার নিকটে তোমার কথা বলা হ’ল, অথচ সে তোমার উপরে দরূদ পাঠ করল না। অতঃপর সে মারা গেল, সে জাহান্নামে প্রবেশ করল। আল্লাহ তাকে স্বীয় রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দিলেন। তুমি বল, আমীন। আমি বললাম, আমীন’![8]

অন্যত্র তিনি বলেন, أَتَاكُمْ رَمَضَانُ شَهْرٌ مُبَارَكٌ فَرَضَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ عَلَيْكُمْ صِيَامَهُ تُفْتَحُ فِيهِ أَبْوَابُ السَّمَاءِ وَتُغْلَقُ فِيهِ أَبْوَابُ الْجَحِيمِ وَتُغَلُّ فِيهِ مَرَدَةُ الشَّيَاطِيْنِ لِلَّهِ فِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ مَنْ حُرِمَ خَيْرَهَا فَقَدْ حُرِمَ، ‘তোমাদের জন্য রমাযানের বরকতময় মাস এসেছে। এ মাসে ছিয়াম রাখা আল্লাহ তোমাদের জন্য ফরয করে দিয়েছেন। এ মাসে আসমানের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় এবং বন্ধ করে দেয়া হয় জাহান্নামের সব দরজা। এ মাসে বিদ্রোহী শয়তানগুলোকে বন্দি করা হয়। এ মাসে একটি রাত আছে যা হাযার মাস অপেক্ষা উত্তম। যে ব্যক্তি এ রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হ’ল, সে অবশ্যই প্রত্যেক কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত রইল’।[9] সুতরাং কল্যাণ বঞ্চিত না হয়ে এবং রামাযানে নিজেকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করতে না পারার ব্যর্থতা ঘোচাতে রামাযানে সাধ্যমত ইবাদত-বন্দেগী, যিকর-আযকার ও তাসবীহ, তেলাওয়াতের মাধ্যমে পূর্ণ নেকীর হকদার হওয়ার জন্য চেষ্টা করতে হবে।

(১০) আল্লাহর নিকটে তাওফীক কামনা ও কঠোর পরিশ্রম করা :

রামাযানে ছিয়াম পালন ও ফরয ছালাত সহ অধিক নফল ছালাত আদায় করার চেষ্টা করা এবং এজন্য আল্লাহর নিকটে তওফীক কামনা করতে হবে। কেননা এ মাসে বেশী বেশী ছিয়াম-ক্বিয়ামের গুরুত্ব অপরিসীম। তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, দু’ব্যক্তি দূর-দূরান্ত থেকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট আসলো। তারা ছিল খাঁটি মুসলমান। তাদের একজন ছিল অপরজন অপেক্ষা শক্তিধর মুজাহিদ। তাদের মধ্যকার মুজাহিদ ব্যক্তি যুদ্ধ করে শহীদ হ’ল এবং অপরজন এক বছর পর মারা গেল। তালহা (রাঃ) বলেন, আমি একদা স্বপ্নে দেখলাম যে, আমি জান্নাতের দরজায় উপস্থিত এবং আমি তাদের সাথে আছি। জান্নাত থেকে এক ব্যক্তি বের হয়ে এসে তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি পরে মারা গিয়েছিল তাকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দিল। সে পুনরায় বের হয়ে এসে শহীদ ব্যক্তিকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দিল। পরে সে আমার নিকট ফিরে এসে বলল, তুমি চলে যাও। কেননা তোমার (জান্নাতে প্রবেশের) সময় এখনও হয়নি, তোমার পালা পরে। সকাল বেলা তালহা (রাঃ) উক্ত ঘটনা লোকেদের নিকট বর্ণনা করলেন। তারা এতে বিস্ময়াভিভূত হ’ল। বিষয়টি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কানে গেল এবং তারাও তাঁর কাছে ঘটনা বর্ণনা করল। তিনি বললেন, কি কারণে তোমরা বিস্মিত হ’লে? তারা বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই ব্যক্তি তাদের দু’জনের মধ্যে অধিকতর শক্তিধর মুজাহিদ। তাকে শহীদ করা হয়েছে। অথচ অপর লোকটি তার আগেই জান্নাতে প্রবেশ করল! রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, অপর লোকটি কি তার পরে এক বছর জীবিত থাকেনি? তারা বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, সে একটি রামাযান মাস পেয়েছে, ছিয়াম রেখেছে এবং এক বছর যাবত এই এই ছালাত কি পড়েনি? তারা বলল, হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, আসমান-যমীনের মধ্য যে ব্যবধান রয়েছে,

তাদের দু’জনের মধ্যে রয়েছে তার চেয়ে অধিক ব্যবধান’।[10]

উপরোক্ত ফযীলত লাভ করার জন্য আল্লাহর কাছে তাওফীক ও সাহায্য চাইতে হবে। সেই সাথে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজে সফল হওয়ার চেষ্টা করতে হবে।

(১১) পরস্পরের মধ্যে বিদ্যমান বিবাদ মীমাংসা করে নিতে হবে :

রামাযানে মহান আল্লাহ অনেক মানুষকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু যাদের মাঝে বিবাদ-বিসম্বাদ আছে, তাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করেন না, যতক্ষণ না তারা তাদের মধ্যকার বিবাদ মিটিয়ে নেয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন,تُفْتَحُ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ يَوْمَ الِاثْنَيْنِ وَيَوْمَ الْخَمِيسِ فَيُغْفَرُ لِكُلِّ عَبْدٍ لَا يُشْرِكُ بِاللهِ شَيْئًا إِلَّا رَجُلًا كَانَتْ بَيْنَهُ وَبَيْنَ أَخِيهِ شَحْنَاءُ فَيُقَالُ: أَنْظِرُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا أَنْظِرُوْا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا أَنْظِرُوْا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا- ‘সোমবার ও বৃহস্পতিবার জান্নাতের দরজা খোলা হয় এবং প্রত্যেক বান্দাকে ক্ষমা করা হয় এ শর্তে যে, সে আল্লাহ তা‘আলার সাথে কোন কিছুকে অংশীদার করবে না। আর সে ব্যক্তি এ ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থেকে যায়, যে কোন মুসলিমের সাথে হিংসা ও শত্রুতা পোষণ করে। ফেরেশতাদেরকে বলা হয় যে, এদের অবকাশ দাও, যেন তারা পরস্পর মীমাংসা করে নিতে পারে’।[11]

আল্লাহ আমাদের সবাইকে উপরোক্ত বিষয়গুলো পালনের মাধ্যমে রামাযানের বরকত হাছিলের তাওফীক দান করুন-আমীন!

[1]. বুখারী হা/১।
[2]. বুখারী হা/১৯৬৯, ১৯৭০, ৬৪৬৫ ‘ছিয়াম’ অধ্যায়, ‘শা‘বানের ছিয়াম’ অনুচ্ছেদ; মুসলিম হা/১১৫৬।
[3]. মুসলিম হা/২৭০২; মিশকাত হা/২৩২৫।
[4]. বুখারী হা/৬৩০৭; ইবনু মাজাহ হা/৩৮১৬; মিশকাত হা/২৩২৩।
[5]. বুখারী হা/১৯৫০;মুসলিম হা/১১৪৬।
[6]. মুসলিম হা/১০৭৯; নাসাঈ হা/২১০০।
[7]. বুখারী হা/১৯০৪; মুসলিম হা/১১৫১; মিশকাত হা/১৯৫৯।
[8]. ছহীহ ইবনু হিববান হা/৪০৯, ছহীহ লেগায়রিহী।
[9]. নাসাঈ হা/২১০৬; মিশকাত হা/১৯৬২; ছহীহ আত-তারগীব হা/৯৯৯; ছহীহুল জামে‘ হা/৫৫।
[10]. আহমাদ হা/১৪০৪, ৮১৯৫; ইবনু মাজাহ হা/৩৯২৫; আত-তা‘লীকুর রাগীব ১/১৪২-১৪৩, হাদীছ ছহীহ।
[11]. মুসলিম হা/২৫৬৫; আবূদাঊদ হা/৪৬১৬; তিরমিযী হা/২১০৯; মিশকাত হা/৫০২৯।

আব্দুল মুহাইমিন
অনার্স ৩য় বর্ষ, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী।


এপ্রিল ২০২০

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close